জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই। একদিকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারাদেশে গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন ও গণসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়, অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আন্দোলনের নেতৃত্বে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদিত ১৭ সদস্যের নতুন সমন্বয়ক কমিটি আত্মপ্রকাশ করে। ফলে কেন্দ্রের কর্মসূচির সঙ্গে আবারও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
Advertisement
কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদে আইন পাসসহ তিন দফা দাবিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। একই সঙ্গে ২৮ জুলাই সারাদেশে গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন এবং অনলাইন-অফলাইনে গণসংযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, আন্দোলনের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং চলমান দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জনমত আরও শক্তিশালী করা।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী ২৮ জুলাই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর পলাশীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এলাকায় কার্টুনিস্ট ও চারুকলার শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতি আঁকতে গেলে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ তাদের রং-তুলি জব্দ করে দেয়। একই দিনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি কর্মসূচি পালিত হয়।
‘দীর্ঘ সময় ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সমন্বয়ক কমিটি না থাকায় আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। এ কারণে আন্দোলনে সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হয়। কেন্দ্র সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট নতুন সমন্বয়ক কমিটির অনুমোদন দেয়।’
Advertisement
দেয়ালে লেখা হয় আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা বিভিন্ন স্লোগান- ‘সোনার বাংলা আজ মৃত্যুপুরী কেন?’, ‘আমার ভাইদের মারলি কেন?’, ‘পুলিশি হত্যার বিচার চাই’, ‘একদিকে নাটক করে, অন্যদিকে গুম করে’, ‘৫২ দেখিনি, ২৪ দেখেছি’, ‘সম্পদের হিসাব পরে, লাশের হিসাব আগে’, ‘হামার বেটাক মারলু ক্যান’সহ নানা প্রতিবাদী বার্তা। গ্রাফিতিতে স্থান পায় গুলিতে নিহত শিশু রিয়া এবং শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিও। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন।
আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২৭ জুলাই / সমন্বয়ক ছাড়াই টিকে ছিল রাজশাহীর আন্দোলনদিনভর আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা অবস্থায় রাতে অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম একটি ভিডিও বার্তায় কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তবে আন্দোলনের অন্য সমন্বয়করা দাবি করেন, জিম্মি করে নির্যাতনের মুখে তাকে ওই বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পরে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুল কাদের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় জানান, কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নয়। বরং পরদিন ২৯ জুলাই সারাদেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
জুলাই গণ অভ্যুত্থান আন্দোলনের রাবিতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান/ছবি- জাগো নিউজ
একই দিনে ডিবি হেফাজতে থাকা সমন্বয়কদের পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও সে সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। ভোরে আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে আটক করে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এছাড়া টানা ১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট চালু হলেও ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেবা তখনও সীমিত রাখা হয়। বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয়কদের আটকের প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ সোহেলের মুক্তির দাবি জানান।
Advertisement
এদিকে কেন্দ্রে যখন আন্দোলন নতুন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনের নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিচালনায় ১৮ সদস্যের একটি সমন্বয়ক দল ছিল। তবে নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্কের কারণে ১১ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পরে ওই কমিটির পাঁচ সদস্য ২৫ জুলাই কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপনকে স্বাগত জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ৩০ দিনের জন্য সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পর্যায়ে হয়তো বিভিন্ন ধরনের চাপ, অনিশ্চয়তা ও পরিস্থিতিগত কারণে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে ২৭ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার ফেসবুক পোস্ট ও ভিডিও বার্তায় স্পষ্ট করে জানান, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখনো আন্দোলন থেকে সরে আসেনি।’ তার এই বক্তব্য রাবির আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনে এবং কেন্দ্রীয় আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পথ তৈরি করে।
আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২৬ জুলাই / সমন্বয়কদের আন্দোলন প্রত্যাহার, রাবিতে হাল ধরেন সালাউদ্দিন আম্মারএরই ধারাবাহিকতায় ২৮ জুলাই কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের অনুমোদনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১৭ সদস্যের নতুন সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগের আন্দোলন-সক্রিয় শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কমিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী মিশু, আইন বিভাগের মাসুদ রানা, উর্দু বিভাগের মেহেদী হাসান মুন্না, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের নওসাজ জামান, সিরামিক অ্যান্ড ভাস্কর্য বিভাগের তানভীর আহমেদ রিদম, সমাজকর্ম বিভাগের মেহেদী সজীব, দর্শন বিভাগের ফুয়াদ উল ইসলাম ভূঁইয়া রাতুল, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের এফআরএম ফাহিম রেজা, আইইআরের তাসিন খান, পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের মেহেদী হাসান মারুফ ও ফৌজিয়া নৌরিন, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সালাউদ্দিন আম্মার, আইন বিভাগের মৃত্তিকা, আরবি বিভাগের মাহাদী হাসান মাহির, ক্রপ সায়েন্স বিভাগের নুরুল ইসলাম শহিদ এবং ব্যবসায় অনুষদের আতাউল্লাহ স্থান পান।
পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনের সমাপ্তি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী এই কমিটিই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কর্মসূচি পরিচালনা করে।
একই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৬ জুলাই সংঘটিত ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল পরিদর্শন করেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার। তিনি তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল (বর্তমান বিজয়-২৪ হল), নবাব আব্দুল লতিফ হল, মাদার বখশ হল ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, প্রশাসনিক ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি আবাসিক হলের ১৫৮টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে এবং প্রায় চার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন হলের কক্ষ, মোটরসাইকেল, সাইকেল, ল্যাপটপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
নতুন কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পর্যায়ে হয়তো বিভিন্ন ধরনের চাপ, অনিশ্চয়তা ও পরিস্থিতিগত কারণে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বাস্তবে তখনও শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর সবগুলো পূরণ হয়নি। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা মনে করেছি, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জরুরি। এই অবস্থান থেকেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে নতুন সমন্বয়ক কমিটির অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে সেই কমিটির নেতৃত্বেই আন্দোলনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
১৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সদস্য ফাহিম রেজা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সমন্বয়ক কমিটি না থাকায় আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। এ কারণে আন্দোলনে সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২৫ জুলাই / ঢাকায় আন্দোলন চলমান, রাবিতে প্রত্যাহারতিনি আরও বলেন, কেন্দ্র সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট নতুন সমন্বয়ক কমিটির অনুমোদন দেয়। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার আলোকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সব কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয়।
২৮ জুলাই তাই শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখনের কর্মসূচির দিনই ছিল না; একই সঙ্গে এটি ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সাংগঠনিক পুনর্জন্মের দিন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে পুনরায় সমন্বয় স্থাপনের মাধ্যমে নতুন কমিটির আত্মপ্রকাশ রাবির আন্দোলনকে নতুন গতি দেয় এবং পরবর্তী কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনির হোসেন মাহিন/এনএইচআর/এএসএম