জাতীয়

শিল্প-বাণিজ্য-জীবনধারা বদলে দিচ্ছে ‘এআই’

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশেও দ্রুত বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, সফটওয়্যার, শিক্ষা, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবন- সব ক্ষেত্রেই এআই আনছে আমূল পরিবর্তন। এআই নিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ।

Advertisement

দেশের তৈরি পোশাক খাতে (আরএমজি) এআইভিত্তিক ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন নিয়ে কাজ করছে আইটি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট বিল্ড। পোশাক উৎপাদনে পানি ও জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে লক্ষ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাইলট প্রকল্প করছে তারা। প্রাথমিক পর্যায়ে ইতিবাচক ফলও মিলেছে।

নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কীভাবে বদলে যাচ্ছে দেশের রপ্তানির এই প্রধান খাত? এ বিষয়ে স্মার্ট বিল্ডের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন রিয়াদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনভয় টেক্সটাইল ও বেবিলনে পাইলটিং চলাকালে আমরা পানির ব্যবহার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছি। জ্বালানি ব্যবহার ১৫ শতাংশ কমানো গেছে।’

আরও পড়ুন কাজ সহজ ও দ্রুত করতে ৫ এআই টুল হতে পারে আপনার সঙ্গী

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি পুরোপুরি সফল হই তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করা যাবে। আর জ্বালানি সাশ্রয়ের ফলে অনেক বিদ্যুৎ বেঁচে যাবে, এতে জাতীয় গ্রিডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর এটি সম্ভব হচ্ছে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে।’

Advertisement

মো. সাহাব উদ্দিন রিয়াদ যা বললেন তা যদি সত্যি সফল হয় তাহলে দেশের আরএমজি খাতে বিপ্লব ঘটাবে নিঃসন্দেহে।

শিল্প-কারখানাসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণমাধ্যমসহ দেশের সব খাতে ব্যবহার হচ্ছে এআই। পাল্টে যাচ্ছে জীবনযাপনের ধারাও। আগে যে কাজটি কয়েক দিনেও সম্ভব হতো এখন তা এক মুহূর্তেই করে দিচ্ছে এআই।

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা এআই ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এরই মধ্যেই দেশের কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, সেবা খাতে এআই ও রোবটিক্সের ব্যবহার বাড়ছে, যা পণ্যের মান বৃদ্ধি, অপচয় হ্রাস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারখানাগুলোর কর্মপদ্ধতি মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে।-ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অন্যতম চালিকাশক্তি। সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

Advertisement

জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা এআই ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এরই মধ্যেই দেশের কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, সেবা খাতে এআই ও রোবটিক্সের ব্যবহার বাড়ছে, যা পণ্যের মান বৃদ্ধি, অপচয় হ্রাস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারখানাগুলোর কর্মপদ্ধতি মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে।’

আরও পড়ুন এআইয়ের যুগে টিকে থাকতে যে স্কিল শিখবেন, এগিয়ে থাকবেন ১০ বছর

এআই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ব্যবসা পরিচালনা ও উৎপাদন পদ্ধতি মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এআই টুলস ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা বহু গুণে বেড়েছে।’

এআই ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দ্রুত বাজার বিশ্লেষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এআই ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে এবং সাপ্লাই চেইনে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ধরে রাখতে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এআই গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং আবশ্যিক শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

পানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ে পোশাক খাতে এআইয়ের ছোঁয়া

দেশের তৈরি পোশাক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার ঘটছে প্রতিনিয়ত। বিশেষত পানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ে এআই ও রোবটিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে।

গার্মেন্টস শিল্পে এআই ব্যবহার করে কোথায় কত পানি ও জ্বালানি খরচ হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করে অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তির কারণে। শুধু উৎপাদন নয়, শিল্প খাতের সফটওয়্যার ও অপারেশনাল ম্যানেজমেন্টেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।-স্মার্ট বিল্ডের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন রিয়াদ

স্মার্ট বিল্ডের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন রিয়াদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে আমরা তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে এআইভিত্তিক ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পানি ও জ্বালানির সংকট মোকাবিলা করা যায়, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

