বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশেও দ্রুত বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, সফটওয়্যার, শিক্ষা, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবন- সব ক্ষেত্রেই এআই আনছে আমূল পরিবর্তন। এআই নিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব আজ।
Advertisement
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হচ্ছে অপব্যবহারও। বিশ্ব বহুদূর এগোলেও দেশে এখনো এআই নীতিমালাই নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি হলেও সেটি চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এসে সেই খসড়া নীতিমালাটি আরও যুগোপযোগী করতে চায়। নীতিমালা প্রস্তুত করার আগে খাতসংশ্লিষ্টদের পরামর্শও নিতে চায় সরকার।
আগের খসড়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই নীতিমালাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচনা ছিল। সে সমালোচনা দূর করারও উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
Advertisement
প্রথম পর্ব
আরও পড়ুন শিল্প-বাণিজ্য-জীবনধারা বদলে দিচ্ছে ‘এআই’জানা যায়, দেশে বর্তমানে কোনো পূর্ণাঙ্গ বা পাস করা এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) আইন নেই। তবে সরকার নাগরিক সুরক্ষা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল উদ্ভাবন নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা (২০২৬-২০৩০)’ প্রণয়ন ও পর্যালোচনা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালার (২০২৬-২০৩০) খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল।
সব অংশীজনের মত নিয়ে নীতিমালাএ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই নীতিমালার একটি প্রাথমিক খসড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রস্তুত হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ও দ্রুত পরিবর্তনশীল এআই প্রযুক্তির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা নীতিমালাটি নতুন করে পর্যালোচনা করছি।’
এআই প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই আগের খসড়া পর্যালোচনা করে বর্তমান বাস্তবতা ও সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ এবং সময়োপযোগী এআই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।-তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা
Advertisement
‘সব অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত এআই নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যাতে এআই প্রযুক্তি মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এআই প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই আগের খসড়া পর্যালোচনা করে বর্তমান বাস্তবতা ও সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ ও সময়োপযোগী এআই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
আরও পড়ুন প্রতিশ্রুত সময় পেরিয়েও আসেনি গুগলের নতুন এআই মডেল, বাড়ছে অপেক্ষাঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো এআই নীতিমালায় অনেকটাই পিছিয়ে। শুধু একটি সাধারণ নীতিমালা করলেই হবে না, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের বাস্তবতায় একটি সমন্বিত ও অংশীজনভিত্তিক (সমন্বিত) নীতিমালা প্রয়োজন।’
সেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যবহারকারী, সরকার, গবেষক ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকা, ডেটা ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গোপনীয়তা- সব বিষয়ই স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে বলে মত তার।
তিনি বলেন, ‘এআই শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি এখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতারও অংশ। তাই বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নির্ভুল উপস্থাপন নিশ্চিত করতে স্থানীয় ডেটাসেট তৈরির পাশাপাশি মানুষের এআই-সচেতনতা বা এআই লিটারেসি বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় অপব্যবহার ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।’
নীতিমালার পাশাপাশি আইনি কাঠামো হালনাগাদ জরুরিএআই নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে এ সংক্রান্ত আইনি কাঠামোও হালনাগাদ করতে হবে। এআই শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি নানান প্রশ্ন জড়িত।-বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর
জানতে চাইলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে এ সংক্রান্ত আইনি কাঠামোও হালনাগাদ করতে হবে। এআই শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি নানান প্রশ্ন জড়িত।’
আরও পড়ুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ারতিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মৃত ব্যক্তির ভিডিও তৈরি, কোনো শিল্পী বা ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ডিজিটাল প্রতিরূপ ব্যবহার কিংবা চিকিৎসা পরামর্শের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না- এসব বিষয়ে নীতিমালায় স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। একই সঙ্গে নীতিমালা লঙ্ঘন হলে কোন ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ। সঠিকভাবে এআই গ্রহণ করতে পারলে ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশের সঙ্গে দক্ষতা ও সেবার মানের যে ব্যবধান রয়েছে, তা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।’
