স্বাস্থ্য

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে টুথপেস্টের অনুমোদন দেওয়া হয়: বিএসটিআই

আন্তর্জাতিক সব মানদণ্ড অনুসরণ করেই সব ধরনের টুথপেস্টের অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) প্রকাশনা শাখার সম্পাদক মঈনুদ্দীন মিয়া।

Advertisement

অনুমোদনকালে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুন।

রাজধানীর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের বাজারে থাকা ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির দাবি করা হয়।

আরও পড়ুন টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএসটিআই

এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে উচ্চ আদালত থেকেও বিষয়টি সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঘটনার দুদিন পর অবশেষে মুখ খুলেছেন বিএসটিআই কর্মকর্তারাও।

Advertisement

মঈনুদ্দীন মিয়া টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বিএসটিআই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘যে কোনো পরীক্ষায় প্লাস্টিকজাত ক্ষুদ্র কণা পাওয়া গেলেই সেটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত সংযোজন বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সমীচীন নয়।’

আগে বৈজ্ঞানিক যাচাই

বিএসটিআই মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গবেষণার ফল প্রকাশের পর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে ইএসডিওর কাছে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি, র-ডাটা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান ও সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, তারা নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি-বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় পরীক্ষা করাবে। এই পরীক্ষাকে বলা হচ্ছে ‘স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা’।

Advertisement

আরও পড়ুন এসডোর গবেষণা / দেশে প্রচলিত প্রতি চারটি টুথপেস্টের তিনটিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

পুনঃপরীক্ষায় কোনো পণ্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড পূরণে ব্যর্থ হলে বা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ডকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের ঘোষণা করা হবে না বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের টুথপেস্টের মানদণ্ডে কী আছে?

বাংলাদেশে টুথপেস্টের জন্য BDS 1216:2012 (Specification for Toothpaste) নামে একটি জাতীয় মান রয়েছে। ২০১৯ সালে জারি করা এসআরও-এর মাধ্যমে টুথপেস্ট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়।

লাইসেন্স দেওয়ার আগে পণ্যের রাসায়নিক, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত মানদণ্ডের পাশাপাশি কারখানার মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাচাই করা হয়। বিএসটিআইয়ের তথ্যমতে, জাতীয় মানদণ্ডে টুথপেস্ট তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকা রয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিক মাইক্রোবিডের সরাসরি উল্লেখ নেই।

বিএসটিআইয়ের যুক্তি অনুমোদিত তালিকায় নাম না থাকায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ নেই। তবে তালিকায় নাম না থাকলেই পণ্যটি সম্পূর্ণ মুক্ত কি না, নাকি কাঁচামাল, প্যাকেজিং বা উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃত দূষণ ঘটছে- সেটি নির্ধারণেই এখন কণার ধরন ও উৎস শনাক্ত করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমে, ক্ষতির বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই’

ইএসডিওর গবেষণায় বাজারে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতে (প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার দাবি করা হয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ- সবার দৈনিক পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে জড়িত এই পণ্য নিয়ে এমন তথ্যে সার্বিক নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

তবে গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া আর তা মানবদেহে সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করা দুটি ভিন্ন বিষয়। কণার আকার, আকৃতি, রাসায়নিক গঠন, উৎস ও শরীরে প্রবেশের মাত্রার ওপরই প্রকৃত ঝুঁকি নির্ভর করে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী ও কীভাবে আসে?

বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, সাধারণত ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়, যা খালি চোখে দেখা কঠিন। কিছু কণা বড় প্লাস্টিক ক্ষয় হয়ে তৈরি হয়, আবার কিছু কণা (যেমন মাইক্রোবিড) অতীতে টুথপেস্ট বা ফেসওয়াশে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হতো। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে বিশ্বজুড়ে এখন এর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হচ্ছে।

পরিবেশে প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেট, সিনথেটিক কাপড়, শিল্পবর্জ্য ও যানবাহনের টায়ার থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির মতে, খাদ্য, পানি ও বায়ুর মাধ্যমে এটি মানুষের সংস্পর্শে আসতে পারে। টুথপেস্টে এগুলো ইচ্ছাকৃত সংযোজন, নাকি কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি বা প্যাকেজিং থেকে আসা অনিচ্ছাকৃত দূষণ- তা জানতে রাসায়নিক বিশ্লেষণ জরুরি।

বৈশ্বিক চিত্র ও পরীক্ষাপদ্ধতির গুরুত্ব

যুক্তরাষ্ট্র (২০১৫): ‘মাইক্রোবিড-ফ্রি ওয়াটার্স অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে কসমেটিকস ও টুথপেস্টে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড নিষিদ্ধ করে।

আরও পড়ুন যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা / বাজারের অধিকাংশ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, এখন করণীয় কী?

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (২০২৩): রেগুলেশন (ইইউ) ২০২৩/২০৫৫-এর মাধ্যমে পণ্যসমূহে ইচ্ছাকৃত সিনথেটিক পলিমার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও বা এএসটিএম) কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর (ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা) মানদণ্ডে অনিচ্ছাকৃত মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট সীমা বা একক পরীক্ষাপদ্ধতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে মানসম্মত পরীক্ষাগার, সঠিক নমুনা প্রস্তুতকরণ ও স্বচ্ছ ফলাফলের ওপরই চলমান পুনঃপরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে।

টুথপেস্ট কি কসমেটিকস?

বাংলাদেশের ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ধারা ২(৮)-এ কসমেটিকসকে এমন প্রসাধনী সামগ্রী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা মানবদেহে ব্যবহার করা হয় এবং শারীরিক পরিচর্যা বা পরিবর্তনের দাবি করে।

যদিও আইনে টুথপেস্টের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ নেই, তবে দাঁত ও মুখগহ্বরের পরিচর্যার জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় এটি কসমেটিকস হিসেবে নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত পণ্যের আওতায় পড়ে। অর্থাৎ টুথপেস্টের উৎপাদন, আমদানি, নিবন্ধন ও মাননিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের।

ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ধারা ৬ অনুযায়ী অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো- কসমেটিকসের নিবন্ধন, উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানির লাইসেন্স প্রদান, উৎপাদন, বিতরণ ও মান নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি, পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।

অর্থাৎ, কোনো টুথপেস্টে ক্ষতিকর উপাদান থাকার অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা, নমুনা সংগ্রহ করা, পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাদের।এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র উপ-পরিচালক আখতার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

মান হালনাগাদ ও ভোক্তার করণীয়

বিশেষজ্ঞ, দন্ত চিকিৎসক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও শিল্প প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে টুথপেস্টের বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন বিধানে ইচ্ছাকৃত প্লাস্টিক মাইক্রোবিড নিষিদ্ধকরণ, সব উপাদানের স্পষ্ট উল্লেখ এবং পরীক্ষাপদ্ধতি যুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

ভোক্তাদের প্রতি পরামর্শ

বিএসটিআই গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হয়ে মুখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। টুথপেস্ট গিলে ফেলা থেকে বিরত থাকা এবং অনুমোদিত ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি

চলমান বিতর্কের অবসান ঘটাতে বেশ কিছু প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। যেমন, শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর সঠিক আকার, সংখ্যা ও রাসায়নিক গঠন কী? কণাগুলো ইচ্ছাকৃত সংযোজন নাকি অনিচ্ছাকৃত দূষণ? দেশি ও আমদানি করা টুথপেস্টের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না? শিশুদের টুথপেস্টে কণার মাত্রা কতটুকু? বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন বা সুনির্দিষ্ট মান নির্ধারণের সময় এসেছে কি না?

তবে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে বিএসটিআইয়ের স্বাধীন পুনঃপরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞদের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন পর্যন্ত।

এমইউ/এএসএ