প্রবাস

মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট: বিবেকের নীরবতা - তৃতীয় পর্ব

একটি দেশের পতন সব সময় অর্থনৈতিক বিপর্যয় দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় পতনের সূচনা হয় মানুষের নৈতিক সাহস হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। যখন সৎ মানুষরা নীরব হয়ে যায় এবং অসৎ মানুষরা সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে।

Advertisement

তবে আশার বিষয় হলো, ইতিহাস কখনো শুধু অন্ধকারের গল্প নয়। পৃথিবীর প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে কিছু মানুষ ছিলেন, যারা নিজেদের বিবেকের কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন। তারা হয়তো সংখ্যায় কম ছিলেন, কিন্তু তাদের সাহস অনেক মানুষের চিন্তা পরিবর্তন করেছে।

একজন মানুষ যখন অন্যায়ের সামনে সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু নিজের বিবেককে সম্মান করেন না, তিনি সমাজের বিবেককেও জাগিয়ে তোলেন। কারণ পরিবর্তন সব সময় বড় কোনো ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয় না, অনেক সময় শুরু হয় একজন মানুষের একটি সৎ সিদ্ধান্ত থেকে।

আরও পড়ুন মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট: বিবেকের নীরবতা - প্রথম পর্ব

তাই প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজে কি বিবেকের কণ্ঠস্বর আবার শক্তিশালী করা সম্ভব?

Advertisement

উত্তর হলো, অবশ্যই সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন শুধু অন্যদের পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে, নিজের ভেতর থেকেই সেই পরিবর্তনের সূচনা করা।

বিবেকের নীরবতা নিয়ে আলোচনা করা সহজ, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কীভাবে সেই নীরবতা ভেঙে মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিকে আবার জাগিয়ে তোলা যায়?

এর উত্তর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। এটি শুরু হয় ব্যক্তি থেকে, তারপর পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

প্রথম শিক্ষা আসে পরিবার থেকে। একটি শিশু শুধু কথার মাধ্যমে নয়, তার চারপাশের মানুষের আচরণ দেখে শেখে। পরিবারে যদি সততা, সহমর্মিতা এবং অন্যের প্রতি সম্মানের চর্চা থাকে, তাহলে শিশুর ভেতরে ধীরে ধীরে একটি নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু যদি সে দেখে যে সুবিধার জন্য সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া যায়, অন্যায় করেও সফল হওয়া যায়, তাহলে তার বিবেকের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

Advertisement

তাই সন্তানকে শুধু সফল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া যথেষ্ট নয়, তাকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। কারণ সমাজের ভবিষ্যৎ শুধু কতজন উচ্চশিক্ষিত বা ধনী মানুষ তৈরি হলো তার ওপর নির্ভর করে না, বরং কতজন দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ তৈরি হলো তার ওপর নির্ভর করে।

শিক্ষা ব্যবস্থারও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষা যদি শুধু পরীক্ষার নম্বর, সার্টিফিকেট এবং চাকরির প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আমরা দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারি, কিন্তু নৈতিক মানুষ তৈরি করতে পারি না।

একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যারা শুধু প্রশ্নের উত্তর জানবে না, বরং সঠিক প্রশ্ন করতেও শিখবে। যারা শুধু নিজের অধিকার বুঝবে না, অন্যের অধিকারকেও সম্মান করবে। যারা শুধু নিজের সাফল্য চাইবে না, সমাজের কল্যাণের কথাও ভাববে।

তবে বিবেকের শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। একজন তরুণ যখন দেখে যে সততা সম্মানিত হয়, পরিশ্রমের মূল্য আছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে দুর্বলতা নয় বরং সাহস হিসেবে দেখা হয়, তখন তার ভেতরের নৈতিক শক্তি আরও দৃঢ় হয়।

সমাজকেও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা প্রায়ই সফল মানুষকে তার অর্থ, ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তার মাধ্যমে মূল্যায়ন করি। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার চরিত্র, সততা এবং মানুষের প্রতি তার দায়িত্ববোধের মাধ্যমে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিবেক কোনো একদিনের শিক্ষা নয়, এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই এটি শক্তিশালী হয়। রাস্তায় একজন অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানো, নিজের কাজ সততার সঙ্গে করা, অন্যায় সুবিধা গ্রহণ না করা, সত্য কথা বলার সাহস রাখা, এসব ছোট কাজই একজন মানুষের বিবেককে জাগ্রত রাখে।

রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ভালো মানুষরা নীরব থাকতে বাধ্য না হন। যেখানে সততা দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং সম্মানের প্রতীক হয়। যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ একা হয়ে পড়েন না।