এআই ব্যবহার করে আমরা আরও মানসম্মত, দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সেবা দিতে পারবো জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এআই সংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে এখন বসে থাকার সময় নয়। নীতিমালাসহ এআই সংক্রান্ত সব উদ্যোগ আরও দ্রুততর করা উচিত।’
নীতিমালা তৈরি নয়, বাস্তবায়ন জরুরিএআই নীতিমালা নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত জানান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, ‘এআই এখন বিশ্বজুড়ে বাস্তবভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে এর প্রয়োগ বাড়ানো জরুরি। এআই ব্যবহারের জন্য নতুন নীতিমালার অপেক্ষায় বসে থাকার প্রয়োজন নেই।’
যেখানে আইনগত প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে ডেটা সুরক্ষা আইন ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন রয়েছে। তাই নতুন এআই নীতিমালা না থাকায় কাজ আটকে আছে- এমনটি আমি মনে করি না।-বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর
আমাদের দেশে অনেক সময় নীতিমালা তৈরির দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু নীতিমালা দিয়ে পরিবর্তন আসে না। আইসিটি খাতে অতীতেও নানা নীতিমালা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সরকারের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত বাস্তব প্রয়োগে।’
আরও পড়ুন পোশাকশিল্পে এআই, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন গ্রহণের আহ্বানফাহিম মাশরুরের মতে, ‘যেখানে আইনগত প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে ডেটা সুরক্ষা আইন ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন রয়েছে। তাই নতুন এআই নীতিমালা না থাকায় কাজ আটকে আছে- এমনটি আমি মনে করি না।’
তথ্য বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল এআই পলিসি বাংলাদেশ ২০২৬-৩০’ প্রকাশ করা হয়। জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঝুঁকিভিত্তিক (রিস্ক-বেজড) নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।’
এতে এআইকে ‘আনঅ্যাকসেপ্টেবল (অগ্রহণযোগ্য), হাই, লিমিটেড ও মিনিমাল রিস্ক- এই চার শ্রেণিতে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে এআই ব্যবহারে বাধ্যতামূলক ঝুঁকি মূল্যায়ন (অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট), মানবীয় তদারকি (হিউম্যান ওভারসাইট) ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সুপারিশ করা হয়েছে।
খসড়ায় ডিপফেক বা এআইনির্মিত কনটেন্টে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, ডেটা সুরক্ষা ও গোপনীয়তা, সরকারি খাতে এআই ব্যবহারে অডিট ও জবাবদিহিতা, স্টার্টআপের জন্য রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স, এআই গবেষণা তহবিল, দক্ষ জনবল তৈরি এবং দেশীয় এআই অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার দিকনির্দেশনাও রয়েছে।
তবে খসড়া নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন মহলে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ, বাজেট, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও সময়সূচি স্পষ্ট নয়।
এছাড়া উচ্চ ঝুঁকির এআইয়ের জন্য কঠোর অডিট, ডকুমেন্টেশন ও কমপ্লায়েন্স বাধ্যবাধকতা ছোট স্টার্টআপগুলোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করতে পারে। আরেকটি বড় সমালোচনা হলো, খসড়াটি অনেকাংশেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’ অনুসরণ করে প্রণয়ন করা হয়েছে।
নীতিমালা না থাকায় তৈরি হচ্ছে ঝুঁকিফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচের ফ্যাক্টচেকার রিদওয়ানুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো সমন্বিত এআই নীতিমালা না থাকায় একাধিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে যেমন (কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্দোলন) এআই ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য, ডিপফেক ছবি ও ভিডিও।’
অনেক সময় দায়িত্বশীল জায়গা থেকেও এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সুস্পষ্ট ডিসক্লেইমার ছাড়া প্রচার করা হয়। এআই জেনারেটেড কনটেন্ট এখন অনেক বেশি নির্ভুল হওয়ায় এগুলো ছড়িয়েও পড়ে দ্রুত। কিন্তু কোনো নীতিমালা না থাকায় দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহির কাঠামো অনুপস্থিত।-ফ্যাক্টচেকার রিদওয়ানুল ইসলাম
অনেক সময় দায়িত্বশীল জায়গা থেকেও এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সুস্পষ্ট ডিসক্লেইমার ছাড়া প্রচার করা হয় জানিয়ে বলেন, ‘এআই জেনারেটেড কনটেন্ট এখন অনেক বেশি নির্ভুল হওয়ায় এগুলো ছড়িয়েও পড়ে দ্রুত। কিন্তু কোনো নীতিমালা না থাকায় দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহির কাঠামো অনুপস্থিত।’
আরও পড়ুন আসল না নকল? এআই ডিপফেক ধরার ছয়টি সহজ উপায়পাশাপাশি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, এআইয়ের অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত এবং শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
