দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল পঞ্চগড়ে প্রতি বছর বাড়ছে চা পাতার উৎপাদন। কিন্তু চলতি ভরা মৌসুমে ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এতে নষ্ট হচ্ছে চা বাগান। অনেকে পাতা উত্তোলনের পরিবর্তে চা গাছের আগা কেটে দিয়েছেন। কচি পাতার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় অনেক বাগানের উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে।
Advertisement
চাষিরা বলছেন, বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। চলতি মৌসুমে কাঁচা পাতার দাম ভালো পেলেও শুধুমাত্র পোকা-মাকড়ের দাপটে লোকসানের শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র চা চাষিরা।
‘বর্ষা মৌসুমে সাধারণত চা গাছে দ্রুততম সময়ে নতুন কুঁড়ি ও পাতা গজায়, যা ৯ মাসে চা উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ঠিক এসময়েই বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে’
পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড বলছে, এটি মৌসুমি সমস্যা। পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ফলনও ব্যাহত হচ্ছে। তবে এজন্য চা চাষিদের অজ্ঞতা, ভালো মানের কীটনাশক না পাওয়া এবং কীটনাশকের অপ্রয়োগকে দায়ী করছে চা বোর্ড।
Advertisement
পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচতে চা বাগানে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন চাষিরা/ছবি-জাগো নিউজ
চা বোর্ড সূত্র জানায়, উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সমতলের চা এখন অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর সমতল জমিতে চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতি বছর বাড়ছে চা চাষের পরিধি। গতবছর চা উৎপাদন মৌসুমে এক হাজার ৫২৮টি নিবন্ধিতসহ মোট সাত হাজার ৩৪৮টি ছোট-বড় চা বাগানে মোট আট কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ দশমিক ৮৭ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয়েছে। তৈরিকৃত চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৬ কেজি। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি চা কারখানা কাঁচাপাতা সংগ্রহ করে তৈরিকৃত চা উৎপাদন করছে।
চা বাগান মালিক ও চাষিরা বলছেন, চা উৎপাদনের হিসেবে চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত পেয়েছে পঞ্চগড়ের সমতলের চা। এবার চায়ের ফলনও ভালো হয়েছিল। তবে চা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা বাগান।
চা উৎপাদনের হিসেবে চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত পেয়েছে পঞ্চগড়ের সমতলের চা। এবার চায়ের ফলনও ভালো হয়েছিল। তবে চা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা বাগান’
Advertisement
পঞ্চগড় উপজেলা সদরসহ তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার কয়েক হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমতলের চা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষুদ্র চা চাষের বিস্তারের ফলে জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অনেক পরিবার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র চা কারখানা, সংগ্রহ কেন্দ্র ও পরিবহনভিত্তিক ব্যবসা।
চা বাগানে কীটনাশক প্রয়োগের প্রস্তুতি চলছে/ছবি-জাগো নিউজ
সরেজমিন দেখা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবারও চায়ের সবুজে ভরে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে মৌসুমের শুরু থেকেই অন্য মৌসুমের তুলনায় উৎপাদনও বেড়ে গেছে।
সাধারণত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলে চায়ের উৎপাদন। এসময়ের মধ্যে ৭-১০ দফায় বাগান থেকে চা পাতা তোলা হয়। তবে জুলাই-আগস্ট চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে ৩-৪ দফায় চা পাতা তোলা হয়।
‘আমরা ক্ষুদ্র চা চাষি। ২-৩ বিঘা জমিতে চা চাষ করেছি। এবার ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন ধরে পোকার আক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও এলাকায় অনেকে চা উত্তোলন করতে পারেননি’—চা চাষি
তবে চাষিরা বলছেন, পোকা-মাকড়ের কারণে চাহিদামতো পাতা পাচ্ছেন না তারা। বিশেষ করে লাল মাকড়সা, লুপার ক্যাটারপিলার, কারেন্ট পোকা, মশক পোকা, শুশুনি পোকার আক্রমণে দিশাহারা চা চাষিরা। অতিরিক্ত খরচে বারবার কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না বলে জানান তারা।
বর্ষা মৌসুমে সাধারণত চা গাছে দ্রুততম সময়ে নতুন কুঁড়ি ও পাতা গজায়, যা ৯ মাসে চা উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ঠিক এসময়েই বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
আরও পড়ুন চা শিল্পের উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর, কমিটি গঠনচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন চা বাগানে প্রথমে পাতার নিচে ছোট ছোট লাল মাকড়সা দেখা যায়। এরপর পাতার সবুজ অংশ শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। অন্যদিকে লুপার ক্যাটারপিলার কচি পাতা খেয়ে ফেলে। এতে নতুন পাতা গজাতেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ফলে নির্ধারিত সময়েও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাতা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
কচি চা পাতা শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে পড়ে যাচ্ছে/ছবি-জাগো নিউজ
