মতামত

রাজনীতির শিক্ষা, শিক্ষার রাজনীতি

স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ বদলেছে—অর্থনীতির আকার বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে, শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের উন্নয়নকে শুধু সেতু, সড়ক, মাথাপিছু আয় কিংবা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে মাপা যায় না। একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি, নাগরিক অধিকার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি দিয়ে।

Advertisement

সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হলো—স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমাদের রাজনীতি কেন এতটা অপরিণত?

প্রশ্নটি কঠিন, কারণ এর উত্তর শুধু কোনো একটি দল, সরকার বা সময়কে দায়ী করে দেওয়া যায় না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট দীর্ঘদিনের। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু রাজনীতির মৌলিক চরিত্রে যে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল, তা যথেষ্ট হয়নি।

রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল জনকল্যাণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। অথচ আমাদের দেশে রাজনীতি অনেক সময় ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতা ধরে রাখা এবং ক্ষমতার সুবিধা বণ্টনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। আদর্শের জায়গায় এসেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, নীতির জায়গায় সুবিধাবাদ, জনস্বার্থের জায়গায় দলীয় স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় অনেক সময় প্রতিহিংসা।

Advertisement

রাজনীতিতে অর্থের প্রভাবও ক্রমে বেড়েছে। একসময় রাজনীতিতে মানুষ আসতেন আদর্শ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনসেবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এখন অনেকের কাছে রাজনীতি হয়ে উঠেছে প্রভাব, সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পথ। রাজনীতিতে প্রবেশের পর কারও সম্পদ কীভাবে বাড়ে, ব্যবসায়িক সুবিধা কীভাবে তৈরি হয়, ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পর্ক কতটা গভীর হয়—এসব নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। রাজনীতি যখন জনসেবার বদলে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তখন জনগণের আস্থাও ক্ষয়ে যেতে থাকে।

রাজনীতির এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে নৈতিকতার অবক্ষয়।

ক্ষমতা নিজে খারাপ নয়। ক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষমতার ব্যবহার কেমন হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। ক্ষমতা যদি মানুষের অধিকার রক্ষায় ব্যবহৃত হয়, তবে তা কল্যাণের শক্তি। আর ক্ষমতা যদি ব্যক্তিগত সম্পদ, প্রতিহিংসা বা প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

বিশ্বের স্থিতিশীল গণতন্ত্রগুলো থেকে বাংলাদেশের একটি বড় শিক্ষা নেওয়ার আছে। সেখানে রাজনৈতিক দল ও সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। ক্ষমতার পরিবর্তন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে না। কারণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

Advertisement

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো ভিন্নমত। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমত অনেক সময় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে না দেখে শত্রুতার চোখে দেখা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার বদলে ধ্বংস করার প্রবণতা তৈরি হয়। সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র, প্রশ্নকে বিদ্রোহ এবং ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।

যে রাজনীতি ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, সে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের ভিন্নমতও সহ্য করতে পারে না। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়, নেতৃত্বের জবাবদিহি কমে যায় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ে। দল তখন একটি প্রতিষ্ঠান না হয়ে ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষমতার কাঠামোয় পরিণত হয়।

এখানেই শিক্ষার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা শিক্ষাকে প্রায়ই পরীক্ষার ফল, সার্টিফিকেট ও চাকরির যোগ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। কিন্তু শিক্ষা কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়; শিক্ষা নাগরিক তৈরি করে। শিক্ষা মানুষকে শেখায়—নিজের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যের অধিকারও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মত যেমন মূল্যবান, ভিন্নমতও তেমনি সম্মানের যোগ্য। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের যেমন দায়িত্ব আছে, রাষ্ট্রেরও নাগরিকের প্রতি দায়িত্ব আছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই নাগরিক শিক্ষার ঘাটতি স্পষ্ট। শিক্ষার্থীরা সংবিধানের সংজ্ঞা মুখস্থ করে, কিন্তু সাংবিধানিক মূল্যবোধের চর্চা কতটা করে? গণতন্ত্রের সংজ্ঞা জানে, কিন্তু মতের পার্থক্যকে সম্মান করতে শেখে কি? ইতিহাস পড়ে, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে কি? পরীক্ষায় ভালো ফল করে, কিন্তু অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করার নৈতিক সাহস অর্জন করে কি?