দ্রুত এআই নীতিমালা প্রয়োজন, কারণ এটি প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও গণমাধ্যমের জন্য সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করবে বলে মনে করেন এই ফ্যাক্টচেকার।
জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৬–২০৩০-এর খসড়া প্রণয়ন ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে চললেও, এআইনির্ভর অপতথ্য ও অপব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনায় নীতিমালাটির দ্রুত চূড়ান্ত অনুমোদন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের ডিসইনফরমেশন অ্যানালিস্ট সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। নীতিমালায় এআই-সৃষ্ট কনটেন্ট শনাক্তকরণ ও লেবেলিং, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং ফ্যাক্টচেকিং ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
একই সঙ্গে এআইর ইতিবাচক ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এআই নীতিমালা যেন প্রযুক্তি দমন নয়, বরং অপতথ্য মোকাবিলা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাঠামো হিসেবে কাজ করে- এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’
সমালোচকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ডেটা অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে ইউরোপীয় কাঠামোর অতিরিক্ত অনুসরণ নীতিমালার বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে।
‘দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হোক’এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডিকের (AIDCQ) সিইও এবং এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর্কিটেক্ট ও লন্ডনের রেইভেন্সবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এস এম আনিসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইনের (এআই অ্যাক্ট) মূল লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেন কোনোভাবেই মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা আর্থিক লাভের নামে এমন কোনো এআই ব্যবহার করা যাবে না, যা মানুষের অধিকার বা সমাজের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।’
বাংলাদেশের খসড়া এআই নীতিমালার বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে হলে বিদ্যমান আইনগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও আরও গবেষণা প্রয়োজন। যেহেতু এটি এখনো খসড়া, তাই সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে এআই নীতিমালা প্রণয়নে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হোক।-এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর্কিটেক্ট এস এম আনিসুর রহমান
এআই ব্যবহারের আগে সমাজ ও মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে এআই মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল সে ধরনের এআই ব্যবহারের অনুমোদন দেয়।’
আরও পড়ুন কাজ সহজ ও দ্রুত করতে ৫ এআই টুল হতে পারে আপনার সঙ্গীবাংলাদেশের খসড়া এআই নীতিমালা নিয়ে এই এআই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশের খসড়া এআই নীতিমালার বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে হলে বিদ্যমান আইনগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও আরও গবেষণা প্রয়োজন। যেহেতু এটি এখনো খসড়া, তাই সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে এআই নীতিমালা প্রণয়নে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এআই, এআই ডেটা সেন্টার, এআইভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়ন, রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের এআই ইকোসিস্টেম বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।’
এদিকে, খসড়ার অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি জাতীয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরি করা, যা চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো কাজ করবে। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ডিজিটাল সংরক্ষণ, দেশীয় জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এজন্য সরকার একটি ন্যাশনাল এআই কম্পিউট স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করতে চায়, যার আওতায় জাতীয় ডেটা সেন্টারে কেন্দ্রীয়ভাবে জিপিইউ অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ২০৩০ সাল পর্যন্ত ২০০-২৫০ কোটি টাকার ‘এআই ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণে ব্যয় হবে। স্টার্টআপ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সার্ভার এবং এআই হার্ডওয়্যার আমদানিতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সব ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি অপব্যবহারও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত ফটোকার্ড, ছবি, ভিডিও অনেকটা নিখুঁতভাবে এআই দিয়ে তৈরি করে ভাইরাল করা হচ্ছে। যেটা ডেকে আনছে অনেক বড় বিপদ। এআই কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, কোন ক্ষেত্রে যাবে না, অযাচিত ব্যবহার করলে পরিণতি কী হবে- এসব বিষয় নীতিমালা ছাড়া ঠিক করা সম্ভব নয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব এআই নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