পাতা তোলার বিপরীতে অনেক ক্ষুদ্র চা চাষি বাগান থেকে পাতা কর্তন (কাটিং) করে ফেলে দিয়েছেন। চা বোর্ডের পক্ষ থেকে আক্রান্ত বিভিন্ন বাগান নিয়মিত পরিদর্শন করে নির্ধারিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, আক্রান্ত পাতা অপসারণ, সময়মতো স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক চাষির অভিযোগ, বাস্তবে এসব পরামর্শ মেনে চললেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কয়েক দিন পর আবার নতুন করে পোকার আক্রমণ দেখা দিচ্ছে।
আরও পড়ুন ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে চা-শ্রমিকদের বিক্ষোভউপজেলা সদরের জগদল এলাকার রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র চা চাষি। ২-৩ বিঘা জমিতে চা চাষ করেছি। এবার ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন ধরে পোকার আক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও এলাকায় অনেকে চা পাতা উত্তোলন করতে পারেননি।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাগানে লুপার ক্যাটারপিলার পোকার আক্রমণ হয়েছে। এই এক জাতের পোকার জন্য তিনবার করে ওষুধ (কীটনাশক) দিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। কীটনাশকের দামও বেশি। আমাদের খরচ বেড়ে গেছে, আবার পোকার জন্য উৎপাদনও কমে গেছে।’
আরও পড়ুন খালি পেটে গ্রিন টি পানের আগে যা জানা জরুরিএকই উপজেলার সদর ইউনিয়নের চৈতন্যপাড়া এলাকার চা চাষি জাহেদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এখানে সবার বাগানেই পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। পোকার কারণে চায়ের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে, লাল হয়ে যাচ্ছে। এত ওষুধ (কীটনাশক) দেই কোনো কাজ হয় না। বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ বদল করে দিয়েছি। আমাদের খরচ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ওষুধে কোনো কাজ হচ্ছে না। পোকা যায় না। আমাদের বাগানে লাল মাকর, লোপার, শুশুনি পোকাসহ নানান জাতের পোকা লেগেছে। ওষুধেই কোনো ভেজাল আছে নাকি, তাও বুঝি না।’
জগদল লাল স্কুল এলাকার চা বাগান মালিক রহিমুল ইসলাম। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতি রাউন্ডেই তিন থেকে চারবার কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। কীটনাশকের দামও দ্বিগুণ বেড়েছে। এতে খরচ আমাদের অনেক বেড়েছে। অথচ উৎপাদন কমেছে। আমরা সাধারণত বিঘা প্রতি ১০০০-১২০০ কেজি পর্যন্ত কাঁচা পাতা পাই। এখন ৮০০-৯০০ কেজির বেশি পাওয়া যায় না। চা উৎপাদন এবার অনেক কমে যাবে।’
আরও পড়ুন বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা, এক কেজির দাম কোটি টাকাএকইভাবে হতাশার কথা জানান তেঁতুালিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার ক্ষুদ্র চা চাষি আমজাদ হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন,‘ প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ পাতা তুলতাম, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। চা বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিয়েছি, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবার পোকার আক্রমণ শুরু হচ্ছে। একদিকে ওষুধের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয়ও কমে গেছে। দাম ভালো থাকলেও আমরা পোকা-মাকড়ের কারণে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের পঞ্চগড় জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম জুয়েলের ভাষ্য, ‘একই ধরনের কীটনাশক দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে অনেক ক্ষেত্রে পোকার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও চা বোর্ডের যথাযথ পরামর্শ। তবে শুধু রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে জৈবিক ও পরিবেশবান্ধব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।’
আরও পড়ুন উৎপাদন খরচের চাপে চা শিল্পতিনি বলেন, ‘চা বাগানে এই পোকার আক্রমণ মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। গবেষণার মাধ্যমে কোন এলাকায় কোন ধরনের পোকা কী কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তা নির্ণয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে বলে আমি মনে করি।’
পঞ্চগড় বিসিক এলাকার কর্ণঝরা চা কারখানার স্বত্বাধিকারী আব্দুল মজিদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে চা চাষিরা চায়ের ভালো দাম পাচ্ছেন। কারণ চায়ের ভরা মৌসুমে আমরা কারখানা মালিকরা চাহিদামতো চা পাচ্ছি না। বিভিন্ন বাগানে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য উৎপাদন কমে যাওয়া চাহিদা অনুযায়ী চায়ের কাঁচা পাতা পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের হিসাব অনুযায়ী আমরাও চা উৎপাদন করতে পরবো না।’
আরও পড়ুন চায়ের বিল না দিয়ে উল্টো ‘সম্মান’ দাবি ভুয়া পুলিশের, ভিডিও ভাইরালপঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আমির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার চায়ের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বিভিন্ন বাগানে পোকা-মাকড়ের কিছু আক্রমণ রয়েছে। এ কারণে ফলন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে চা চাষিদের কিছুটা অজ্ঞতা এবং কীটনাশকের অপপ্রয়োগসহ ভালো মানের কীটনাশক না পাওয়ার কারণেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘চা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে চাষিদের যথাযথ পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এটা যেহেতু একটি মৌসুমভিত্তিক কীটপতঙ্গের আক্রমণ, এজন্য মৌসুম শেষে এমনিতেই আক্রমণ অনেকটা কমে যাবে। আশা করছি, সার্বিকভাবে উৎপাদনে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না।’
এসআর/জেআইএম