শিক্ষা যদি শুধু চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি করে, কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস না দেয়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। শিক্ষা যদি প্রশ্ন করতে না শেখায়, তবে তা জ্ঞান নয়—তথ্যের সঞ্চয়। শিক্ষা যদি যুক্তি ও বিবেককে বিকশিত না করে, তবে তা সমাজকে দক্ষ মানুষ দিতে পারে, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক দিতে পারে না।

তবে এটিও মনে রাখতে হবে, উচ্চশিক্ষা ও নৈতিকতা এক জিনিস নয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষও দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। আবার আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা কোনো মানুষও অসাধারণ সৎ ও মানবিক নেতা হতে পারেন। সুতরাং রাজনীতিতে শিক্ষার অবদান বলতে শুধু ডিগ্রি বোঝালে ভুল হবে।

রাজনীতির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক শিক্ষা।

একজন রাজনীতিককে সংবিধান জানতে হবে, ইতিহাস জানতে হবে, অর্থনীতি বুঝতে হবে, প্রশাসন সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, স্থানীয় সরকার, মানবাধিকার, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন সম্পর্কেও তাঁর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এসব জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাও দরকার।

যে রাজনীতিক কৃষকের উৎপাদন খরচ বোঝেন না, শ্রমিকের মজুরি বোঝেন না, বেকারের দীর্ঘ অপেক্ষা বোঝেন না, শিক্ষার্থীর অনিশ্চয়তা বোঝেন না, হাসপাতালে রোগীর অসহায়ত্ব বোঝেন না—তিনি কীভাবে মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধি হবেন?

রাজনীতি কেবল সংসদে বক্তৃতা দেওয়া নয়। রাজনীতি হলো—কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, রাষ্ট্রের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, কারা সুবিধা পাবে, কারা বঞ্চিত হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া। একটি রাস্তার গর্ত, একটি হাসপাতালের শয্যা, একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, একটি নদীর দখল, একটি শিশুর পুষ্টি, একজন তরুণের কর্মসংস্থান—সবই রাজনীতির বিষয়।

তাই ভালো রাজনীতির জন্য শুধু ভালো বক্তা নয়, ভালো শ্রোতাও প্রয়োজন। রাজনীতিককে জনগণের কথা শুনতে হবে। ক্ষমতার করিডোরে বসে মানুষের জীবন বোঝা যায় না। মানুষের কাছে যেতে হয়, তাদের কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়।

বিশ্বের স্থিতিশীল গণতন্ত্রগুলো থেকে বাংলাদেশের একটি বড় শিক্ষা নেওয়ার আছে। সেখানে রাজনৈতিক দল ও সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। ক্ষমতার পরিবর্তন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে না। কারণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

আমাদের সমস্যার একটি বড় কারণ হলো—আমরা প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির অধীন করে ফেলি। অথচ ব্যক্তি চলে যান, প্রতিষ্ঠান থাকে। সরকার পরিবর্তিত হয়, রাষ্ট্র থাকে। রাজনৈতিক দল বদলায়, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকার কথা। তাই রাষ্ট্রের চেয়ে কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের অবস্থান বড় হতে পারে না।

ভালো রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র অপরিহার্য। যে দল নিজের ভেতরে প্রশ্ন সহ্য করে না, সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে কীভাবে? নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ মতপ্রকাশের সুযোগ, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরি—এসবকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করতে হবে।

রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব নিয়ন্ত্রণও জরুরি। নির্বাচন যদি বিপুল অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতির দরজা ক্রমে সংকুচিত হবে। রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা, নির্বাচনি ব্যয়ের বাস্তবসম্মত সীমা, দলীয় অর্থের হিসাব প্রকাশ এবং প্রার্থীদের সম্পদ ও স্বার্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে রাজনীতির সংস্কার শুধু রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়। নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব আছে। আমরা অনেক সময় রাজনীতিকের দুর্নীতির সমালোচনা করি, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় তাঁর সততা ও যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিই। আমরা রাজনৈতিক নেতার কাছে নৈতিকতা চাই, কিন্তু নিজেদের জীবনে ঘুস, অনিয়ম ও সুবিধাবাদকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই।

গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত নাগরিকদেরই প্রতিফলন। নাগরিক সমাজ যদি অন্যায়কে স্বাভাবিক করে নেয়, তাহলে রাজনীতিও অন্যায়মুক্ত থাকবে না।

