ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী ১৯৮১ সালের ২ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (সম্মান) এবং এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রফেসর ড. মহীবুল আজিজের তত্ত্বাবধানে ‘শাহ আবদুল করিমের গান তত্ত্ব ও জীবনবোধ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে নবীনগর সরকারি কলেজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেশ কিছুকাল অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত।
Advertisement
স্কুলজীবন থেকেই তিনি লেখালেখির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। সাহিত্যের সব শাখাতেই তার সমান আগ্রহ। সৃজনশীল সাহিত্যের মধ্যে গল্প ও নাটক রচনায় তার খ্যাতি রয়েছে। এখনই সংগ্রাম, কাটে না অমানিশা, প্রতিবিশ্ব, বোধোদয় তার লেখা মঞ্চসফল নাটক। লোকায়ত দর্শন ও লোকসংস্কৃতি গবেষণায় তার আগ্রহ প্রবল। দেশে-বিদেশের বহু গবেষণা-জার্নালে তার গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। ‘লোকসাধক মনোমোহন দন্ত ও মলয়া সংগীত’ তার প্রথম প্রকাশিত গবেষণা-গ্রন্থ। তার ‘শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান’ গবেষণা-গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। ‘চট্টগ্রামের লোকগান লোককবি: ভাবসাধনার বৈচিত্র্য-সন্ধান’ তার গবেষণা-গ্রন্থ। ‘লোকগান লোকায়ত দর্শন ও রবীন্দ্রনাথ’ তার প্রকল্প গ্রন্থ। ‘আরিফ দেওয়ান: সুফিসংগীত’ এবং ‘আরিফ দেওয়ান: ভাবসংগীত’ তার সম্পাদিত গ্রন্থ।
সম্প্রতি এই ফোকলোর গবেষক কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও গবেষক রত্না মাহমুদা—
জাগো নিউজ: মাইজভাণ্ডারী সুফিসংগীতকে বাংলা গানের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ঘরানা বলা হয় কেন? যদি বিস্তারিত বলতেন—ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী: বাংলা গানের ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা উদ্ভব-ক্রমবিকাশের পরম্পরা জানতে হলে বাংলা গানের আদি বা প্রাচীন নিদর্শন ‘চর্যাগীতি’ থেকে শুরু করে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, পদাবলী বা মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতার কথা প্রথমেই ভাবনায় আসবে। যদিও ভারতীয় বেদান্ত সংগীত, মার্গ সংগীত, ধ্রুপদ, খেয়াল, উচ্চাঙ্গ প্রভৃতি ধারাও খুব শক্তিশালী ধারা। বাংলা গানের ভুবনে লোকসংগীত ধারা খুবই শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক। বাঙালির বৃহৎ যে জীবন, লোকায়ত যে জীবন—তারই বিচিত্র রূপ-রস, ছন্দ, বর্ণ-গন্ধ লোকগানের বিভিন্ন ধারায় প্রতিফলিত হয়ে থাকে। যাপিত জীবনের বিচিত্র অনুষঙ্গ যেমন লোকাঙ্গিক গানের উপজীব্য হয়; তেমনি অধ্যাত্মবাদী সাধন-ভজন ভাবনাও এই ধারার গানে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ ইহবাদী ও পারমার্থিক উভয়বিধ ভাবভাষ্য বাংলা গানের অনুষঙ্গ। এ ক্ষেত্রে ‘মাইজভাণ্ডারী সুফিসংগীত’ স্পষ্টতই স্বতন্ত্র ঘরানার গানের ধারা। প্রথমত, এটি অধ্যাত্মবাদী হয়েও জীবনবাদী (হিতবাদী অর্থে), দ্বিতীয়ত, এটি একটি পরিপূর্ণ স্বাধীন-স্বতন্ত্র সুফি-তরিকা বা সুফিদর্শনের নির্যাসকে আশ্রয় করে সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা গানের বিচিত্র ধারার বিভিন্ন প্রবণতা এতে যুক্ত হলেও বিষয়-ভাবে, সুর-তাল-লয়ে ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ নিঃসন্দেহে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ গানের ধারা বা ঘরানা।
