বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় আবেদন জানানো দরকার। ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ নিয়ে আর এত মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? এগুলো ফলাতে বৃষ্টি লাগে, সার লাগে, সেচ লাগে, কৃষক লাগে। তারপরও কখনো বন্যা, কখনো খরা, কখনো সিন্ডিকেট, কখনো আমদানির ধাক্কায় সব মাঠে মারা যায়। তার চেয়ে একটি নতুন গবেষণা কেন্দ্র খুলুন—‘জাতীয় কোটিপতি উৎপাদন গবেষণা ইনস্টিটিউট’। কারণ এই দেশে একমাত্র কোটিপতিই এমন এক ফসল, যার চাষাবাদে জমি লাগে না, বীজ লাগে না, আবহাওয়া লাগে না, পোকাও ধরে না। অথচ ফলন এমন যে কৃষিবিজ্ঞানীরা লজ্জায় বই বন্ধ করে দিতে পারেন।
Advertisement
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মাত্র তিন মাসে দেশে কোটিপতি বেড়েছে ২ হাজার ২০৯ জন। হিসাবটা একটু ভেঙে দেখি। দিনে প্রায় ২৫ জন। অর্থাৎ ঘণ্টায় একজন নতুন কোটিপতি। পৃথিবীর কোনো প্রসূতি হাসপাতালেও সম্ভবত এত নিয়মিত জন্মহার নেই। মনে হচ্ছে, দেশের সবচেয়ে সফল ‘ডেলিভারি ইউনিট’ এখন মাতৃসদন নয়, অর্থনীতি।
আমরা এতদিন ভুল করে এসেছি। ভাবতাম, দেশের প্রধান শিল্প তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স কিংবা ওষুধ। এখন বোঝা যাচ্ছে, আসল শিল্প ছিল অন্য জায়গায়। সেটির নাম ‘কোটিপতি উৎপাদন শিল্প’। এই শিল্পে বিদ্যুতের সংকট নেই, গ্যাসের সংকট নেই, ডলার সংকট নেই, শ্রমিক ধর্মঘট নেই। শুধু উৎপাদন আর উৎপাদন। এমন উৎপাদন দেখে জাপানও হয়তো ঈর্ষা করবে।
শৈশবে একটা গল্প পড়েছিলাম। এক গরিব কাঠুরে বনে গিয়ে জিনের প্রদীপ পেয়ে রাতারাতি ধনী হয়ে গেল। তখন মনে হয়েছিল, ওসব রূপকথা। এখন বুঝি, রূপকথা পুরোপুরি মিথ্যা ছিল না। শুধু প্রদীপটা আরবের মরুভূমিতে নয়, সম্ভবত আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোথাও লুকানো আছে। কেউ একজন নীরবে প্রদীপে ঘষা দিচ্ছেন, আর জিন বলছে, ‘হুকুম করুন, আপনার অ্যাকাউন্টে আর কত শূন্য লাগবে?’
