মতামত

শত্রুর সঙ্গেও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয় ইসলাম

সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সুবিচার অত্যন্ত জরুরি। যেখানে সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা থাকে না, সেই সমাজে অন্যায়-অবিচার, জুলুম-শোষণ ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে।

Advertisement

ইসলাম একটি শান্তি প্রিয় ধর্ম এবং এর শিক্ষা অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের। ইসলামের শিক্ষাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো : সমাজ ও দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এটি এমন এক অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা যে, প্রত্যেক ন্যায় পরায়ন অমুসলিমও এই শিক্ষা শুনে প্রশংসা না করে পারে না। কিন্তু তারা প্রশ্ন করে, এ শিক্ষার ওপর মুসলমানদের আমল কোথায়?

পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের উদ্দেশ্য এবং তিনি নিজ আমল দ্বারা সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষমও হয়েছিলেন।

যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘বল, আমার প্রভু আমাকে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ২৯)

Advertisement

অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি।’ (সুরা আশ শুরা, আয়াত : ১৫)

আল্লাহতায়ালার অনুপম শিক্ষা এবং ইসলামের সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির বহিঃপ্রকাশ তখনই সম্ভব হবে, যখন প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহপাকের প্রতিটি আদেশের ওপর আমল করবে।

ন্যায়বিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের ঘর, সমাজ, আপন-পর, এমনকি শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার সাথে ন্যায়সূলভ ব্যবহারের মাধ্যমেই মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে আমরা নিজেকে দাবি করতে পারি। এছাড়া কেবল শ্রেষ্ঠনবির উম্মতের দাবির মাঝে কোনো মাহাত্ম্য নেই, আমাদের কর্মের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে।

আমরা যখন সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো, তখন আমরা যেমন আল্লাহর রসুলের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে পরিগণিত হবো আর অপর দিকে দেশও হবে সুখী-সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ।

Advertisement

ন্যায় বিচারের উচ্চ মানদণ্ড সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ হলো, ‘তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ কর তা অন্যদের জন্যও পছন্দ কর’।

আমরা যদি এই হাদিসের ওপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হই, তাহলেই কেবল ন্যায়বিচার সম্ভব।

সাধারণত আমরা কী দেখি, নিজের অধিকার পুরো আদায়ের ক্ষেত্রে বদ্ধ পরিকর অথচ অন্যের অধিকারের প্রতি সামান্যতম চিন্তা করি না। সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য আমাদেরকে যদি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বয়োজ্যেষ্ঠদের অসন্তুষ্টিরও সম্মুখীন হতে হয়, তারপরও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। আমরা যখন নিজেরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকব, তখনই আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারব, এছাড়া নিজের মধ্যেই যদি ন্যায়পরায়ণতা না থাকে, তাহলে অপরকে কীভাবে ন্যায়ের উপদেশ দিব?

ইসলামের শিক্ষা কতই না চমৎকার, বলা হয়েছে, শত্রুরাও যদি তোমাদের কাছ থেকে ন্যায় বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষী হয়, তারাও যেন তা পায়। কারো বিরোধিতা আমাদেরকে যেন ন্যায় বিচার বা সত্যতা থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

আমাদের হৃদয় যেন সব ধরনের শত্রুতা থেকে মুক্ত থাকে। আমরা যেন আল্লাহ পাকের কাছে এই ঘোষণা করতে পারি, হে আল্লাহ! কারো সাথে আমাদের কোনো বিদ্বেষ ও শত্রুতা নেই।

আল্লাহতায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান থাক, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এতটা উত্তেজিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করা ত্যাগ করবে, সুবিচার কর, এটা তাকওয়ার নিকটবর্তী, তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকিবহাল।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৮)

আজ পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, সত্যের বিস্তার করার জন্য, শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য মুসলমানদের ওপর অনেক বড়ো দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে, অথচ যারা ন্যায়বিচারের জন্য আদিষ্ট হোন, তাদের অধিকাংশই আজ আল্লাহপাকের এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশকে ভুলে বসেন।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম ন্যায়বিচার। তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার করতেন। বিচারের ক্ষেত্রে আপন-পর ও শত্রু-মিত্র সবাই তার দৃষ্টিতে সমান ছিল। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান দর্শন মহানবির (সা.) বিচারের মূলনীতি ছিল।

হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, মাখজুম গোত্রের এক চোর নারীর ঘটনা কোরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অত্যন্ত উদ্‌বিগ্ন করে তুলল। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগল, এ ব্যাপারে রসুল (সা.)-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারে? তার বলল, একমাত্র মহানবির (সা. প্রিয়তম উসামা বিন যায়েদ (রা.) এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা (রা.) নবিজির (সা.) সঙ্গে কথা বললেন। মহানবি (সা.) বললেন, ‘তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘকারিণীর সাজা মওকুফের সুপারিশ করছ?’ এরপর মহানবি (সা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমাদের আগের জাতিগুলোকে এ কারণেই ধ্বংস করা হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিত।

