আমাদের প্রতিদিনের কথাবার্তায় ‘ফোর টুয়েন্টি’ বা ‘৪২০’ শব্দটি প্রায়ই শোনা যায়। কেউ প্রতারণা করলে, মিথ্যা বলে সুবিধা নিলে কিংবা অন্যকে ঠকালে তাকে অনেকেই মজা করে বা রাগের মাথায় ‘৪২০’ বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু এই শব্দটির পেছনে যে একটি আইনি ইতিহাস রয়েছে, তা অনেকেরই অজানা।
Advertisement
আসলে ‘৪২০’ কোনো গালিগালাজ নয়; এটি বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা, যেখানে প্রতারণা ও অসাধুভাবে সম্পত্তি বা মূল্যবান দলিল হাতিয়ে নেওয়ার অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘৪২০’ শব্দটির উৎপত্তি কোথা থেকে?বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত দণ্ডবিধি- ১৮৬০, যা ব্রিটিশ আমলে প্রণীত হয়েছিল, তার ৪২০ ধারায় প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি বা মূল্যবান দলিল গ্রহণে প্ররোচিত করার অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই ধারার নম্বরই মানুষের মুখে মুখে প্রতারক বা ঠকবাজের সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। তাই কাউকে ‘৪২০’ বলা মানে মূলত তাকে প্রতারক বা অসাধু ব্যক্তি হিসেবে ইঙ্গিত করা।
আরও পড়ুন ম্যাচের উত্তেজনায় অতিরিক্ত বাজি বা খরচ যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন ৪২০ ধারার আগে কেন ৪১৫ ধারা জানা জরুরি?কোন কাজকে আইনগতভাবে প্রতারণা বলা হবে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারায়। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কাউকে প্রতারণা করে এমনভাবে প্ররোচিত করেন যাতে তিনি কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করেন; মূল্যবান দলিল প্রদান করেন অথবা এমন কোনো কাজ করেন বা করা থেকে বিরত থাকেন, যার ফলে তার ব্যক্তি, সম্পত্তি বা স্বার্থের ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়- তাহলে সেটি প্রতারণার আওতায় পড়তে পারে।
Advertisement
অর্থাৎ, ৪২০ ধারায় অপরাধ প্রমাণ করতে হলে প্রথমে ৪১৫ ধারায় বর্ণিত প্রতারণার উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকতে হবে।
দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় কী বলা হয়েছে?দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণার মাধ্যমে অন্য কাউকে অসাধুভাবে সম্পত্তি দিতে বাধ্য করেন; মূল্যবান জামানত বা দলিল তৈরি, পরিবর্তন বা ধ্বংস করতে প্ররোচিত করেন অথবা স্বাক্ষরিত বা সিলমোহরযুক্ত কোনো মূল্যবান নথির ক্ষতি সাধন করেন- তাহলে তিনি সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। পাশাপাশি আদালত অর্থদণ্ডও দিতে পারেন।
কোন কোন ক্ষেত্রে ৪২০ ধারায় মামলা করা যায়?বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সাধারণত নিচের ধরনের প্রতারণামূলক ঘটনায় ৪২০ ধারায় মামলা করা যেতে পারে-
মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়াচাকরি দেওয়ার কথা, বিদেশ পাঠানোর আশ্বাস, সরকারি প্রকল্পে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বা অন্য কোনো প্রলোভন দেখিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থ আদায় করলে তা ৪২০ ধারার আওতায় আসতে পারে।
Advertisement
প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি বা দলিল গ্রহণকাউকে ভুল তথ্য দিয়ে জমি, বাড়ি, গাড়ি বা অন্য কোনো সম্পত্তি কিংবা মূল্যবান দলিল নিজের নামে লিখিয়ে নেওয়া বা হস্তান্তরে বাধ্য করাও এই ধারার অপরাধ হতে পারে।
জাল কাগজপত্র বা ভুয়া দলিল ব্যবহারভুয়া সই, জাল দলিল, নকল কাগজপত্র বা জাল নথি ব্যবহার করে কারও ক্ষতি করা কিংবা মূল্যবান দলিল তৈরি, পরিবর্তন বা নষ্ট করাও ৪২০ ধারার আওতায় আসতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার সঙ্গে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারার (জাল দলিল ব্যবহার) অভিযোগও একসঙ্গে আনা হয়।
বিনিয়োগের নামে প্রতারণাব্যবসা, লাভজনক প্রকল্প বা বিনিয়োগের কথা বলে অর্থ সংগ্রহ করে শুরু থেকেই আত্মসাতের উদ্দেশ্য থাকলে ৪২০ ধারায় মামলা করা যেতে পারে। তবে সব ব্যবসায়িক বিরোধ ৪২০ ধারার মামলা নয়। যদি দেখা যায়, শুরুতে উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য বৈধ ছিল কিন্তু পরে ব্যবসায় লোকসান হয়েছে বা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি, তাহলে সেটি সাধারণত দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রতারণার উদ্দেশ্যে চেক প্রদানকেউ যদি জেনে-শুনে বন্ধ ব্যাংক হিসাবের চেক দেন বা পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা সত্ত্বেও প্রতারণার উদ্দেশ্যে চেক ইস্যু করেন, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ৪২০ ধারার অভিযোগ উঠতে পারে। পাশাপাশি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।
বিয়ের নামে প্রতারণাকোনো ব্যক্তি যদি শুরু থেকেই অসৎ উদ্দেশ্যে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ, স্বর্ণালংকার বা সম্পত্তি হাতিয়ে নেন কিংবা নিজের পরিচয় গোপন করে প্রতারণা করেন, তাহলে ঘটনাভেদে ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার আইনগত মূল্যায়ন আলাদা এবং নির্ভর করে প্রমাণ ও ঘটনার প্রকৃতির ওপর।
আরও পড়ুন যারে দেখি লাগে যে ভালো, কিন্তু কেন? সব প্রতারণাই কি ৪২০ ধারা?না, এটি সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির একটি বিষয়। শুধুমাত্র কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে বলেই ৪২০ ধারা প্রযোজ্য হবে না।
বাংলাদেশের আদালত বিভিন্ন রায়ে বলেছেন, ৪২০ ধারার মামলা টিকতে হলে দেখাতে হবে যে লেনদেন বা চুক্তির শুরু থেকেই অভিযুক্তের মনে প্রতারণার অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। যদি সেই উদ্দেশ্য শুরুতে না থাকে এবং পরে কোনো কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে সেটি সাধারণত দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
৪২০ ধারায় কোথায় মামলা করতে হয়?প্রতারণার শিকার ব্যক্তি চাইলে নিকটস্থ থানায় এজাহার দায়ের করতে পারেন; অথবা সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
সাধারণ এলাকায় মামলা হয় মুখ্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এবং মহানগর এলাকায় মামলা করতে হয় মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে।
মামলা করতে কী ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন? লিখিত চুক্তিপত্র টাকা লেনদেনের রসিদ ব্যাংক স্টেটমেন্ট মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ট্রানজেকশন হিস্ট্রি চেক বা ব্যাংক সংক্রান্ত নথি এসএমএস, ই-মেইল বা চ্যাটের স্ক্রিনশট অডিও-ভিডিও রেকর্ড (যদি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়) প্রত্যক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্যযত বেশি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকবে, মামলার ভিত্তি তত শক্তিশালী হবে।
আরও পড়ুন বয়সের বিশাল ব্যবধানের বিয়ে, জানেন কী হতে পারে? প্রতারণার শিকার হলে কী করবেন? সংশ্লিষ্ট সব নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। টাকা লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করুন। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন। প্রতারণার প্রকৃতি অনুযায়ী থানা বা আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।'৪২০' শুধু একটি কথ্য শব্দ নয়; এটি বাংলাদেশের দণ্ডবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি ধারা। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি আর্থিক বিরোধ বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই ৪২০ ধারার অপরাধ নয়। এই ধারায় মামলা করতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন। তাই প্রতারণার শিকার হলে আবেগ নয়, বরং যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৪১৫ (প্রতারণার সংজ্ঞা) এবং ধারা ৪২০ (প্রতারণার মাধ্যমে অসাধুভাবে সম্পত্তি বা মূল্যবান দলিল হস্তান্তরে প্ররোচিত করার অপরাধ ও শাস্তি); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (বাংলাদেশে প্রচলিত)-প্রতারণাসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে মামলা দায়ের, তদন্ত ও বিচারসংক্রান্ত বিধান; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় -প্রতারণা (৪১৫ ও ৪২০ ধারা) এবং দেওয়ানি বিরোধ (চুক্তিভঙ্গ বা ব্যবসায়িক বিরোধ)-এর মধ্যে পার্থক্য, প্রতারণার উদ্দেশ্য এবং ফৌজদারি মামলার গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত আইনগত নীতিমালা; বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর বাংলা সংস্করণ।
জেএস