Advertisement
অবশ্য কোটিপতি হওয়া কোনো অপরাধ নয়। একজন মানুষ যদি মেধা দিয়ে, প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে, কারখানা গড়ে, হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কোটিপতি হন, তাঁকে অভিনন্দন জানানো উচিত। তিনি অর্থনীতির সম্পদ। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই ওঠে, যখন নতুন কারখানার খবর কমে যায়, নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি শুকিয়ে যায়, উদ্যোক্তারা ঋণের জন্য ব্যাংকের দরজায় দরজায় ঘোরেন, অথচ কোটিপতির সংখ্যা রকেটগতিতে বাড়তে থাকে। তখন মনে হয়, অর্থনীতির নিউটনের সূত্র বদলে গেছে। এখানে মাধ্যাকর্ষণ নিচের দিকে টানে না; টাকা কেবল ওপরের দিকেই ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি তথ্য আরও চমকপ্রদ। দেশে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে, এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১৫ জন। শুনে বুকটা হু হু করে উঠল। আহারে, মাত্র ১৫ জন! আমরা তো ভেবেছিলাম, কয়েক হাজার হবে! পরে বুঝলাম, এঁরা সাধারণ মানুষ নন। এঁরা অর্থনীতির হিমালয়। তাঁরা এত উঁচুতে থাকেন যে নিচে মানুষের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আর কানে পৌঁছায় না।
আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার রসবোধও অসাধারণ। কোনো কৃষক যদি পাঁচ লাখ টাকা জমা দিতে যান, প্রশ্ন শুরু হবে, ‘টাকার উৎস কী? জমির কাগজ আছে? ফসল বিক্রির রসিদ আছে? আয়কর দেন?’ কিন্তু যদি কেউ চকচকে গাড়ি থেকে নেমে শত কোটি টাকার হিসাব নিয়ে ঢোকেন, তখন দৃশ্য বদলে যায়। ব্যাংকের কর্মকর্তা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। চায়ের ট্রে আসে। কফির কাপ আসে। হাসি আসে। শুধু একটি জিনিস আসে না—অতিরিক্ত প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাই একটি বিনীত প্রস্তাব। পরের বার যখন কোটিপতির সংখ্যা প্রকাশ করবেন, তখন পাশে আরও চারটি সংখ্যা লিখবেন। কতজন মানুষের ব্যাংক হিসাবে মাস শেষে এক হাজার টাকাও অবশিষ্ট থাকে না। কতজন শিক্ষিত বেকার চাকরির বয়সসীমা পার করেছেন। কতজন কৃষক ন্যায্য দাম না পেয়ে লোকসানে আছেন। আর কতজন মধ্যবিত্ত বাজারে গিয়ে দামের তালিকা দেখে শুধু দীর্ঘশ্বাস কিনে বাড়ি ফিরেছেন।
Advertisement
এই দেশে প্রশ্নেরও শ্রেণিবৈষম্য আছে।
একজন রিকশাচালকের ২০ হাজার টাকা সন্দেহজনক। কিন্তু কারও ২০০ কোটি টাকা সম্মানজনক। আমাদের অর্থনীতি সত্যিই ভদ্রলোক।
এক বৃদ্ধের গল্প শুনেছিলাম। মাসের শেষে ব্যাংকে গিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, ‘বাবা, আমার পেনশনের টাকাটা ঢুকেছে?’
কর্মকর্তা বললেন, ‘লাইন ধরে দাঁড়ান।’
ঠিক তখনই এক ভিআইপি ঢুকলেন। কর্মকর্তা চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, ‘স্যার, কষ্ট করে কেন এসেছেন? একটা ফোন দিলেই তো আমরা বাসায় চলে যেতাম!’
এই গল্পটি সত্য কি না জানি না। তবে আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে এর দূরত্ব খুব বেশি নয়।
অর্থনীতিবিদেরা প্রায়ই বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি হয়েছে।’ সত্যিই হয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি কার? বাজারে গেলে সাধারণ মানুষ এখন ডিম কেনার আগে ক্যালকুলেটর বের করেন। মাংস কেনার আগে পারিবারিক বৈঠক বসে। ইলিশ মাছ এখন মাছ কম, পারিবারিক অনুষ্ঠান বেশি। মাসের ২০ তারিখের পর মধ্যবিত্তের মানিব্যাগ এমন নীরব হয়ে যায়, যেন সেখানে কোনো দিন টাকা বলে কিছু ছিলই না।