অন্যদিকে যখন কোনো অসহায় গরিব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমাও চুরি করত, তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম!’ (বুখারি)

আরেকটি ঘটনা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে মক্কার ৭০ জন কাফের বন্দি হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন মহানবির (সা.) আপন চাচা হজরত আব্বাস ও জামাতা হজরত আবুল আস ইবনে রবি। তারা তখনও মুসলমান হননি। বন্দিদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছিল- সবাইকে মুক্তিপণ পরিশোধ করতে হবে। মুক্তিপণ ছাড়া কাউকে মুক্তি দেওয়া হবে না। মহানবি (সা.) এই সিদ্ধান্ত মান্য করে তাদের কাছ থেকেও মুক্তিপণ আদায় করেন।

আমরা যারা নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করি, আমাদের প্রত্যেককে এই অঙ্গীকার করা উচিত, আমরা নিজেদের ঘর এবং সমাজের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ ও দেশকে জান্নাত সাদৃশ্য বানাবো। পৃথিবীতে প্রকৃত ন্যায়ের শিক্ষা সুস্পষ্ট করে পৃথিবীকে ধ্বংসের গহ্বরে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষাকারী হব।

সমগ্র বিশ্ব আজ অত্যন্ত বিপৎসংকুল ধ্বংসের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। মুসলমান, অমুসলিম কারো মাঝে আজ ইনসাফ অবশিষ্ট নেই আর কেবল যে ইনসাফই অবশিষ্ট নেই তা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জুলুম-অত্যাচারের সব সীমা ডিঙিয়ে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর চোখ উন্মোচন আর অন্যায় থেকে বিরত রাখার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব কেবল মুসলমানরাই পালন করতে পারে। কেননা, মুসলমানদেরকে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনের মতো এমন এক মহা শক্তিশালী অস্ত্র দান করেছেন, যার ছায়াতলে আশ্রয় নিলে সবাই মুক্তি পেতে পারে।

আল্লাহতায়ালা যাদের ওপর সমাজ ও দেশের বিচারকার্য পরিচালনার ভার ন্যস্ত করেছেন, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তারা যেন ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণ হক আদায় করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।’ (সুরা আন নিসা, আয়াত : ৫৮)

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক আরো ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি তাদের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করলে সুবিচার করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪২)

হাদিসে এসেছে, হজরত ইবনে বুরাইদা (রা.) তার পিতার সূত্রে বলেন, মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার বিচারক জান্নাতি এবং অপর দুই প্রকার বিচারক জাহান্নামি। জান্নাতি বিচারক হলো, যে সত্যকে বুঝে সে অনুযায়ী ফয়সালা দেয়। আর যে বিচারক সত্যকে জানার পর স্বীয় বিচারে জুলুম করে, সে জাহান্নামি এবং যে বিচারক অজ্ঞতাপ্রসূত ফয়সালা দেয়, সেও জাহান্নামি।’ (সুনানে আবি দাউদ)

আরেক হাদিসে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ন্যায়বিচারক শাসক কিয়ামতের দিনে আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম) তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় সবার প্রতি সমান আচরণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আবশ্যক; ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল সবার জন্য প্রযোজ্য। ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা রক্ষাই হলো বিচারের মূল উদ্দেশ্য। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ফলেই শান্তির বাতাস প্রবাহিত হয়।

আমাদের সবার হজরত আবু হানিফা (রহ.)-এর ন্যায়বিচার সম্পর্কে মনে আছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যবসায়ী। তিনি কখনো ব্যাবসায়িক লেনদেনে প্রতারণা করতেন না এবং সর্বদা গ্রাহকদের সঠিক মূল্য দিতেন। তার সততা, বিশ্বস্ততা ও নীতিবোধের কারণে অনেকেই তাকে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে তুলনা করতেন।

তিনি খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের সময় বিচারকের পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মনে করতেন যে, বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে তিনি ন্যায়বিচার করতে নাও পারেন বা অন্যায়ের স্বীকার হতে পারেন। খলিফা তার এই অস্বীকৃতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন এবং সেখানেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

বর্তমান সময়ে ন্যায়বিচারের বড়োই অভাব আর এ কারণেই বিশ্বের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা আর অরাজকতা দেখা দিচ্ছে। সমাজ, দেশ ও বিশ্বজুড়ে কেবল তখনই প্রকৃত শান্তি ফিরে আসতে পারে, যখন ঘোর শত্রুও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা পাবে। কেননা একমাত্র নিরঙ্কুশ ন্যায়বিচারেই পারে পৃথিবীকে শান্তি ও সম্প্রীতির ছায়াতলে নিয়ে আসতে।

আল্লাহতায়ালা শাসনকার্যে নিয়োজিত সবাইকে ন্যায়বিচার করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

এইচআর/জেআইএম