‘স্বপ্না, তুমি যদি কোথাও থেকে এই পোস্টারটি দেখো, একবার শুধু যোগাযোগ করো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার অপেক্ষায় থাকবো।’
Advertisement
এমন আবেগঘন বার্তা লিখে প্রায় দুই দশক আগে হারিয়ে যাওয়া স্কুলজীবনের এক সহপাঠীকে খুঁজছেন আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার সাবেক বাসিন্দা মো. মাসুদ রানা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ হিসেবে তিনি এলাকার বিভিন্ন সড়ক, বিদ্যুতের খুঁটি, দেওয়াল ও পাড়া-মহল্লায় পোস্টার সাঁটিয়েছেন। বিষয়টি স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে তার এমন উদ্যোগ।
আরও পড়ুন ১৩৪ কোটি টাকার গবেষণা প্রকল্পে ২২ উটপাখির ১৫টিই জবাই!সম্প্রতি আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার স্পেকট্রাম গার্মেন্টস সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দেওয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি ও বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের পোস্টার লাগানো রয়েছে। বড় অক্ষরে লেখা, ‘স্বপ্না, স্বপ্না’। নিচে লেখা, ‘একটি মানুষকে খুঁজছি। যদি কেউ চিনে থাকেন, দয়া করে জানাবেন।’
Advertisement
পোস্টারে মাসুদ রানা উল্লেখ করেন, ২০০৭ সালে জিরাবো স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বপ্না নামে তার এক সহপাঠী ছিল। মেয়েটির গালে একটি তিল ছিল। ঈদের ছুটির পর হঠাৎ করেই সে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। পরে জানতে পারেন, পরিবারের আর্থিক কারণে স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করে সে।
পোস্টারে আরও দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে জিরাবো, পুকুরপাড় ও আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানায় স্বপ্নার চাকরির তথ্য পেয়ে বারবার সেখানে গিয়ে খোঁজ করেছেন মাসুদ। কিন্তু কখনোই তার দেখা পাননি। সবশেষ ২০১৬ সালের পর পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানায় কাজ করার তথ্য জানলেও এরপর আর কোনো সন্ধান মেলেনি।
নিজের বর্তমান অবস্থার কথাও পোস্টারে উল্লেখ করেন তিনি। সেখানে লিখেছেন, ২০১৮ সাল থেকে একটি পোশাক কারখানায় টেকনিক্যাল ম্যানেজার (মার্কেটিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি চাকরির কারণে গাজীপুরের মাওনা এলাকায় চলে যেতে হয়েছে। ফলে আগের মতো জিরাবো এলাকায় এসে পরিচিতদের কাছে খোঁজ নেওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই এটিকেই তিনি স্বপ্নাকে খুঁজে পাওয়ার ‘শেষ চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পোস্টারের নিচে নিজের নাম ও একটি মোবাইলফোন নম্বরও দিয়েছেন মাসুদ রানা।
আরও পড়ুন জুলাই গণঅভ্যুত্থান / ‘পুলিশের গুলিতে’ শহীদ হলেও আসামির তালিকায় নেই পুলিশের নামওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে মাসুদ রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে পড়তাম। আমি তাকে পছন্দ করতাম, কিন্তু কখনো সেটা বলা হয়নি। তার কোনো ছবি বা ফোন নম্বর আমার কাছে নেই। বহু বছর ধরে বিভিন্নভাবে খোঁজ করেছি। এখন চাকরির কারণে অন্য এলাকায় চলে এসেছি। তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে পোস্টার ছাপিয়েছি।’
Advertisement
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। শুধু একবার জানতে চাই, সে কেমন আছে। জীবনে অন্তত একবার তার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
মাসুদ রানা জানান, পোস্টার লাগানোর পর অনেকেই ফোন করে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে স্বপ্নার কোনো খোঁজ মেলেনি।
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যেও কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। জিরাবো এলাকার বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান বলেন, ‘গান-কবিতায় শহরময় পোস্টার লাগানোর কথা শুনেছি। কিন্তু বাস্তবে একজন পুরোনো সহপাঠীকে খুঁজতে এভাবে পোস্টার লাগাতে দেখিনি। বিষয়টি সত্যিই ব্যতিক্রমী। আশা করি, তারা একদিন দেখা করতে পারবেন।’
স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার কর্মী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক পোস্টার তো সব সময়ই দেখি। কিন্তু একজন পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে পাওয়ার জন্য এমন পোস্টার আগে কখনো চোখে পড়েনি। বিষয়টি মানবিক এবং আবেগের।’
এসআর/জেআইএম