মতামত

সেই ঢাকা, সেই বিশ্ববিদ্যালয়, সেই দিনগুলি

(পূর্ব প্রকাশের পর পর্ব ৯)

Advertisement

১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হতে এই শহরে পা ফেলা। ঢাকা তখন একটি প্রায় ঘুমন্ত প্রাদেশিক শহর—সদরঘাট থেকে নবাবপুর, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুলিস্তান অবধি মুড়ির টিনমার্কা টাউন-সার্ভিস বাস। অনায়াসে চার আনা-ছয় আনায় রিকশায় চড়ে কোথাও যাওয়া কিংবা বিশুদ্ধ হাওয়া খাওয়া তেমন কোনো ব্যাপারই ছিল না। খুব কম জনসংখ্যা নিয়ে শান্তিপূর্ণ, কোলাহলহীন, ছিমছাম এক শহর। আকাশ দেখেই বলা যেত, কখন সকাল, কখন বিকেল, কখন দুপুর। ঘোড়ার গাড়ির টকটক আওয়াজ, রমনা রেসকোর্সে ঘোড়দৌড়ের বাজি খেলা এবং পায়ে হেঁটে নীলক্ষেত থেকে গুলিস্তান যাওয়া-আসা—অন্তত আজ কল্পকথা। দর্শনীয় বলতে ছিল গুলিস্তানের কামান, নিউ মার্কেট, নবাববাড়ি, স্টেডিয়াম…

দেবীদ্বার থেকে রওনা হওয়ার আগে আব্বা চেয়েছিলেন, অচেনা ঢাকায় আমার সঙ্গে মুরুব্বি গোছের কাউকে দেবেন। খবরটা শুনে বিস্ফারিত নেত্রে ভাবলাম, বলে কী! মুরুব্বি সঙ্গে থাকলে তো ধূমপানে গুঁড়ে বালি! তড়বড় করে আব্বাকে বললাম—‘না না, আমি তো ঢাকা শহর ভালোই চিনি। কাউকে সঙ্গে যাওয়ার দরকার নেই।’

আব্বা বললেন, ‘তথাস্তু।’

Advertisement

ট্রেনের বুফে-বগিতে চা, সিঙ্গারা, সিগারেটের ধোঁয়ায় আমি ফুরফুরে মেজাজে। হবে না কেন—শিক্ষার শ্রেষ্ঠ দুর্গ বলে কথিত ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাচ্ছি যে। কিছুটা কল্পনাচ্ছন্নও হলাম। খুব ছোটবেলায় একবার আম্মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বল তো, ঢাকার দুব্বা সাদা কেন?’

প্রশ্ন শুনে আমি আম্মাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, ‘ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী, ওখানকার দুব্বা সাদা হবে কেন?’

আম্মা বলতেন, ‘আরে বোকা, দুব্বা ঢাকা থাকে বলেই সাদা, কারণ বাতাস পায় না। এই ঢাকা সেই ঢাকা না।’

অন্য একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বল দেখি, পৃথিবীটা কার বশ?’

Advertisement

আমি প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকাই—পৃথিবীটাকে বশ করে এমন কে আছে? আম্মা হেসে বলেন, ‘প্রশ্নেই উত্তর আছে রে—পৃথিবী টাকার বশ, বুঝলি বোকা?’

নদী যেমন সাগরে পতিত না হলে বোঝা যায় না নদী কত ছোট, আমিও তেমনি অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি না হলে বুঝতাম না, উচ্চমাধ্যমিকে মেধাতালিকায় আমার স্থান পাওয়াটা কত তুচ্ছ একটা বিষয় ছিল। আমাদের ফার্স্ট ইয়ার অনার্স ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সকলেই ডাবল ফার্স্ট ডিভিশন বা স্টার মার্কসপ্রাপ্ত। এর মধ্যে বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ৮-১০ জন।

আম্মার ছোড়া কুইজগুলো রণিত হচ্ছিল ট্রেনে চড়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসতে আসতে। জানালা দিয়ে দ্রুত ছুটে যাওয়া মানুষের মুখ, সবুজ প্রকৃতি, নদীর ওপর সেতু পারাপার, স্টেশনে হকারদের হাঁকডাকের মাঝেও আমার মায়ের হাসিমাখা মুখ যেন ক্ষণে ক্ষণে ভেসে উঠছিল—আমারই কল্যাণ কামনায়।

একদিন পরিপাটি ফুলবাবু হয়ে ভর্তির নিমিত্তে অর্থনীতি বিভাগে ভাইভা দিতে গেলাম। কলা ভবনের তিন কিংবা চার তলায় পশ্চিম দিকটায় পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণে টানা বারান্দা, একের পর এক শিক্ষকদের রুম, তারপর চেয়ারম্যানের রুমে মৌখিক পরীক্ষা।

সালাম দিয়ে চেয়ারে বসা মাত্রই বিভাগীয় চেয়ারম্যান কে. টি. হোসেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়াট ইজ ইউর নেম?’

‘এমডি আব্দুল বায়েস।’

‘হোয়াট ইজ এমডি?’

‘মোহাম্মদ।’

‘দ্যান সে মোহাম্মদ, নট এমডি। ইউ আর মোহাম্মদ আব্দুল বায়েস, নট এমডি আব্দুল বায়েস।’

আসলে আমার নাম আরও লম্বা ছিল—এমডি আব্দুল বায়েস মিয়া। এই ‘মিয়া’ পদবি আমার চৌদ্দ পুরুষে ছিল না। হেডমাস্টার স্যার আদর করে ‘বায়েস মিয়া’ ডেকে আমার প্রবেশিকা পরীক্ষার ফর্মে ‘মিয়া’ ঢুকিয়ে দিলেন। এতে ওনার কী মজা হলো জানি না, তবে আমি মহা ফাঁপরে ছিলাম।

আমার ক্লাসের এক বন্ধুকে ছোটবেলায় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক পেটে টিপ দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কী দিয়ে ভাত খেয়েছিস?’

উত্তরে বন্ধুটি বলেছিল, ‘ডাইল দিয়া, স্যার।’

স্কুলজীবনের বন্ধুরা ওকে ‘ডাইল’ নামে ডাকত এবং এমনকি মুহসিন হলে এসেও আসল নাম চাপা পড়ে ‘ডাইল’ ভাসতে থাকল। যাক সে কথা। অবশেষে আশির দশকে হু. মু. এরশাদের আমলে এক বন্ধুকে ধরে কুমিল্লা কোর্টে গিয়ে মাথা-লেজ কাটিয়ে নাম দাঁড়াল আব্দুল বায়েস।

‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’—প্রবাদটি জানতাম; কিন্তু অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হওয়া যে আমার কষ্টের মূল হয়ে উঠবে, তা জানা ছিল না। ‘কার পরামর্শে অর্থনীতি পড়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম’ কিংবা ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’—সে কথা আজ মনে নেই। তবে এতটুকু বলা যায়, অঙ্কের ভয়ে কলা অনুষদের একটা বিষয় বেছে নিতে গিয়ে ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে ন্যাড়া যাচ্ছে বেলতলায়। না, কোনো সুহৃদ সাবধান করে বলেনি—‘অর্থনীতির অপর নাম অঙ্ক এবং আতঙ্ক।’

অবস্থা দাঁড়াল অনেকটা ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়’-এর মতো। সিলেবাস ঘেঁটে দেখলাম, সম্মান শেষ পর্বে পরিসংখ্যান ও অঙ্ক মিলে এক শ নম্বরের একটি পেপার! ভুল ট্রেনে উঠলে যা হয়, আমার বেলায় তাই হলো। মাথায় যেন বাজ পড়ল।

আব্বা বলতেন, আমার নামের অর্থ নাকি ‘আল্লাহর বান্দা’। অবশেষে আল্লাহর বান্দাকে আল্লাহই রক্ষা করলেন—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলা তথা মুক্তিযুদ্ধের কারণে শেষতক অঙ্কের পেপারের পরীক্ষা হলো না। মুক্তিযুদ্ধ শেষে অনুশীলনী নম্বরের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করায় আমি বাঁচোয়া—রাখে আল্লাহ, মারে কে!

