টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ক্ষেতজুড়ে হেলে পড়েছে পাট। অনেক জমিতে জমেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি এমন পরিস্থিতিতে পাট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন মানিকগঞ্জের কৃষকরা। কিন্তু সেই কাজেই এখন সবচেয়ে বড় বাধা শ্রমিক সংকট। পানিতে নেমে কাজ করতে অনীহা, তার ওপর দক্ষ শ্রমিকের অভাব সব মিলিয়ে পাট কাটার মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দৈনিক এক হাজার টাকায়। এতে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ে লাভের হিসাব মিলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
Advertisement
মানিকগঞ্জ জেলার সাত উপজেলাতেই কম বেশি পাট চাষ হয়। এর মধ্যে সম্প্রতি ঘিওর, হরিরামপুর, শিবালয় ও সদর উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, পানিতে দাঁড়িয়ে চলছে পাট কাটার ব্যস্ততা। কেউ কাস্তে দিয়ে পাট কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন। বৃষ্টিতে নুয়ে পড়া পাট তুলতে বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে। আর সেই অতিরিক্ত শ্রমের খরচ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। অতিরিক্ত খরচ বাঁচাতে কৃষি পরিবারগুলো মেয়ে সদস্যরাও পুরুষদের পাঠ জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়াতে সাহায্য করছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, প্রতি বছরই পাট কাটার মৌসুমে দক্ষ শ্রমিকের সংকট দেখা দেয়। তবে এবার গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সেই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় পাট কাটতে যেমন বেশি সময় লাগছে, তেমনি শ্রমও বেশি প্রয়োজন হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে পাটের ভালো দাম পাওয়ায় জেলায় পাট চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলার সাত উপজেলায় ৪ হাজার ২৭৬ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৬৬৮ টন।
Advertisement
চলতি অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অতিক্রম করে ৪ হাজার ৫৭৬ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৭৩ টন। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উৎপাদন হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত জেলার ৭৮২ হেক্টর জমির পাট কাটা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত অবশিষ্ট জমির পাটও কেটে ঘরে তুলতে পারবেন কৃষকরা।
ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের কৃষক মাইনুদ্দিন গাজী বলেন, পাট চাষে লাভ আছে, কিন্তু কষ্ট অনেক। সবচেয়ে বেশি খরচ হয় পাট কাটার সময়। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ক্ষেতের পাট হেলে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আগেই কাটতে হচ্ছে। পানিতে নেমে সবাই কাজ করতে চায় না। আবার সবাই পাট কাটতে বা আঁশ ছাড়াতে পারে না। যারা পারে, তারা এখন প্রতিদিন এক হাজার টাকা মজুরি নিচ্ছে। এতে লাভের চেয়ে খরচই বেশি মনে হচ্ছে।
হরিরামপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের কৃষক আজিজ মিয়া বলেন, আগে এলাকায় প্রচুর শ্রমিক পাওয়া যেত। এখন অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছেন, আবার অনেকেই কাজের জন্য বাইরে থাকেন। তাই মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।
Advertisement
একই উপজেলার কৃষক রবিন বলেন, মানিকগঞ্জের পাটের আলাদা সুনাম রয়েছে। সরকার যদি প্রতি মণ পাটের একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবেন। তা না হলে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভ করা কঠিন হবে।
কৃষকদের দাবি, শুধু পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলেই হবে না; পাশাপাশি শ্রমিক সংকট নিরসন, যান্ত্রিকীকরণে সহায়তা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় সোনালি আঁশের ভালো বাজারমূল্য থাকলেও বাড়তি ব্যয়ের কারণে সেই লাভের বড় অংশই হারিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাজাহান সিরাজ জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে পাটের ভালো দাম পাওয়া এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শের কারণে জেলায় পাট চাষের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। আমরা আশা করছি, এ বছরও কৃষকরা ভালো দাম পাবেন। সরকার পাটচাষিদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার ব্যবস্থা করছে। এছাড়া কোনো কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে।
মো. সজল আলী/এনএইচআর/জেআইএম