শুনতে কানে লাগতে পারে। হয়তো লাগবেও। তবে কঠিন সত্য হলো, স্লেজিংও ক্রিকেটের একটা অংশ। কখনো কখনো অবিরাম অফস্টাম্পের আশপাশে বল ফেলে ব্যাটারদের ধৈর্যের পরীক্ষাও নেয়। ঠিক সেই রকম ক্রিকেটে এক দল আরেক দলকে স্লেজিং করে নানাভাবে বিব্রত করার চেষ্টা করে। এটা-ওটা বলে, কখনো বা গালাগাল দিয়ে, আবার কোনো সময় অপমানসূচক কথাবার্তা বলে প্রতিপক্ষের ক্রিকেটারদের উত্তপ্ত করতে চায়।
Advertisement
বোলাররা বাউন্সার ছুড়ে, বা শর্ট লেন্থ থেকে ঠুকে শরীর বরাবর, নাক, মুখ, মাথা এবং কাঁধ-উচ্চতায় বল ফেলে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের সাহসের পরীক্ষা নেয়। একইভাবে স্লেজিং করে অনেক দল প্রতিপক্ষের মনোযোগ, মনঃসংযোগে চিড় ধরাতে চায়, মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টাও করে।
শোনা যায় অস্ট্রেলিয়ানরা অনেক স্লেজিং করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ যখন ২০০৩ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অসিদের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলতে নামে, তখন কি অসিরা টাইগার ক্রিকেটারদের মনের দিক থেকে দুর্বল করতে স্লেজিং করেছে?
বাংলাদেশের ব্যাটাররা, বিশেষ করে ওপেনার হান্নান সরকার যখন তিন অসি ফাস্ট বোলার গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেসপি আর ব্রেট লিকে সাহস ও আস্থার সঙ্গে খেলছিলেন, তখনও কি অসিরা চুপচাপ ছিল? নাকি ম্যাথিউ হেইডেন, জাস্টিন ল্যাঙ্গার, রিকি পন্টিং, ড্যারেন লেহম্যান, স্টিভ ওয়াহ, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি ও জেসন গিলেস্পিরা ক্রমাগত উত্তেজক কথা বলে, গালাগাল করে বাংলাদেশের ব্যাটারদের ধৈর্য ও মনোযোগে চিড় ধরানোর চেষ্টা করেছিলেন?
Advertisement
ওই সিরিজে বাংলাদেশ দলের হয়ে দ্বিতীয় টেস্টে দুই ইনিংসেই অর্ধশতক (৭৬ ও ৫৫) করা হান্নান সরকার জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে বলেন, ‘না, না। অসিরা একটুও স্লেজিং করেনি। মুখে গালমন্দ করা বহুদূরের কথা, একটি শব্দও বের হয়নি কোনো অসি ক্রিকেটারের মুখ থেকে।’
স্লেজিং ও অপমানসূচক কথাবার্তা প্রসঙ্গ উঠতেই টাইগার ওপেনার হান্নান বলেন, ‘বড় দলের ক্রিকেটাররা আমাদের মতো দলের সঙ্গে আসলে তেমন স্লেজিং করে না। আমাদের লেভেলের ক্রিকেটারদের গালাগাল দেয় না তারা। আমাদের সঙ্গে ওইসব টেকনিক্যাল খুনসুটি করে। যার ভেতরে থাকে ক্রিকেটীয় ছলচাতুরি। ২০০৩ সালে আমাদের বিপক্ষে অসি ক্রিকেটাররা মুখে কোনো কথা না বলে নানা পরিকল্পনা সাজিয়ে, এটা-ওটা করে নানা ধরনের ফাঁদ পেতে আমাদের আউট করেছিল।’
কেমন ছিল সেই কৌশলে পাতা ফাঁদ? তার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেয়ার্নস টেস্টের দুই ইনিংসের হাফসেঞ্চুরিয়ান হান্নান সরকার জানান, ‘তিন অসি ফাস্ট বোলার ব্রেট লি, গিলেস্পি আর গ্লেন ম্যাকগ্রার বেশিরভাগ ডেলিভারি ব্যাটে না খেলে ছেড়ে দিয়ে খেলেছি। লেগি স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলকে স্বচ্ছন্দ, সাবলীল ঢংয়ে খেলে রান করছিলাম।’