এই কারণেই রাজনৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন পরিবার থেকে। বিদ্যালয়ে শিশুদের শেখাতে হবে—ক্ষমতা মানে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, দায়িত্ব নেওয়া। বিতর্ক মানে ঝগড়া নয়, যুক্তির বিনিময়। ভিন্নমত মানে শত্রুতা নয়। দেশপ্রেম মানে শুধু জাতীয় দিবসে পতাকা উত্তোলন নয়; সৎভাবে কাজ করা, আইন মানা, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা, কর দেওয়া এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোও দেশপ্রেম।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরির বাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে না; গণতান্ত্রিক নাগরিকও তৈরি করবে। বিতর্ক, গবেষণা, সামাজিক উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবা ও নীতিনির্ভর রাজনৈতিক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাঙ্গন যেন দলীয় দখল, সহিংসতা ও অন্ধ আনুগত্যের জায়গা না হয়ে যুক্তি, চিন্তা ও মতবিনিময়ের জায়গা হয়।

রাজনীতি থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

ইতিহাসের শিক্ষা হলো—কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। যে ক্ষমতা আজ অপ্রতিরোধ্য মনে হয়, সময়ের পরিবর্তনে সেটিই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। যে নেতা আজ জনতার উল্লাসে ঘেরা, কাল তিনি ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজ, ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং সততার উদাহরণ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে।

রাজনীতির শিক্ষা তাই ক্ষমতার অহংকার নয়, ক্ষমতার অস্থায়িত্ব। প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা নয়, মতের পার্থক্যকে সহ্য করা। রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি মনে করা নয়, রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করা।

অন্যদিকে শিক্ষার রাজনীতি বলতে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বোঝালে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থাকবে। শিক্ষা নিজেই একটি রাজনৈতিক বিষয়। রাষ্ট্র কেমন নাগরিক তৈরি করতে চায়, কোন মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেবে, কোন ইতিহাস পড়াবে, কোন শ্রেণির শিশু কী ধরনের শিক্ষা পাবে—এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন জড়িত।

তাই শিক্ষানীতি কোনো সরকারের মেয়াদের সঙ্গে বদলে যাওয়ার বিষয় হওয়া উচিত নয়। একটি দেশের শিক্ষা নীতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার। রাজনৈতিক দল বদলাবে, সরকার বদলাবে; কিন্তু শিক্ষার মূল লক্ষ্য, মান ও দর্শন যেন প্রতিবার নতুন করে রাজনৈতিক পরীক্ষার শিকার না হয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠন। রাজনীতিকে সম্পদ অর্জনের সিঁড়ি থেকে জনসেবার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে হবে। রাজনৈতিক দলকে ব্যক্তির ওপর নয়, প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড় করাতে হবে। ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি এবং নেতৃত্বের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে হবে।

আর শিক্ষাকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে—মানুষ তৈরি করার কাজে।

আমরা যদি কেবল উন্নত সড়ক, সেতু ও ভবন নির্মাণ করি, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল রাখি, তবে উন্নয়ন টেকসই হবে না। আমরা যদি লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট দিই, কিন্তু তাদের বিবেক, যুক্তি ও নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি না করি, তবে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু শিক্ষিত সমাজ তৈরি হবে না।

রাজনীতিকে শিক্ষিত হতে হবে—জ্ঞান, যুক্তি, নৈতিকতা ও ইতিহাসের কাছে। আর শিক্ষাকে রাজনৈতিক হতে হবে—অর্থাৎ নাগরিক অধিকার, ন্যায়, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মসমালোচনা হওয়া উচিত এখানেই: আমরা রাষ্ট্রের অবকাঠামো অনেকটা বদলাতে পেরেছি, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কতটা বদলাতে পেরেছি? আমরা শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছি, কিন্তু শিক্ষার আলো মানুষের চরিত্রে কতটা পৌঁছেছে?

এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দেশ শুধু তার অর্থনীতির আকারে বড় হয় না; বড় হয় তার রাজনৈতিক চরিত্রে। কোনো সমাজ শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যায় আলোকিত হয় না; আলোকিত হয় যখন তার মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে শেখে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে এবং নিজের স্বার্থের বাইরে বৃহত্তর জনকল্যাণকে দেখতে শেখে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে তাই পথ একটাই—ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দায়িত্বের রাজনীতিতে ফিরে আসা। আর সেই পথের সবচেয়ে শক্তিশালী সেতু হতে পারে শিক্ষা। তবে সে শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার শিক্ষা নয়; সে শিক্ষা হবে বিবেকের, যুক্তির, নৈতিকতার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা।

যেদিন রাজনীতি বুঝবে ক্ষমতা মানুষের ওপর নয়, মানুষের জন্য; যেদিন শিক্ষা বুঝবে ডিগ্রি দেওয়াই তার শেষ লক্ষ্য নয়, নাগরিক তৈরি করাই তার প্রকৃত দায়িত্ব—সেদিনই হয়তো স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশ শুধু উন্নত হয়নি, পরিণতও হয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম