এতদিন চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধারণা ছিল, বয়স বাড়া বা ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস)-এ সামান্য চর্বি জমা একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সাধারণ নয়। আন্তর্জাতিক গবেষকদের প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুযায়ী, অগ্ন্যাশয়ে অতিরিক্ত চর্বি জমা ভবিষ্যতে ডায়াবিটিস, প্যানক্রিয়াটাইটিস এমনকি প্রাণঘাতী প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
Advertisement
বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার রিভিউস গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি এবং হেপাটোলজি-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই অবস্থাকে ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, সময়মতো এটি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ভবিষ্যতের নানা জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার আসলে কী?ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে অগ্ন্যাশয়ের কোষ ও টিস্যুর মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে চর্বি জমতে শুরু করে। অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে অঙ্গটিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এই প্রদাহ ধীরে ধীরে ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ফলেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয় এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অন্যান্য জটিল রোগও দেখা দিতে পারে।
Advertisement
গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্যাটি প্যানক্রিয়াসকে সামান্য সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অনেক সময় শরীরের বড় ধরনের বিপাকজনিত সমস্যার পূর্বাভাস হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবিটিস, অ্যাকিউট ও ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস এবং প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ঝুঁকির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই স্ক্যান রিপোর্টে প্যানক্রিয়াসে অতিরিক্ত চর্বি ধরা পড়লে সেটিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শুধু অতিরিক্ত ওজন হলেই কি হয়?অনেকেই মনে করেন, স্থূল ব্যক্তিদেরই কেবল ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস হয়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাভাবিক বা তুলনামূলক কম ওজনের মানুষদেরও প্যানক্রিয়াস ও লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ শরীর বাইরে থেকে রোগা দেখালেও ভেতরের অঙ্গগুলোতে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে।বিশেষ করে যাদের পরিবারে ডায়াবিটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
সামান্য চর্বি থাকলেই কি ভয় পাওয়ার কারণ?না। চিকিৎসকদের মতে, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ে অল্প পরিমাণ চর্বি জমা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একে ইনট্রা-প্যানক্রিয়াটিক ফ্যাট ডিপোজিশন বলা হয়। তবে যখন এই চর্বির পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে শুরু করে, তখন সেটিকে ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ সব ধরনের চর্বি জমাই রোগ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত জমা অবশ্যই সতর্কতার বিষয়।
যেভাবে শনাক্ত করা যায়প্যানক্রিয়াসে চর্বি জমার সঠিক মাত্রা নির্ণয়ে এমআরআই বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভুল পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যানে অনেক সময় সমস্যাটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। তাই চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে এমআরআই করার পরামর্শ দিতে পারেন।
Advertisement
ফ্যাটি প্যানক্রিয়াস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং ডায়াবিটিস থাকলে নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। যাদের পরিবারে ডায়াবিটিস রয়েছে বা আগে থেকেই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা আছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।
আরও পড়ুন প্রতিদিন একই নাশতা খাওয়ার অভ্যাস, জানুন ভালো নাকি খারাপফ্যাটি প্যানক্রিয়াস এমন একটি সমস্যা, যা দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে থাকতে পারে। তাই কেবল অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সচেতন হলে শুধু অগ্ন্যাশয় নয়, ডায়াবিটিস, হৃদ্রোগ এবং আরও অনেক দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
সূত্র: আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এসএকেওয়াই