Advertisement
জাগো নিউজ: মাইজভাণ্ডারী গানকে কেন বাংলা গানের স্বতন্ত্র ও মৌলিক ঘরানা বলা হয়, তা যদি পাঠকের উদ্দেশে বিস্তারিত জানাতেন—ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী: বাংলা গানের হাজার বছরের পরম্পরা ও ঐতিহ্যের নিরিখে মাইজভাণ্ডারী গান অনন্য সম্ভার। বাংলা গান তথা বাংলাদেশের গানে তা অমূল্য সংযোজন। তা নানা যৌক্তিকতায় একটি স্বতন্ত্র ও অভিনব ঘরানা। ঘরানাটি বাংলা গানের জগতে বেশ মৌলিকও বটে। বাংলা গানের ভুবনে একটি সমৃদ্ধ সুফি-তরিকা-দর্শনকে উপজীব্য করে বিশুদ্ধ বাংলা সুফিসংগীত সৃষ্টিতে মাইজভাণ্ডারী গান সবচেয়ে আদি। ফলে এই গানের ধারাটি সহজাত অন্তরপ্রেরণায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হয়েছে। পূর্ববর্তী অনেক ধারার গানের পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকলেও ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ মৌলিক। এর একটি স্বকীয় রূপ-রস-তাল-লয়-ছন্দ আছে।
জাগো নিউজ: আপনার গবেষণায় শাহ আব্দুল করিমের গানকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কোনো নতুন ব্যাখ্যা বা অনুধ্যান উন্মোচিত হয়েছে কি?ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী: বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে বাংলাদেশের লোকসংগীত সম্পর্কে ব্যাপকভাবে পাঠদান করা হয়ে থাকে। সেখানে লোকগানের উৎস, ক্রমবিকাশ, লোকগানের ধারা, লোককবিদের বিশদভাবে পড়ানো হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমার জানামতে ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এখনো কোথাও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ সাহিত্যিক ও সাংগীতিক মূল্যে ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ বাংলাদেশের অনেক লোকগানের চেয়ে সমৃদ্ধ। এই গানের সৃষ্টি ও চর্চার ইতিহাসও প্রায় দুশ বছরের পুরোনো। এখন পর্যন্ত এ ধারা সৃষ্টিশীলতা নিয়ে প্রবহমান রয়েছে। প্রায় বিশ হাজারেরও অধিক গান রচিত হয়েছে এ যাবত! প্রায় পাঁচ শতাধিক সাধককবি এই ঘরানার গান রচনা করেছেন। রমেশ শীলের মতো একুশে পদকজয়ী সাধক মাইজভাণ্ডারী গান রচনা করেছেন। এমন গানকে সংগীত-অধ্যয়নের কাঠামোতে না রাখা একধরনের উদাসীনতা, অজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতাহীনতাও বটে। আমরা তো মনে করি, কাজটি করা আমাদের জাতীয় ও নাগরিক কর্তব্যও।
জাগো নিউজ: বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রে মাইজভাণ্ডারী গানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কী কী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী: বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রে মাইজভাণ্ডারী গানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। যদিও বিক্ষিপ্তভাবে অনেক উপাদান-উপকরণই রয়েছে। তবু আমাদের কাছে মনে হয় মাইজভাণ্ডারী গানের বিপুল ভান্ডারকে প্রথমে গ্রন্থভুক্ত করা দরকার। তারপর এই গান সহজতর ও বোধগম্য করে পঠন-পাঠনের জন্য প্রাসঙ্গিক টীকা-ভাষ্য ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তত্ত্ব-দর্শন সম্বলিত সহায়ক গ্রন্থ তৈরি এবং গানগুলোর রাগ-তাল নির্ধারণপূর্বক বিশুদ্ধ স্বরলিপি তৈরি করা প্রয়োজন। এবং তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে অবহিত করাও জরুরি। কেননা এই ধারার বিশেষ তত্ত্ব-দর্শন সম্বলিত গানের ভুবনকে পাঠ করার সামগ্রিক অন্তরায়সমূহ দূর করতে হবে। এ জাতীয় শ্রমসাধ্য কাজটি সম্পন্ন করতে মাইজভাণ্ডারী সুফি-রিসার্চ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রাথমিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা কিংবা বাংলা একাডেমির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র এসব সংগ্রহ, সম্পাদন ও সংরক্ষণে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে।