‘তখন বোলার ম্যাকগিল স্লেজিং করে আমার মনোযোগ, মনঃসংযোগ নষ্ট করেনি। কিংবা আমাকে এটা-ওটা বলে চটানোর চেষ্টাও করেনি। আমি যখন লেগস্পিনার ম্যাকগিলের বলে বেশিরভাগ রান করছিলাম, তখন ম্যাকগিলের চোখের ও শরীরের ভাষা দেখে মনে হচ্ছিল, সে চাচ্ছে আমাকে শট খেলিয়েই আউট করতে। আমি বাউন্ডারি হাঁকালে বোলার ম্যাকগিলের ভাবভঙ্গিটা ছিল এরকম, ঠিক আছে চার মেরেছো। পারলে পরের বলেও মারো দেখি।’
Advertisement
‘শেষ পর্যন্ত আমি ৭০-এর ঘরে গিয়ে ওই ম্যাকগিলের বলেই আউট হই। আমি যখন ম্যাকগিলকে খুব ভালো খেলছিলাম এবং প্রায়ই সুইপ করে তার লাইন ও লেন্থ এলোমেলো করার চেষ্টায় ছিলাম, তা দেখে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ আর বোলার ম্যাকগিল ফিল্ডিংটা একটু ঘুরিয়ে সাজাল। তারা ম্যাথিউ হেইডেনকে ঠিক শর্ট স্কয়ার লেগে দাঁড় না করিয়ে আম্পায়ার যেখানে দাঁড়ান, মিডউইকেটের দিকে হাফওয়েতে রেখে দেয়। না বাউন্ডারি সীমানার ওপারে, না এক রান ঠেকাতে। মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে দেয়। আমি শেষ পর্যন্ত সুইপ খেলতে গিয়ে ওই জায়গাতেই ক্যাচ আউট হই।’
হান্নান যোগ করেন, ‘বড় দলের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ম্যাচ রিডিং এবং খেলোয়াড়দের সম্পর্কে ধারণাটা খুব দ্রুত করতে পারে। তারা বুঝে নেয় আমি কী করব। আমি সুইপ খেলছিলাম, খেলবও; ওটা জেনে-বুঝেই তারা লেগ সাইডে ফিল্ডিং সাজায়। এবং আমি সেই জায়গাতেই ক্যাচ দিয়ে আউট হই। ওরা আমাকে ট্র্যাপে ফেলে আউট করে।’
‘এবং দ্বিতীয় ইনিংসেও আমি ম্যাকগিলের বলেই লেগ বিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়াই। সিলিতে ড্যারেন লেহম্যান ছিলেন। সে আমাকে বলছিল, আমার পাশে মিডউইকেট জোনটা খানিক ফাঁকা আছে। পারলে সেখানে খেলো। আমি দেখলাম, সত্যিই তো।’
‘আমি করলাম কী, ম্যাকগিলের পরের বলে ফ্লিক করতে গেলাম ঠিক ওই মিডউইকেটের দিকে। বলটি ছিল ফ্লিপার, মানে লেগস্পিনারের সোজা ডেলিভারি। বল ব্যাট মিস করে পায়ে লাগল। আমি এলবিডব্লিউ হয়ে গেলাম। বলতে পারেন, সেটাই অসিদের এক ধরনের স্লেজিং।’
তবে এতকিছুর মধ্যেও হান্নানের মনে আছে সিরিজ শেষে প্রশংসার কথা। বলছিলেন, ‘সিরিজ শেষে ওই ড্যারেন লেহম্যানেরই একটি উক্তি অস্ট্রেলিয়ার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, যা আমার আর মাশরাফির জন্য ছিল বিরাট প্রাপ্তি। ওই সিরিজ শেষে লেহম্যান বলেছিলেন, হান্নান সরকার আর মাশরাফি ভালো খেলোয়াড়। তাদের অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেটে খেলার সামর্থ্য আছে। পেস বোলাররা ওই ধরনের কমপ্লিমেন্ট পেয়ে থাকে। ব্যাটারদের অমন প্রশংসা পাওয়া যায় না তেমন। আমি সৌভাগ্যবান যে অসি তারকা ক্রিকেটার লেহম্যানের প্রশংসাধন্য হই।’
এআরবি/এমএমআর