আরও পড়ুন এআই ব্যবহারে কমছে আত্মনির্ভরতা

এনভয় টেক্সটাইল, ইমপ্রেস, এসকিউ ও বেবিলন গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এআই প্রয়োগের পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছেন জানিয়ে বলেন, ‘এখনো এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা ইতিবাচক ফল পেয়েছি। আমাদের পর্যবেক্ষণে উৎপাদন ব্যয় কমছে ও মনিটরিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর হচ্ছে।’

এআইভিত্তিক ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন

তিনি আরও বলেন, ‘গার্মেন্টস শিল্পে এআই ব্যবহার করে কোথায় কত পানি ও জ্বালানি খরচ হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করে অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তির কারণে। শুধু উৎপাদন নয়, শিল্প খাতের সফটওয়্যার ও অপারেশনাল ম্যানেজমেন্টেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও দক্ষ ও তথ্যনির্ভর করতে আমরা এআইভিত্তিক সমাধান দিচ্ছি।’

কোন প্ল্যাটফর্মে কোন ধরনের বিজ্ঞাপন দেখাবে নির্ধারণ করছে এআই

দেশের বিজ্ঞাপন শিল্পেও এআইয়ের প্রভাব এখন প্রবল। এআইনির্ভর অনেক কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে এআই। এছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে কোন গ্রাহককে কখন, কোন ধরনের বিজ্ঞাপন দেখানো হবে তাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

একজন ব্যবহারকারী কোন ধরনের ওয়েবসাইট ভিজিট করেন, কোন ধরনের কনটেন্ট দেখেন, কোথায় ক্লিক করেন, কোন ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করেন, তার ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরন- এমনকি তার ভ্রমণ ও ব্যয়ের প্রবণতাসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করা হয়।-অ্যাডফিনিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুৎফি হায়দার চৌধুরী 

জানতে চাইলে অনলাইনে বিজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাডফিনিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুৎফি হায়দার চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মূলত ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়- কোন ব্যক্তিকে, কখন ও কোন প্ল্যাটফর্মে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো হবে।’

একজন ব্যবহারকারী কোন ধরনের ওয়েবসাইট ভিজিট করেন, কোন ধরনের কনটেন্ট দেখেন, কোথায় ক্লিক করেন, কোন ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করেন, তার ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরন- এমনকি তার ভ্রমণ ও ব্যয়ের প্রবণতাসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করা হয় বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন ডিআরইউতে কর্মশালা / সাংবাদিকরা জানছেন এআই ব্যবহার ও অপতথ্য মোকাবিলার কৌশল

তিনি বলেন, ‘এরপর বিজ্ঞাপনদাতার লক্ষ্য ও ব্যবহারকারীর এই প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই এআই নির্ধারণ করে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো সবচেয়ে কার্যকর হবে।’

এআইয়ের কারণে বিজ্ঞাপন শিল্পে পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আগে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে লক্ষ্যভিত্তিক টার্গেটিং ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিজ্ঞাপন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল ও কার্যকর হয়েছে এবং ম্যানুয়াল সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’

সফটওয়্যার শিল্পেও এআই

দেশের সফটওয়্যার শিল্পে প্রকল্পভেদে শ্রম ও সময় দুটোই কমিয়েছে এআই। জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফারহানা এ রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই সফটওয়্যার উন্নয়নকে আগের তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত করেছে। এখন খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি ওয়েবসাইট, প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক পর্যায়ের সফটওয়্যার তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এআই মূলত একটি জেনেরিক সমাধান দেয়।’

এআই সফটওয়্যার উন্নয়নের গতি বাড়ায় ও ডেভেলপারদের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। তবে উচ্চমানের, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার তৈরিতে এখনো মানবসম্পৃক্ততা অপরিহার্য।-বেসিসের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফারহানা এ রহমান

কোনো প্রতিষ্ঠান যখন তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজড, জটিল ও মিশন-ক্রিটিক্যাল সফটওয়্যার চায় তখন শুধু এআই যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সেখানে মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা, ডোমেইন জ্ঞান ও গভীর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই।’

ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের সিইও ও চেয়ারপারসন ফারহানা এ রহমান আরও বলেন, ‘এআই সফটওয়্যার উন্নয়নের গতি বাড়ায় ও ডেভেলপারদের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। তবে উচ্চমানের, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার তৈরিতে এখনো মানবসম্পৃক্ততা অপরিহার্য।’

এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর ও দায়িত্বশীল পথ বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে ব্রেইন স্টেশন-২৩ এর সিইও ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাইসুল কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই ব্যবহারের ফলে সফটওয়্যার উন্নয়ন আগের তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে। আগে যেসব সফটওয়্যার বিদেশ থেকে কিনতে হতো, এখন সেগুলোর অনেকগুলোই দেশেই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।’

আরও পড়ুন সব কাজে এআই ব্যবহার করে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত করছেন না তো?

উদাহরণ হিসেবে, বাংলাদেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইএসপি) জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার এখন স্থানীয়ভাবে তৈরি করে সরবরাহ করা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘এআই সফটওয়্যার উন্নয়নের সময় ও শ্রম কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে নতুন সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে এর সুফল বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিদ্যমান সফটওয়্যারে এআই ব্যবহার করতে হলে ক্লায়েন্টের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’

জিউজ অটোমেশন সল্যুশনজ ইনক-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর তানভীর ইব্রাহীম বলেন, ‘এআই এখন আর সফটওয়্যার ও আইটিইএস শিল্পের জন্য হুমকি নয়, বরং এটি উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।’

আন্তর্জাতিক বাজারে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার, অটোমেশন ও স্মার্ট ডিজিটাল সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইটিইএস প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন রপ্তানি বাজার, উদ্ভাবন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করছে বলে মত তার।

গণমাধ্যমেও এআই

সাংবাদিকতায় তথ্য বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন তৈরির প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত, এডিটিংয়ে সহায়তা, ছবি ও ভিডিও বানানো-যাচাই এবং ডেটা বিশ্লেষণে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে সংবাদকর্মীরা অনুসন্ধানী ও মানসম্মত সংবাদ তৈরিতে আরও বেশি সময় দিতে পারছেন বলে মনে করা হচ্ছে। টেলিভিশন ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে এআই নির্ভর কন্টেন্ট ও এআইনির্ভরতা বাড়ছে।

সংবাদ তৈরিতে প্রতিনিয়ত চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনি, ক্লড, এরিনা এআই, ইলেভেন ল্যাবস আইও, ক্যানভা এআইসহ টুলস ব্যবহার করেন মিরর এশিয়ার হেড অব নিউজ আসিফ শওকত কল্লোল।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘এসব টুলস ব্যবহার করে আমি সহজে রিপোর্টিং করতে পারি। একইসঙ্গে সহজে রিপোর্ট সম্পাদনাও করি। এছাড়া তৈরি করতে পারি ছবি ও গ্রাফিক্স। এআই আমার সাংবাদিকতার ধারাই পরিবর্তন করে দিয়েছে।’

এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং দক্ষতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই হবে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।-মিরর এশিয়ার হেড অব নিউজ আসিফ শওকত কল্লোল

আগে যেখানে তথ্য থাকলে একটি রিপোর্ট তৈরি করতে পারতেন, সেখানে এখন দিনে গ্রাফিক্স ও ভিডিওসহ একাধিক কিংবা চার-পাঁচটি রিপোর্টও তৈরি করতে পারছেন বলে জানান তিনি।

তবে তিনি এআইয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, ‘সাংবাদিকতার প্রতিটি স্তর- ডেস্ক রিপোর্টার, সাব-এডিটর, কপি এডিটর থেকে শুরু করে সম্পাদক- সবাই কোনো না কোনোভাবে এআই-সৃষ্ট পরিবর্তনের মুখোমুখি।’

আরও পড়ুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক ব্যবহার

তিনি বলেন, ‘এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং দক্ষতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই হবে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

দীর্ঘদিন থেকে সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আরিফুল ইসলাম আরমান। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতার গতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। অনেক সাংবাদিক এআই থেকে পাওয়া লেখা যাচাই বা সম্পাদনা না করেই প্রকাশ করছেন, যা তথ্যগত ভুল, বিভ্রান্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।’

‘সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো তথ্য যাচাই, প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ ও মানবিক বিচারবোধ, যা এখনো এআই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। তাই এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, বিকল্প সাংবাদিক হিসেবে নয়,’ বলেন আরমান।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা খাতে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার

স্বাস্থ্যখাতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণ ও রোগীর তথ্য ব্যবস্থাপনায় এআই চিকিৎসকদের কার্যকর সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, পরীক্ষার প্রস্তুতি, গবেষণা, মূল্যায়ন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত শেখার পদ্ধতি- সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

বর্তমানে শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনি, ক্লড, কোপাইলটসহ বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝা, অ্যাসাইনমেন্টের খসড়া তৈরি, কোড লেখা, ভাষা শেখা এবং গবেষণায় সহায়তা নিচ্ছেন।

শিক্ষকরাও পাঠ পরিকল্পনা, প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তর মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার শুরু করেছেন।

কৃষিখাতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির অবস্থা বিশ্লেষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ এবং স্মার্ট সেচ ব্যবস্থাপনায় এআইভিত্তিক প্রযুক্তি কৃষকদের সহায়তা করছে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিল্প-কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি আগাম শনাক্ত করতেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।

আরও পড়ুন এআই কি সত্যিই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি ভয়টাই বড়?

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তারা গ্রাহকসেবা, বাজার বিশ্লেষণ, বিপণন, হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই ব্যবহার করে সময় ও ব্যয় সাশ্রয় করছেন। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার পাশাপাশি নতুন উদ্ভাবনের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

কর্মসংস্থান কমবে না, পরিবর্তন হবে কাজের ধরন

এআই কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে- এমন বিতর্ক রয়েছে। তবে সবাই এ তথ্য মানতে নারাজ। এআই কখনই মানুষের বিকল্প হতে পারবে না বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরাও।

জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই নিয়ে প্রচলিত একটি ভয় হলো এটি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। তবে ঢাকা চেম্বার মনে করে, বিষয়টি কেবল ‘চাকরি ধ্বংসের’ নয়, বরং কাজের ধরন পরিবর্তনের।’

ঢাকা চেম্বার মনে করছে, ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে মানুষ ও মেশিনের অংশীদারত্বের পৃথিবী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উদ্ভাবনী ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।-ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ

প্রথাগত ও রুটিননির্ভর কাজ যেমন ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রোগ্রামিং, কল সেন্টার এবং রুটিন অফিস ব্যবস্থাপনা অটোমেশনের ঝুঁকিতে থাকলেও এআইভিত্তিক ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবটিক্স এবং এআই অ্যাডাপ্টেশনের মতো খাতে নতুন ও উচ্চ-আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা চেম্বার মনে করছে, ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে মানুষ ও মেশিনের অংশীদারত্বের পৃথিবী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উদ্ভাবনী ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।’

আরও পড়ুন ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে বড় দুই পরিবর্তন আনতে পারে এআই

বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও এআইভিত্তিক প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ। সঠিকভাবে এআই গ্রহণ করতে পারলে ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশের সঙ্গে দক্ষতা ও সেবার মানের যে ব্যবধান রয়েছে, তা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এআই ব্যবহার করে আমরা আরও মানসম্মত, দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সেবা দিতে পারবো।’

তিনি বলেন, ‘এআই এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাত একসঙ্গে কাজ করে এআই-প্রস্তুত জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও এআই অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে। এআই চাকরি কমিয়ে দেবে- এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।’

এআই ঘিরে যেমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে দক্ষতা, নৈতিকতা, তথ্য সুরক্ষা ও নীতিমালার চ্যালেঞ্জ। তাই প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, দায়িত্বশীল ব্যবহার ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ।

ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