দেশজুড়ে তীব্র গ্যাসের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, ভোগান্তিতে পড়ছেন আবাসিক গ্রাহক। কিন্তু সেই বাস্তবতার উল্টো চিত্র কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। সেখানে আড়িয়াল খাঁ নদীর তলদেশে তিতাসের উচ্চচাপের মূল সঞ্চালন লাইন থেকে প্রায় দেড় মাস ধরে অবিরাম বের হচ্ছে গ্যাস।
Advertisement
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় একটি চুন কারখানার জন্য গ্যাস চুরির উদ্দেশ্যে মূল পাইপলাইনে ছিদ্র করে সংযোগ নেওয়ার চেষ্টার সময়ই এই লিকেজের সৃষ্টি হয়। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। রহস্যজনক এই ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নিয়ে উঠেছে জবাবদিহির প্রশ্ন।
ঘটনাটি কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদীতীরবর্তী কাজীর চর এলাকায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাস লিকেজের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় ইউপি সদস্য মিলন মিয়ার সহযোগিতায় গত জুনের শুরুতে নদীতীরে ১৭ শতাংশ জমিতে একটি চুন কারখানা স্থাপন করা হয়। কারখানার মালিক সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দেলোয়ার হোসেন তালুকদার। স্থানীয়দের দাবি, কারখানায় গ্যাস সরবরাহের জন্য রাতের অন্ধকারে নদীর তলদেশে থাকা তিতাসের উচ্চচাপের পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় পাইপলাইনে ছিদ্র হয়ে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেটি কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হলেও গ্যাসের বুদবুদ ও তীব্র গন্ধে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। অভিযোগ ওঠার পর কারখানাটি বন্ধ করে মালিক ও শ্রমিকরা এলাকা ছেড়ে চলে যান।
Advertisement
তবে ইউপি সদস্য মিলন মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হয়ে এতো বড় কাজ কীভাবে করবো। আমার বিরুদ্ধে আমার প্রতিপক্ষের লোকজন কাজ করছে, তারাই আমার নামটি বলেছে। যেখানে কারখানা হয়েছে ওই কারখানার একটি জমির পরে আমার জমি রয়েছে। এমনকি কারখানা কর্তৃপক্ষ ও জমিদাতাদের যে দলিল হয়েছে, ওই দলিলেও আমার স্বাক্ষর নেই। প্রতিপক্ষের লোকজন আমাকে ফাঁসাতেই আমার নাম বলছে।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, এখানে অনেকদিন যাবত গ্যাস বেড় হয়ে যাচ্ছে। গতকালকে উপজেলা উপজেলা প্রশাসনের লোকজন পরিদর্শন করেছে। লিকেজ বন্ধ করতে তিতাস গ্যাস কর্মীরা কাজ করছে। স্থানীয়দের মুখে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মিলনের নাম শুনেছি। তবে এই ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত হোক না কেন তার বিচার দাবি করছি।
পাশ্ববর্তী পাকুন্দিয়া উপজেলার বুরুদিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াদ মিয়া বলেন, প্রায় দেড় মাস ধরে গ্যাস লিক হচ্ছে। শুরুতে অল্প বুদবুদ দেখা গেলেও এখন পরিস্থিতি ভয়াবহ। তার অভিযোগ, নিম্নমানের মেরামত ও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে। দক্ষ প্রকৌশলী ও মেরিন বিশেষজ্ঞ দিয়ে কাজ করলে অল্প সময়েই লিকেজ বন্ধ করা সম্ভব।
আরও পড়ুন তিতাস এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটের ফের সতর্কতাএকই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগের সঙ্গে অসাধু চক্র এবং গ্যাস বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে। তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
Advertisement
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ বাশার বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে ৫০-৬০ জন লোককে ওই এলাকায় খননকাজ করতে দেখেন। তাদের হাতে নকশা ও রড ছিল। পরে সেখানে বুদবুদ উঠতে দেখে স্থানীয়রা গ্যাস লিকেজের সন্দেহ করেন।
তিনি দাবি করেন, কাজে নিয়োজিত কয়েকজনের কাছে শুনেছেন, সেখান থেকে গ্যাস নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিষয়টি স্থানীয়রা তিতাস কর্তৃপক্ষকে জানালেও শুরুতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিকেজের স্থানও বড় হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে গত ৯ জুলাই থেকে মেরামতকাজ শুরু হয়।
আরও পড়ুন গ্যাস সংকটে স্থবির আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল, শিপমেন্ট নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠাশনিবার (১ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখনও নদীর তলদেশ থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। মেরামতকাজ করছে তিতাস গ্যাসের কর্মীরা। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক জনতা বিল করছে।
কিশোরগঞ্জ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, লিকেজের কারণে পাইপলাইনে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরগঞ্জের পুরো গ্যাস সরবরাহ এ লাইন দিয়েই হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং পাইপলাইনের চাপও অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জে তিতাসের প্রায় আট থেকে নয় হাজার গ্রাহক রয়েছেন।
তিতাস গ্যাসের ভালুকা ডিভিশনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত করা হচ্ছে। কারা কীভাবে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন।
তিনি বলেন, লিকেজ মেরামত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তবে এটি নদীর তলদেশে উচ্চচাপের পাইপলাইনের অত্যন্ত জটিল কারিগরি কাজ। বর্ষাকালে প্রবল স্রোত, পানির চাপ ও মাটি ধসে যাওয়ায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবুও দক্ষ প্রকৌশলী ও কর্মীরা দিনরাত কাজ করছেন।
অবৈধ সংযোগের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। এটি মনোহরদী থেকে কিশোরগঞ্জ ডিআরএস পর্যন্ত গ্যাস পরিবহনের একটি উচ্চচাপের সঞ্চালন লাইন। এ লাইন থেকে সরাসরি কোনো গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয় না।
আরও পড়ুন গ্যাস নিতে ফিলিং স্টেশনেই ‘দিনপার’, চুলা জ্বলে না বাসায়কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ লিকেজ বন্ধের জন্য কাজ করছে। আমরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লিকেজ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, এখান থেকে কেউ অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কি না। যদি তদন্তে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তিতাস কর্তৃপক্ষ মামলা করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সত্যিই অবৈধ সংযোগের চেষ্টা না হয়ে থাকে, তাহলে উচ্চচাপের মূল সঞ্চালন লাইনে এমন বড় ধরনের ছিদ্র কীভাবে তৈরি হলো? প্রায় দেড় মাস ধরে লাখ লাখ ঘনফুট গ্যাস অপচয়ের পরও এখন পর্যন্ত দায়ীদের শনাক্ত কিংবা কোনো মামলা না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এসকে রাসেল/কেএইচকে/জেআইএম