ইসলামের প্রথম শতক ছিল জ্ঞানচর্চার এক স্বর্ণযুগ। তখন কোরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, ইতিহাস ও আরবি সাহিত্য সব ক্ষেত্রেই গড়ে উঠছিলেন বহু মনীষী। সাহাবিদের হাতে যে জ্ঞানের আলো প্রজ্বলিত হয়েছিল, তাবেঈদের মাধ্যমে সেটিই ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে। সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রদের অন্যতম ছিলেন ইমাম আমের ইবনে শারাহিল আশ-শা’বি (রহ.)। যিনি ইতিহাসে শুধু একজন মুহাদ্দিস বা ফকিহ হিসেবেই নন, বরং এক বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির অধিকারী, বহুমাত্রিক জ্ঞানী এবং অসাধারণ শিক্ষক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
Advertisement
তার জীবন সম্পর্কে পড়লে মনে হয়, আল্লাহ তাআলা যেন একজন মানুষের মধ্যে স্মরণশক্তি, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং জ্ঞানপিপাসার এক বিরল সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। এমনকি তার সমসাময়িক অনেক বড় সাহাবি ও তাবেঈও তার জ্ঞানের গভীরতার প্রশংসা করেছেন।
ইমাম শা’বি (রহ.) ২১ হিজরিতে খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা.) শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ণ নাম আমর ইবনে শারাহিল ইবনে আব্দ। উপনাম আবু আমর। ‘শা’বি’ ছিল তার পরিচিতি, যা তার গোত্রগত পরিচয়ের কারণে প্রচলিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই নামেই তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে যান।
তার জন্ম হয়েছিল হামাদানে যা বর্তমান ইরানের অন্তর্গত একটি প্রাচীন শহর। পরে তার পরিবার ইরাকের কুফায় চলে আসে। কুফা তখন ছিল ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন।
Advertisement
তিনি জন্মেছিলেন জমজ হিসেবে। তার সঙ্গে তার আরেক জমজ ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, জমজ হওয়ার কারণে তার শারীরিক গঠন ছিল কিছুটা দুর্বল ও ক্ষীণকায়। কিন্তু শরীরের এই দুর্বলতা কখনোই তার মানসিক শক্তি, স্মৃতিশক্তি কিংবা জ্ঞানের সাধনাকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি।
পাঁচ শতাধিক সাহাবির সাক্ষাৎ লাভতাবেঈদের মধ্যে অনেকেই অল্প কয়েকজন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম শা’বি (রহ.) এর সৌভাগ্য ছিল অসাধারণ। তিনি প্রায় পাঁচ শতাধিক সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। ফলে তিনি সরাসরি নববী যুগের সুবাস গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন।
তার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি জ্ঞান আহরণ করতেন সরাসরি সাহাবিদের কাছ থেকে। প্রায় আটচল্লিশ জন সাহাবির নিকট তিনি হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। সেই যুগে লিখে রাখার প্রচলন থাকলেও তিনি খুব কমই লিখতেন। তার প্রধান ভরসা ছিল স্মৃতিশক্তি।
দরসে বসে কোনো কিছু লিখে নেওয়ার পরিবর্তে তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তা সঙ্গে সঙ্গেই মুখস্থ করে ফেলতেন। একটি হাদিস মাত্র একবার শুনেই তা স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারতেন।
Advertisement
ইমাম শা’বি (রহ.) এর স্মৃতিশক্তি নিয়ে ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
তার সম্পর্কে বলা হতো, তিনি যে ইলম ভুলে গিয়েছেন, তা দিয়েই একজন মানুষ বড় আলেম হয়ে উঠতে পারে। এটি জ্ঞানের ব্যাপ্তি বোঝানোর জন্য সমকালীন আলেমদের একটি মূল্যায়ন।
নিজের স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি চাইলে টানা এক মাস কবিতা আবৃত্তি করতে পারব। কোনো কবিতা দ্বিতীয়বার বলতে হবে না।’
এ বক্তব্য অহংকারের প্রকাশ নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত এক অসাধারণ নেয়ামতের বর্ণনা। কারণ আরব সমাজে দীর্ঘ কবিতা মুখস্থ রাখা ছিল একটি বড় দক্ষতা। আর তিনি দাবি করেছিলেন, এক মাস ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন কবিতা শুনিয়ে যেতে পারবেন।
যাদের কাছে শিক্ষা নিয়েছেনইমাম শা’বির (রহ.) শিক্ষকদের তালিকা দেখলেই বোঝা যায় তার জ্ঞানের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী ছিল।
তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন সাহাবিদের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), আবু সাঈদ খুদরি (রা.), জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হাসান ইবনে আলি (রা.), উম্মুল মুমিনিন মাইমুনা (রা.), উম্মে সালামা (রা.), আসমা বিনতে উমাইস (রা.) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) প্রমুখ।