আরও পড়ুন সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা: মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণজাগো নিউজ: মাইজভাণ্ডারী গানের পঠন-পাঠনে সহায়ক গ্রন্থ ও শব্দকোষের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবার জানা জরুরি বলে মনে করি। সে ক্ষেত্রে আপনার অভিমত জনসম্মুখে প্রকাশ করতেন যদি— ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী: মাইজভাণ্ডারী সুফিসংগীত অত্যন্ত উঁচুমানের সাধন ও ভক্তিমার্গীয় প্রেম ও ভাবসাধনার গান। এর পরতে পরতে রয়েছে চমৎকার সাধনমার্গীয় তত্ত্ব-দর্শন এবং কাব্যিক ও সাংগীতিক কলার নানা উপাদান। ফলে একেবারে নতুন পাঠকের কাছে এই গানের বিষয়-ভাববস্তুকে সহজবোধ্য করে তুলে ধরতে হলে প্রাসঙ্গিক সহায়ক শব্দকোষ ও সহায়ক গ্রন্থ জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সব পাঠ্যবইয়ের জন্যই সহায়ক গ্রন্থ-তালিকা সিলেবাসে সংযোজন করা হয়। এ ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে এর পঠন-পাঠনের প্রতিবন্ধকতা দূর হয়। আমরা মনে করি, সংগীতবিদ্যার পঠন-পাঠনের সমকালীন যে প্রবণতা ও প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়; সেখানে মাইজভাণ্ডারী গান বাংলাদেশের সংগীতবিদ্যা, সমাজবিদ্যা, শিল্প-সাহিত্য, সুফিসাধনায় এমনকি নন্দনকলা-চর্চায় যুগান্তকারী রসদ হতে পারে। যা বাংলাদেশের সমাজ-মানসের অজানা দিককে নতুন করে উন্মোচিত করবে পাঠক-গবেষকের কাছে। জাগো নিউজ: মাইজভাণ্ডারী গানের প্রসার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?ড. মোহম্মদ শেখ সাদী: মাইজভাণ্ডারী গানের পঠন-পাঠন ও চর্চার অনিবার্যতা যে রয়েছে, তা অনেকেই উপলব্ধি করেন। তবু কোথায় যেন তা অব্যর্থরূপে আগলমুক্ত হতে পারছে না। অথবা বোধগম্যতার মাত্রাগত হেরফের রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। এসব দুর্বলতা ও উদাসীনতা চিহ্নিত করে—তা সমাধান করে, লোকসংস্কৃতি চর্চার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগকে সমন্বিত করে—সংগীত-সমাজ-সাহিত্য অধ্যয়নের সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধারার প্রাসঙ্গিকতা ও অপরিহার্যতা তুরে ধরতে হবে। তাছাড়া দেশে-বিদেশের প্রতিথযশা সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, লোকসংস্কৃতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী প্রমুখের সাথে একাডেমিক সভা-সেমিনার, মতবিনিময় করার মাধ্যমে এই ঘরানার পঠন-পাঠনের প্রকৃত উপযোগিতা সবার কাছে স্পষ্ট হবে। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অনেক একাডেমিক ক্ষেত্রে তা গ্রহণীয় হয়ে উঠবে। স্বধর্মগুণেই তা অধীত হবে বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রে। আপনি জেনে আনন্দিত হবেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান শ্রেণিতে ‘লোকসাহিত্য ও লোকগীতি’ কোর্সে এরই মধ্যে সাধককবি রমেশ শীল পাঠ্যসূচিভুক্ত হয়েছে। এরই সূত্র ধরে রমেশ শীলের মাইজভাণ্ডারী গানও পঠিত হচ্ছে। রমেশ তো মাইজভাণ্ডারী গানের অমর স্রষ্টা। তাই সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিষয়ের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন অত্যাবশ্যক। আর মাইজভাণ্ডারী গানে সেই উপযোগিতা রয়েছে।