সকাল আটটায় (অথবা সাড়ে আটটায়) একটা ক্লাস কিংবা টিউটোরিয়াল থাকত। তখনকার দিনে মূল ক্লাসের পর টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং মার্কস ছিল বাধ্যতামূলক। ঘুম থেকে উঠে ক্যান্টিন থেকে টোস্ট, পরোটা, ডিম নাকে-মুখে গুঁজে দিতাম ভোঁ দৌড়। সুন্দরী হাসিনা ম্যাডামের পাবলিক ফিন্যান্সের ওপর সুন্দর লেকচার শোনা ছিল তরতরে হওয়ার অন্যতম কারণ। এমনকি ঘুমকাতুরে ছাত্রও ঘুম-টুম ফেলে চোখ কচলাতে কচলাতে ওই ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে যারপরনাই কসুর করত।

তবে কখনো গিয়ে দেখতাম, কিছু শিক্ষক অনুপস্থিত। সহপাঠীরা বলত, তাঁরা নাকি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘোড়ায় চড়ছেন, টেনিস খেলছেন কিংবা ইংরেজি ছবি দেখছেন। অথচ আমরা তাঁদের দেখার অপেক্ষায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। স্মর্তব্য, আমাদের প্যারা দিতেন একজন বা দুজন শিক্ষক; বাকিরা ঝড়ঝাপটার মধ্যেও নিয়মিত ক্লাস নিতেন।

সেকালে, এমনকি একালেও, অর্থনীতি বিভাগ মূলত মেধাবীদের আখড়া বলে মনে করা হয়ে থাকে। হুমায়ূন আহমেদ কোথাও বলেছেন, তাঁর সময়ে ভালো ছাত্ররা ইকোনমিকসে ভর্তি হতো; এমনকি তিনিও প্রথমে ইকোনমিকস বেছে নিয়েছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসেও মেধাবী ছেলেটি অর্থনীতি পড়ে।

নদী যেমন সাগরে পতিত না হলে বোঝা যায় না নদী কত ছোট, আমিও তেমনি অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি না হলে বুঝতাম না, উচ্চমাধ্যমিকে মেধাতালিকায় আমার স্থান পাওয়াটা কত তুচ্ছ একটা বিষয় ছিল। আমাদের ফার্স্ট ইয়ার অনার্স ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সকলেই ডাবল ফার্স্ট ডিভিশন বা স্টার মার্কসপ্রাপ্ত। এর মধ্যে বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ৮-১০ জন।

শুধু মুহসিন হলেই অর্থনীতি বিভাগে পড়ুয়া বিভিন্ন বোর্ডের চার ফার্স্ট বয় বাস করত—মোহাম্মাদ মাসুম, হুমায়ূন কবির, আব্দুল হাকিম এবং মোহাম্মাদ সোহেল। প্রথমোক্ত দুজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী ছিলেন। আমাদের সঙ্গে বিদেশি এক ছাত্রও পড়ত—সম্ভবত মালয়েশিয়ার; নাম আব্দুল হাকিম। সে সময়ে বিদেশি ছাত্রদের থাকার জন্য কলা ভবনের পাশে ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল ছিল।

অর্থনীতি বিভাগের গল্প হবে, অথচ কানু দা থাকবেন না—তা হয় না। তিনি বিভাগের পিয়ন—খাকি শার্ট-প্যান্টে শশব্যস্ত। সভাপতির কক্ষের লাগোয়া ছোট্ট চায়ের স্টলের মালিকও বটে। সর্বদা হাসিমুখে চায়ের কাপে চামচে আওয়াজ তুলতে তুলতে কুশল বিনিময় করতেন। তাঁর এক ছেলে ঢাকার একটি ক্লাবের হয়ে খুব ভালো ফুটবল খেলত—সে কটা গোল করেছে, কোথায় ক্ষেপ খেলতে গেছে (ভাড়ায় খেলা)—আলাপচারিতায় এসব খবরও দিতেন। একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মচারী হিসেবে শিক্ষক থেকে ছাত্র-ছাত্রী—সবাই তাঁকে সম্মান করত।

অর্থনীতি বিভাগ নিয়ে আরও লিখব। তবে আপাতত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গান দিয়ে এই পর্ব শেষ করি—

‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে স্মৃতি যেন আমার এ হৃদয়ে বেদনার রঙে রঙে ছবি আঁকে…’

(চলবে)

লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/জেআইএম