তাবেঈদের মধ্যেও তিনি আলকামা (রহ.), আসওয়াদ (রহ.) এবং প্রসিদ্ধ বিচারপতি কাজি শুরাইহের (রহ.) মতো মনীষীদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
এক সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মুখতার সাকাফির ভয়ে তাকে প্রায় আট মাস মদিনায় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ও তিনি নষ্ট করেননি। বরং এই সুযোগে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের (রা.) দরসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। আবার হারিস আল-আ’ওয়ারের নিকট গণিত ও ফারায়েজশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। অর্থাৎ প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও তিনি শিক্ষার সুযোগে রূপান্তর করেছিলেন।
যে দরসে বসতেন ভবিষ্যতের ইমামরাকুফায় ইমাম শা’বির (রহ.) দরস ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখনও বহু সাহাবি জীবিত ছিলেন এবং কুফাতেও অবস্থান করছিলেন। তবুও মানুষ তার জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং শিক্ষাদানের অনন্য পদ্ধতির কারণে তার দরসে সমবেত হতো।
তার ছাত্রদের তালিকাও কম গৌরবময় নয়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নাম নিঃসন্দেহে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)। পরবর্তীকালে যিনি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহে পরিণত হন।
এ ছাড়া আতা ইবনে সাইব, আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লা, মাকহুল শামি এবং আসেম আহওয়ালের মতো বিখ্যাত আলেমরাও তার ছাত্র ছিলেন।
একজন শিক্ষকের প্রকৃত যোগ্যতা অনেক সময় তার ছাত্রদের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। সে দিক থেকে ইমাম শা’বি (রহ.) ছিলেন একজন সফল শিক্ষক, যার হাতে গড়ে উঠেছিল পরবর্তী প্রজন্মের বহু মনীষী।
আরও পড়ুন হাদিসশাস্ত্রের অমর সাধক ইমাম বুখারী (রহ.) সমকালীন আলেমদের বিস্ময়কর মূল্যায়নইমাম শা’বি (রহ.) সম্পর্কে সমকালীন মনীষীদের মন্তব্য তার প্রকৃত মর্যাদা বুঝতে বিশেষ সহায়ক।
একদিন তিনি মাগাযি বা নবীজির (সা.) যুদ্ধসমূহের ইতিহাস আলোচনা করছিলেন। সেই সময় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সেখানে এসে তার বক্তব্য শুনে বলেন, ‘এই ব্যক্তি এমনভাবে যুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করছে যেন সে নিজেই যুদ্ধগুলো প্রত্যক্ষ করেছে। এ বিষয়ে সে আমার চেয়েও অধিক জ্ঞানী।’
ইবনে আব্বাস (রা.) এর মতো ‘হিবরুল উম্মাহ’ বা উম্মতের শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরের মুখে এমন প্রশংসা নিঃসন্দেহে ইমাম শা’বি (রহ.) এর অসাধারণ জ্ঞানের স্বীকৃতি।
আসেম ইবনে সুলাইমান বলেন, কুফা, বসরা, হিজাজসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মুহাদ্দিসদের হাদিস সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানতেন ইমাম শা’বি।
আর ইবনে শিহাব যুহরি (রহ.)—যিনি নিজেও হাদিসশাস্ত্রের এক মহাতারকা—বলেছিলেন, ‘কুফার প্রকৃত আলেম হচ্ছেন শা’বি।’
এ ধরনের মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু নিজের অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র ইসলামি বিশ্বের একজন স্বীকৃত জ্ঞাননেতা ছিলেন।
আমাদের জন্য তার জীবনের শিক্ষাইমাম শা’বি (রহ.) এর জীবন কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি জ্ঞানসাধকদের জন্য এক অনন্ত প্রেরণা।
তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, একাগ্রতা এবং অসাধারণ অধ্যবসায়। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাসনের ভয় কিংবা ব্যক্তিগত কষ্ট কোনোটিই তাকে জ্ঞানচর্চা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
তিনি আরও প্রমাণ করেছেন, শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; তথ্যকে স্মৃতিতে ধারণ করা, বিশ্লেষণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই একজন আলেমের প্রকৃত দায়িত্ব।
প্রায় এক শতাব্দীর আলোকবর্তিকার বিদায়১০৪ হিজরিতে ইমাম শা’বি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় তিরাশি বছর। প্রায় আট দশকেরও বেশি সময় তিনি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে চিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা হিসেবে।
আরও পড়ুন মনীষীর জীবনচরিত / ইমাম ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.)ওএফএফ