জাগো জবস

বাংলাদেশি অবনীর স্বপ্নের ইয়েল যাত্রা

আবিদ আহনাফ

Advertisement

বিশ্বের অন্যতম প্রি-কলেজ একাডেমিক প্রোগ্রাম ইয়েল ইয়াং গ্লোবাল স্কলার্স (ওয়াইওয়াইজিএস) ২০২৬-এ নির্বাচিত হয়েছেন আরিশা হোসেন অবনী। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ অর্জন করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই শিক্ষার্থী। একাডেমিক উৎকর্ষ, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং নিজের গল্পকে অসাধারণভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি হাজারো প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে জায়গা করে নিয়েছেন ওয়াইওয়াইজিএসের ২০২৬ আসরে।

ওয়াইওয়াইজিএস হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত আটটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গঠিত আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সপ্তাহব্যাপী আবাসিক প্রি-কলেজ একাডেমিক প্রোগ্রাম। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, গবেষণা, বৈশ্বিক সমস্যা এবং উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। ২০২৬ সালের এই প্রোগ্রামে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেন। যার মধ্যে নির্বাচিত হন ১ হাজর ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ জন। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্যতার হার ছিল প্রায় ১২-১৩ শতাংশ।

স্বপ্নের শুরু যেভাবে

অবনী বর্তমানে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে শেখার সুযোগের প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল।

Advertisement

ওয়াইওয়াইজিএসে আবেদন করার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে অবনী বলেন, ‘ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক গিলমোর গার্লসে ইয়েলের একাডেমিক পরিবেশ, শ্রেণিকক্ষের আলোচনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।’

তিনি বলেন, ‘ওই জীবনটা আমার কাছে শুধু একটা টেলিভিশন ধারাবাহিকের গল্প মনে হয়নি; বরং মনে হয়েছিল, যদি এমন একটা পরিবেশে নিজেকে যাচাই করার সুযোগ পেতাম, তবে কেমন হতো। যখন ওয়াইওয়াইজিএসের কথা জানতে পারি এবং দেখি যে ইয়েল ক্যাম্পাসে অধ্যাপকদের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেখার সুযোগ আছে। তখন মনে হয়েছিল এটাই সেই সুযোগ, যার স্বপ্ন আমি অনেকদিন ধরে দেখে আসছি।’

আরও পড়ুন বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ‘স্টেটমেন্ট অব পারপাস’ লিখবেন যেভাবে আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতির গল্প

২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর অবসর সময়ে অবনী প্রথম ওয়াইওয়াইজিএস সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তখনই আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিয়মিত সিদ্ধান্ত পর্বে আবেদন করেন। যেখানে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে আরও কঠিন ছিল।

ওয়াইওয়াইজিএসের আবেদন প্রক্রিয়ায় একাডেমিক নম্বরপত্র, সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিবরণ এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ জমা দিতে হয়। নিজের নির্বাচিত হওয়ার পেছনে প্রবন্ধকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন অবনী।তার ভাষায়, ‘একাডেমিক ফলাফল বা সহশিক্ষা কার্যক্রম শুধু সংখ্যা বা তালিকা দিয়ে বোঝানো যায়। কিন্তু প্রবন্ধই একমাত্র জায়গা, যেখানে আমি নিজের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি আর সত্যিকারের ‘আমি’ কে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলাম।’

Advertisement

নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে উপস্থাপন করার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের অভিজ্ঞতা, চিন্তাধারা এবং ব্যক্তিত্বকে সততার সঙ্গে তুলে ধরতে। তার বিশ্বাস, এই আন্তরিকতাই আবেদনকারীদের ভিড়ে তাকে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

আরও পড়ুন বিদেশে উচ্চশিক্ষায় জালিয়াতি ও শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গ, করণীয় কী? নির্বাচিত হওয়ার মুহূর্ত

ওয়াইওয়াইজিএস ২০২৬-এ নির্বাচিত হওয়ার খবর পাওয়ার মুহূর্তটি অবনীর জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ফলাফল জানিয়ে একটি ই-মেইল আসে। সেই ই-মেইল খোলার মুহূর্তটি তার কাছে আজও এক বিশেষ স্মৃতি।

তিনি বলেন, ‘যেই মুহূর্তে আমি ই-মেইলটা খুলে দেখি, এতটাই আনন্দিত হয়েছিলাম যে সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা, ভাই-বোন আর কাছের মানুষদের এই খবর জানাই। তাদের চোখেমুখেও একই আনন্দের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম।’

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা অবনীর জন্য নতুন নয়। এর আগেও তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছেন।

২০২৫ সালে জন লক ইনস্টিটিউট প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে স্থান করে নিয়ে ভেরি হাই কমেন্ডেশন অর্জন করেন তিনি। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেজনোজ কলেজে অনুষ্ঠিত জন লক ইনস্টিটিউটের নির্বাচিত প্রোগ্রাম লুকুস লুমিনুমে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এ ছাড়া কুইন্স কমনওয়েলথ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদক, কেমব্রিজ রিথিংক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় সম্মানজনক স্বীকৃতি এবং লুমিয়ের এডুকেশন প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় উচ্চ সম্মাননা ও ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলারের বৃত্তি অর্জন করেছেন।

তবে ওয়াইওয়াইজিএসের অভিজ্ঞতাটি তার জন্য ছিল আবেগপূর্ণ। প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার ঠিক আগে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে টানা দুই সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ফলে শারীরিক কারণে সরাসরি ওয়াইওয়াইজিএসে অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

তবে ওই সময়েও ওয়াইওয়াইজিএসের বিচারকরা বারবার তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। অবনী বলেন, ‘ওয়াইওয়াইজিএসের বিচারকরা বারবার আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। আমার আবেদনপত্র তাদের কাছে এতটাই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল যে তারা সত্যিই চেয়েছিলেন আমাকে ইয়েলে দেখতে। এই স্বীকৃতি আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা।’

আরও পড়ুন বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন

বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অবনী। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে চান তিনি। তার লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন নয় বরং এমন কিছু করা, যা দেশ ও মানুষের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এই যাত্রায় বাবা-মা, পরিবার এবং নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য অবনীর বার্তা হলো, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং নিজের গল্পকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। কারণ প্রতিটি শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনার মধ্যেই রয়েছে আলাদা সম্ভাবনা।

ইয়েল ইয়াং গ্লোবাল স্কলার্সের এই অর্জন অবনীর যাত্রার শেষ নয় বরং এটি তার আন্তর্জাতিক স্বপ্নপূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যেতে চান তিনি।

আরও পড়ুন স্কুলিং ভিসায় শিশুর সঙ্গে যেতে পারবেন বাবা-মাও

এমআইএইচ/এসইউ