Advertisement
জাগো নিউজ: অনেকে মনে করেন, মাইজভাণ্ডারী গান শুধুই আধ্যাত্মিক বা ধর্মকেন্দ্রিক গান। আপনি এই ধারার গানকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী: মাইজভাণ্ডারী গান আধ্যাত্মিক গান হলেও এতে জীবন-জগতের বিচিত্র অনুভব-উপলব্ধি সন্নিবেশিত হয়েছে। যাপিত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা-অনুভব-উপলব্ধিও ব্যক্তি ও সমাজমানসের ফল্গুধারা বেয়ে প্রবহমান থেকেছে। ফলে এই ধারার গান কেবল আধ্যাত্মিক ধারার গান বলে একটি বিশেষ দিকে ফেলে রাখার পক্ষপাতী আমি নই। জীবন ও সমাজবাস্তবতার বিচিত্র অভিঘাতও এই গানের ধারায় সম্পৃক্ত-সন্নিবেশিত হয়েছে শৈল্পিক সুষমায়। এ ছাড়া লোকাঙ্গিক গানের বিচিত্র প্রবণতাও যুক্ত হয়েছে কালক্রমে। মাত্রাগতভাবে অনেক কিছুর আধার মাইজভাণ্ডারী গান। তাকে আমি কেবল আধ্যাত্মিকতার একক ইউনিট মনে করি না। বরং তা আধ্যাত্মিক হয়েও লোকায়ত সমাজ-সংস্কৃতির অনবদ্য দলিল।
আরও পড়ুন টানা দশ বছর বইমেলার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি: ইকবাল খন্দকারজাগো নিউজ: বর্তমান পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সর্বগ্রাসী সময়ে দাঁড়িয়ে লোকসংস্কৃতি ও লালন-হাসন রাজার মতো লোকসাধকদের মানবিক দর্শন চর্চা কীভাবে আধুনিক মানবসমাজকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে বলে আপনি মনে করেন?ড. মোহম্মদ শেখ সাদী: লোক, লোকশক্তি, লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, লোকসাধক, লোককবি, বাউল-বৈষ্ণব প্রভৃতি জাতীয় জীবনে যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, তা প্রথম যে বাঙালি অনুধাবন করেন—তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই প্রথম অনুধাবন করলেন, বৃহৎ যে লোকসমাজ এবং তাদের যে সংস্কৃতি—তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সামূহিক সূত্র। এগুলোই খাঁটি জিনিস এবং অকৃত্রিম মানসসম্পদ। ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথই প্রথম ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালন সাঁইয়ের ২০টি গান নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন এবং বাংলার বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি ফেরান শেকড়ের সাহিত্যের দিকে। ফলে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনাও বটে। এ ছাড়া ১৯৩৩ সালে ইংল্যান্ডে হিবার্ট বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ লালন ও হাসন রাজার গানের তত্ত্ব-দর্শন নিয়ে কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথ অকপটে স্বীকার করেছেন, তাঁর ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে।’ কবিতাটি হাসন রাজার গানের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সৃষ্ট। এ ছাড়া লালনের দর্শন তো রবীন্দ্রনাথকে প্রায় একটা সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রবাউলে পরিণত করেছিল! ফলে এসব বিষয়ের গভীরতর মানে বা ইতিবাচক তাৎপর্যটি উপলব্ধি করা খুব জরুরি। তাছাড়া এই মানবতার পতনযুগে দাঁড়িয়ে, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী থাবার মুখে দাঁড়িয়ে এসব আলাপ বাতুলতা মাত্র।
এসইউ