মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই কঠিন অবস্থায় পড়ছে সৌদি আরব। শুরু থেকেই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছিল দেশটি। ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, লোহিত সাগরে নৌ অবরোধ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন সৌদি আরবকে প্রকাশ্য সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।
Advertisement
রিয়াদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও শক্ত অবস্থান নেবে, নাকি সংঘাত কমানোর জন্য কূটনৈতিক পথেই এগোবে।
যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা
গত পাঁচ মাস ধরে সৌদি আরব সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায়নি। বরং দেশটির মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
Advertisement
আরও পড়ুন>ইরানজুড়ে নতুন করে মার্কিন হামলাইরানকে অস্ত্র দিচ্ছে চীন, মজুত ফুরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের: নতুন বাস্তবতাইরাকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ওপর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, নিহত ৮
এই কর্মসূচির আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই কারণেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কৌশল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
তিন দিক থেকে নিরাপত্তা হুমকি
Advertisement
বর্তমানে সৌদি আরবকে একসঙ্গে তিনটি দিক থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং ইরাকের সশস্ত্র মিলিশিয়ারা।
সম্প্রতি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাক থেকে ড্রোন হামলা এবং ইরানের নতুন হুমকির পর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে বিমান হামলা চালায়। এছাড়া একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্চ মাসের শেষ দিকে সৌদি বিমান বাহিনী ইরানের ভেতরেও গোপন প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল। যদিও এই হামলার বিষয়ে সৌদি আরব বা ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি।
হরমুজ প্রণালি
হুথিদের হামলায় নতুন সংকট
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করেও হামলার দাবি করেছে।
এর জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দরে হুথিদের সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব স্থাপনা ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
হুথিদের নৌ অবরোধের কারণে লোহিত সাগর হয়ে সৌদি তেল রপ্তানিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। এ লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যদিও কোন কোন দেশ এতে অংশ নেবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইরাক থেকেও ড্রোন হামলা
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা রাজধানী রিয়াদ এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে সৌদি বিমান বাহিনী পূর্ব ইরাকে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালায়। একই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয়। ওয়াশিংটন জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন>ইরানজুড়ে নতুন করে মার্কিন হামলাইরানকে অস্ত্র দিচ্ছে চীন, মজুত ফুরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের: নতুন বাস্তবতাইরাকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ওপর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, নিহত ৮
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠক
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মোকাবিলার সব ধরনের বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।
একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তার দাবি, আলোচনায় কূটনৈতিক সমাধান, অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং বড় ধরনের সামরিক হামলা সবই বিবেচনায় ছিল। তবে নেতানিয়াহু নতুন করে হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দেননি।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইরানে নতুন মার্কিন হামলা
এই বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে।
হামলার সময় ইরানের কেশম, কিশ, বন্দর আব্বাস, আবাদান ও বুশেহর এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ইরান জানায়, তারা জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ওমানের দেওয়া হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
যুদ্ধের প্রভাব শুধু নিরাপত্তায় নয়, সৌদি অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ২০১৮ সালের পর সবচেয়ে বড় বাজেট ঘাটতির মুখে পড়ে।
উচ্চ তেলের দাম কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের পরিধিও কমিয়ে আনা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য কোন দিকে?
চলমান সংঘাতে এখন মধ্যপ্রাচ্যের আরও দেশ জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। লোহিত সাগর, হরমুজ প্রণালি, ইরাক, ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরব এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন। একদিকে পাল্টা হামলা চালালে বড় আকারের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে নীরব থাকলে প্রতিপক্ষ আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
ফলে নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, সিএনএন
এমএসএম