অন্যদিকে কারও কারও জন্য কোটি টাকা এখন আর সংখ্যা নয়, অভ্যাস। তাঁদের মোবাইলে এসএমএস আসে, ‘আপনার হিসাবে আরও ৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে।’
মধ্যবিত্তের ফোনে আসে, ‘আপনার ইন্টারনেট প্যাকেজের মেয়াদ আজ শেষ।’
দুটি এসএমএস। দুটি বাংলাদেশ।
আমাদের দেশে এখন দুটি সমান্তরাল অর্থনীতি চলছে। এক অর্থনীতিতে মানুষ চাল, ডাল, তেল আর স্কুল ফি মেলাতে না পেরে রাতে ঘুমাতে পারেন না। আরেক অর্থনীতিতে মানুষ ভাবছেন, সিঙ্গাপুরে অ্যাপার্টমেন্ট কিনবেন, নাকি দুবাইয়ে ভিলা নেবেন।
প্রথম অর্থনীতির মানুষ ঋণের কিস্তি শোধ করেন। দ্বিতীয় অর্থনীতির মানুষ ঋণ পুনঃতফসিল করেন। প্রথম অর্থনীতির মানুষ ব্যাংকে গিয়ে ঋণ চান। দ্বিতীয় অর্থনীতির মানুষ ব্যাংককেই ঋণ দেন; অবশ্য টাকাটা কোথা থেকে এল, সে প্রশ্নটি খুব একটা করা হয় না।
সবচেয়ে মজার বিষয়, যখনই কোটিপতির সংখ্যা বাড়ে, তখন একদল মানুষ গর্বভরে বলেন, ‘দেখুন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’
তাঁদের কথা শুনে মনে পড়ে সেই রাজা-উজিরের গল্প। উজির বললেন, ‘মহারাজ, রাজ্যে সবাই সুখে আছে।’ রাজা ছদ্মবেশে বের হয়ে দেখলেন, কৃষক শুকনো রুটি পানিতে ভিজিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কী করছ?’ কৃষক বলল, ‘চোখ বন্ধ করে ভাবছি, এটা মাংসের ঝোল। না ভাবলে গিলতে পারব না।’ রাজা সেদিন বুঝেছিলেন, রাজপ্রাসাদের জানালা দিয়ে পুরো রাজ্য দেখা যায় না।
আমাদেরও সেই একই সমস্যা। কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, এটি নিশ্চয়ই খবর। কিন্তু একই সময়ে কতজন মানুষের সঞ্চয় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে, সেটিও খবর। কতজন তরুণ চাকরির বয়স পার করে ফেলছেন, সেটিও খবর। কতজন কৃষক ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে জমি বিক্রি করছেন, সেটিও খবর। কতজন মধ্যবিত্ত বাবা সন্তানের কোচিং ফি দিতে গিয়ে নিজের ওষুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন, সেটিও খবর।
সংখ্যারও চরিত্র আছে। কিছু সংখ্যা গর্বের, কিছু সংখ্যা লজ্জার। দুর্ভাগ্য হলো, আমরা এখন শুধু গর্বের সংখ্যাগুলো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে লিখি, লজ্জার সংখ্যাগুলো মানুষের রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাই একটি বিনীত প্রস্তাব। পরের বার যখন কোটিপতির সংখ্যা প্রকাশ করবেন, তখন পাশে আরও চারটি সংখ্যা লিখবেন। কতজন মানুষের ব্যাংক হিসাবে মাস শেষে এক হাজার টাকাও অবশিষ্ট থাকে না। কতজন শিক্ষিত বেকার চাকরির বয়সসীমা পার করেছেন। কতজন কৃষক ন্যায্য দাম না পেয়ে লোকসানে আছেন। আর কতজন মধ্যবিত্ত বাজারে গিয়ে দামের তালিকা দেখে শুধু দীর্ঘশ্বাস কিনে বাড়ি ফিরেছেন।
তাহলে দেশের অর্থনীতির আয়নাটা একটু পরিষ্কার হবে।
নইলে ইতিহাস একদিন লিখবে, এক অদ্ভুত দেশের কথা, যেখানে কোটিপতিরা জন্মাতেন ঋতুভিত্তিক বাম্পার ফলনের মতো, আর মধ্যবিত্ত বিলুপ্ত হতেন মাসিক কিস্তির মতো নীরবে।
তখন অর্থনীতির বইয়ে নতুন একটি সংজ্ঞা যোগ হবে, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে প্রবৃদ্ধি সব সময় অন্তর্ভুক্ত থাকে কেবল প্রবৃদ্ধির মধ্যেই; জনগণ থাকে ফুটনোটে।’
লেখক : জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট।
এইচআর/জেআইএম