কারণ একটি সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন সেখানে শুধু আইন মানা মানুষ নয়, বিবেক দ্বারা পরিচালিত মানুষ তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত বিবেক জাগ্রত করার কাজ অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করে না। এটি শুরু হয় নিজের কাছ থেকে। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে আমরা হয় আমাদের বিবেককে শক্তিশালী করি, অথবা ধীরে ধীরে তাকে নীরব করে দিই।

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে আমরা অসংখ্য অর্জনের সাক্ষী হয়েছি। মানুষ মহাকাশে পৌঁছেছে, রোগের চিকিৎসায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। কিন্তু এত উন্নতির পরও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষ কি সত্যিই আরও মানবিক হয়েছে?

কারণ সভ্যতার প্রকৃত মূল্য শুধু মানুষের তৈরি যন্ত্র, বিশাল ভবন বা অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিমাপ করা যায় না। একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা বোঝা যায় সেই সমাজে দুর্বল মানুষের প্রতি কতটা সহানুভূতি আছে, সত্যের প্রতি কতটা সম্মান আছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কতটা সাহস আছে, তার মাধ্যমে।

বিবেক হলো মানুষের ভেতরের সেই আলো, যা অন্ধকার সময়েও তাকে পথ দেখায়। এই আলো কখনো বাইরে থেকে জ্বালানো যায় না, এটি প্রতিটি মানুষের ভেতরেই বিদ্যমান। তবে সেই আলোকে জাগিয়ে রাখতে হয়, যত্ন নিতে হয়, প্রতিদিনের কাজে তার প্রতিফলন ঘটাতে হয়।

একজন মানুষ যখন নিজের সুবিধার আগে ন্যায়কে গুরুত্ব দেন, একজন নাগরিক যখন নিজের অধিকার পাওয়ার পাশাপাশি অন্যের অধিকারের কথাও ভাবেন, একজন নেতা যখন ক্ষমতাকে প্রভাব বিস্তারের নয়, মানুষের সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখেন, তখনই একটি সমাজে বিবেকের জাগরণ ঘটে।

আমরা প্রায়ই পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো ঘটনা, বড় কোনো নেতা বা বড় কোনো আন্দোলনের অপেক্ষা করি। কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রকৃত পরিবর্তনের শুরু হয় মানুষের ভেতরের পরিবর্তন থেকে। একজন সৎ মানুষ, একটি সাহসী সিদ্ধান্ত, একটি সত্য কথা, অনেক সময় একটি পুরো সমাজের চিন্তার ধারা বদলে দিতে পারে।

তাই আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু আরও জ্ঞানী মানুষ নয়, আরও বিবেকবান মানুষ। কারণ জ্ঞান আমাদের শক্তি দেয়, কিন্তু বিবেক সেই শক্তির সঠিক ব্যবহার শেখায়। প্রযুক্তি আমাদের গতি দিতে পারে, কিন্তু বিবেক আমাদের দিকনির্দেশনা দেয়।

যে জাতির মানুষের বিবেক জাগ্রত থাকে, সেই জাতিকে দীর্ঘদিন অন্যায়, দুর্নীতি বা অবিচারের মাধ্যমে দুর্বল করে রাখা যায় না। কারণ সেখানে মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচে না, তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও দায়িত্ব অনুভব করে।

আজ আমাদের প্রত্যেকের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা দরকার:

আমরা কি শুধু উন্নত জীবন চাই, নাকি একটি উন্নত সমাজও চাই?

আমরা কি শুধু নিজের সাফল্যের কথা ভাবব, নাকি আমাদের চারপাশের মানুষের কল্যাণের কথাও ভাবব?

আমরা কি অন্যায় দেখেও নীরব থাকব, নাকি নিজের বিবেকের কণ্ঠস্বর শুনে সত্যের পাশে দাঁড়াব?

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতি, সম্পদ বা প্রযুক্তি নির্ধারণ করে না। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার মানুষের বিবেক।

বিবেককে জাগ্রত রাখা মানে শুধু ভালো মানুষ হওয়া নয়, বরং একটি ভালো সমাজ, একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং একটি মানবিক পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব গ্রহণ করা।

তাই আজ সবচেয়ে বড় আহ্বান হতে পারে:

বিবেক, তুমি নীরব থেকো না।মানুষের ভেতরের আলো, তুমি আবার জ্বলে ওঠো।

রহমান মৃধাগবেষক ও লেখকসাবেক ফার্মাসিউটিক্যাল নির্বাহী, সুইডেন

এমআরএম