লাইফস্টাইল

বিবিখানা পিঠা কেন বিখ্যাত, জানুন রাজকীয় নামের অজানা গল্প

মাহাফুজা শিরিন

​বিবিখানা পিঠা বাঙালির সুস্বাদু পিঠাগুলোর মধ্যে অন্যতম। রাজকীয় নামের এই পিঠা মূলত ঢাকার বিক্রমপুর এবং বৃহত্তর শরীয়তপুর অঞ্চলে বেশ বিখ্যাত। বিবিখানা নামটির সঙ্গে ঠিক কোন বিবির ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তার নির্ভরযোগ্য লিখিত তথ্য না মিললেও লোকমুখে এ নিয়ে নানা গল্প  প্রচলিত রয়েছে।

Advertisement

সেই রহস্যময় নামই যেন এই পিঠার প্রতি মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘরোয়া রান্নাঘর থেকে উৎসবের আয়োজনে নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে বিবিখানা পিঠা। এই নামটির পেছনে মূলত দুটি লোককথা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রচলিত আছে।

চায়ের আড্ডা আরও মধুর করে তোলে বিবিখানা পিঠা

​১.অভিজাত বউ বা বিবি

ফারসি ও উর্দু ভাষার প্রভাবে ‘বিবি’ শব্দটি একসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী, গৃহিণী বা সম্মানিত নারীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।আর ‘খানা’ অর্থ খাবার বা রন্ধনশৈলী। এই দুটি শব্দের মিল থেকেই এসেছে ‘বিবিখানা পিঠা’ নামটি। পুরান ঢাকা, বিক্রমপুর ও আশপাশের অঞ্চলের জমিদার ও অভিজাত পরিবারের গৃহিণীরা বিশেষ অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য নিজ হাতে এই সুস্বাদু পিঠা তৈরি করতেন। ধীরে ধীরে সেই ঐতিহ্যবাহী অতিথি আপ্যায়নের পিঠাই পরিচিত হয়ে ওঠে বিবিখানা পিঠা নামে।

Advertisement

​২. নতুন বউয়েদের 'দক্ষতার পরীক্ষা'

লোককথায় প্রচলিত আছে, একসময় কোনো পরিবারে নতুন বউ আসার পর তার রান্নার দক্ষতা, ধৈর্য ও নিপুণতা যাচাইয়ের জন্য তাকে বিবিখানা পিঠা তৈরি করতে দেওয়া হতো। কারণ এই পিঠা বানানো মোটেই সহজ কাজ নয়। আঁচের তাপ ঠিক রাখতে হয়, বাইরে যেন অতিরিক্ত পুড়ে না যায়, আবার ভেতরের অংশও নরম, তুলতুলে ও সমানভাবে সিদ্ধ থাকতে হয়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে নিখুঁতভাবে বিবিখানা পিঠা তৈরি করতে পারাই তখন একজন দক্ষ, যত্নশীল ও সুগৃহিণীর পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হতো।

বিবিখানা কেন ঐতিহ্যবাহী পিঠা?

​বিবিখানা শুধু একটি সুস্বাদু পিঠা নয়, এটি প্রাচীন বাংলার রন্ধন ঐতিহ্য, আতিথেয়তার সংস্কৃতি এবং পারিবারিক ইতিহাসের এক অনন্য স্মারক। এর প্রতিটি উপাদান, রান্নার পদ্ধতি এবং পরিবেশনের রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির জীবনযাপন ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। এটিকে ঐতিহ্যবাহী বলার মূল কারণগুলো হলো-

​একসময় নতুন বউয়ের রান্নার দক্ষতার পরিচয় ছিল এই পিঠা

বাঙালির নিজস্ব 'বেকিং' প্রযুক্তি 

আধুনিক ওভেনের প্রচলনের বহু আগেই বাংলার মানুষ নিজস্ব কৌশলে কেকের মতো নরম ও সুগন্ধি বিবিখানা পিঠা তৈরি করতেন। মাটির হাঁড়িতে চালের গুঁড়া, দুধ, নারিকেল ও গুড়ের মিশ্রণ ঢেলে নিচে জ্বাল দেওয়া হতো মৃদু উনুনে। একই সঙ্গে হাঁড়ির ঢাকনার ওপর রাখা হতো জ্বলন্ত কয়লা বা গরম ছাই, যাতে ওপর ও নিচে সমান তাপে পিঠাটি ধীরে ধীরে সিদ্ধ ও বেক হয়ে ওঠে। এই দেশীয় বেকিং পদ্ধতিই বিবিখানা পিঠাকে অন্য সব পিঠা থেকে আলাদা করেছে। এই প্রাচীন বেকিং পদ্ধতিই এর মূল ঐতিহ্য।

Advertisement

​উপাদানের খাঁটি বাঙালিয়ানা

নবান্নের নতুন চালের গুঁড়া (বর্তমানে পোলাওয়ের চালের গুঁড়াও ব্যবহার করা হয়), ঘন খাঁটি দুধ, নারিকেল, ঘি এবং শীতের গাঢ় খেজুরের গুড়ের এক সুস্বাদু মিশ্রণ ঘটে এই পিঠায়।

জামাই-আদর ও বিশেষ উৎসবের অনুষঙ্গ

ভাপা, চিতই বা পাটিসাপটার মতো প্রতিদিনের পিঠা ছিল না বিবিখানা। এটি তৈরি করা হতো বিশেষ উপলক্ষে। শীতের দিনে জামাই-আদর, পারিবারিক উৎসব কিংবা সম্ভ্রান্ত অতিথিদের আপ্যায়নের জন্যই মূলত এই শ্রমসাধ্য পিঠার আয়োজন করা হতো। তাই একসময় বিবিখানা পিঠা ছিল সম্মান, আন্তরিকতা এবং আভিজাত্যের প্রতীক।

আরও পড়ুন কাঁচা মরিচ নাকি শুকনো মরিচ, স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি বেশি উপকারী বাংলার নিজস্ব ‘দেশি কেক’

পাশ্চাত্যের কেক বা বেকারি সংস্কৃতি বাংলায় জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগেই বিবিখানা পিঠা বাঙালির নিজস্ব ‘দেশি কেক’ হিসেবে পরিচিত ছিল। যখন ওভেন ছিল না, তখনো মাটির হাঁড়ি আর ধীর আঁচে তৈরি হতো নরম, তুলতুলে এই পিঠা। নারিকেল, দুধ আর খেজুরের গুড়ের মনমাতানো ঘ্রাণে ভরে উঠত গোটা বাড়ি। নতুন বধূর রান্নার দক্ষতার পরীক্ষা থেকে শুরু করে রাজকীয় মেহমানদারিতে একসময় বিশেষ স্থান দখল করে ছিল বিবিখানা পিঠা।

আরও পড়ুন বর্ষায় কচুর মুখি দিয়ে চিংড়ি রান্না করবেন যেভাবে

বর্তমানে আধুনিক ওভেনে বিবিখানা পিঠা বানানো অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই এই সুস্বাদু বিবিখানা পিঠা এখন বিকেলের নাশতায়, চায়ের আড্ডায় বা অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার হিসেবেও সমানভাবে সমাদৃত।

এসএকেওয়াই