লাইফস্টাইল

তরুণদের মাঝে বাড়ছে ডায়াবেটিস, প্রতিরোধে করণীয়

ডা. আর এ মাজিদ ভূইয়া

একসময় ডায়াবেটিসকে মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের মধ্যেও ডায়াবেটিস উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি শুধু একটি রোগ নয়, বরং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষম জনশক্তি, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি। তাই তরুণদের ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

Advertisement

ডায়াবেটিস মূলত এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে, যা আগে তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেত। এর প্রধান কারণ অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।

ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি স্থূলতা, বিশেষ করে কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমা, ডায়াবেটিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। যাদের পরিবারে বাবা-মা বা ভাই-বোনের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক তরুণ দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্ষুধা, দুর্বলতা, ঝাপসা দেখা বা ঘন ঘন সংক্রমণ-এসব লক্ষণকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয় এবং ততদিনে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতি শুরু হতে পারে।

Advertisement

নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিস হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া, চোখের রেটিনার ক্ষতি, স্নায়ুর সমস্যা এবং পায়ের জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অল্প বয়সে ডায়াবেটিস হলে দীর্ঘ সময় ধরে এসব জটিলতার ঝুঁকি বহন করতে হয়, যা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র-সবার জন্যই বড় বোঝা।

সুখবর হলো, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। একই সঙ্গে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা উচিত।

যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, যাদের ওজন বেশি, অথবা যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ফ্যাটি লিভার রয়েছে, তাদের নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

আরও পড়ুন ক্যানসারের পর সুস্থ জীবনের পথ দেখালেন দীপিকা

তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা, নিয়মিত খেলাধুলা, স্বাস্থ্যকর ক্যানটিন ব্যবস্থা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় হাঁটার পথ, খেলার মাঠ ও ব্যায়ামের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

Advertisement

আরও পড়ুন সিজোফ্রেনিয়া কী, চিকিৎসা সম্পর্কে যা জানা জরুরি

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের তরুণদের ওপর। তাই তরুণদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। ডায়াবেটিসকে অবহেলা নয়, বরং সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারার মাধ্যমে প্রতিরোধ করার অঙ্গীকারই হতে পারে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি।

লেখক: কনসালটেন্ট, প্রিভেন্টিভ মেডিসিন, গুলশান ডায়াবেটিস কেয়ার হাসপাতাল, গুলশান ২, ঢাকা।

এসএকেওয়াই