দেশজুড়ে

পিরোজপুরে মরিচের কেজি ৪০০ টাকা

পিরোজপুরের কাঁচাবাজারে সবজির ঊর্ধ্বমুখী দামের চাপে হাঁসফাঁস করছেন সাধারণ ক্রেতারা। টানা বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে প্রায় ২৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে কাঁচামরিচের দাম এখন ৪০০ টাকা। যা এখন নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে।

Advertisement

রবিবার (২ আগস্ট) পিরোজপুর সদর কাঁচাবাজারে ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যার প্রভাবে বাজারে অনেক সবজির দাম সেঞ্চুরি ছুঁয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। দুই সপ্তাহ আগে যেখানে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতো, গত সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। বর্তমানে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।

পাশাপাশি বেগুন, কাঁকরোল, করলাসহ বিভিন্ন সবজির দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে মাছ ও ডিমের দামও ঊর্ধ্বমুখী থাকায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।

বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৯০ টাকা, পটোল ৫০ থেকে ৭০, ঢ্যাঁড়স ৬০ থেকে ৮০, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ এবং কাঁকরোল ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগের তুলনায় এসব সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে।

Advertisement

মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। বড় ইলিশ প্রতি কেজি ২২০০ থেকে ৩০০০ এবং ছোট ইলিশ ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। এছাড়া সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ৬০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ভরসা চাষের মাছের বাজারেও বেড়েছে দাম। পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩২০ টাকা, তেলাপিয়া ২৮০ থেকে ৩৫০ এবং রুই মাছ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। দেশীয় প্রজাতির মাছের সরবরাহও খুবই কম। অল্প পরিমাণে যা পাওয়া যাচ্ছে, তার দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিভিন্ন দেশীয় মাছ প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ডিমের বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতি হালি লাল ডিম ৫০ টাকা, সাদা ডিম ৪৮, দেশি মুরগির ডিম ৭০ এবং হাঁসের ডিম ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা সব ধরনের সবজির দাম বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে মাছ ও ডিমের বাজারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে তাদের দাবি।

Advertisement

এদিকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, সাগরে অনিয়ন্ত্রিত ট্রলিং এবং নদী-জলাশয়ে অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারের কারণে মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। সাগর ও দেশীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব মাছের দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে বলে জানান তারা।

পিরোজপুর পৌর কাঁচাবাজারে সবজি কিনতে এসেছেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের মতন সাধারণ মানুষের এত দাম দিয়ে সবজি কেনা আর সম্ভব না। কাঁচামরিচের কেজি এখন ৪০০ টাকা। প্রত্যেকটা সবজিতে ৮০ থেকে ১০০ বাড়ছে। আমরা গরিব মানুষ, খাইতাম একটু সবজি, তাও এখন ১০০ টাকার উপরে। আমাদের কথা সরকারের চিন্তা করা উচিত।

পৌর মাছ বাজারে ইলিশ মাছ কিনতে এসেছেন এমএ মুন্না তিনি বলেন, ‘এখন ইলিশের মৌসুম তারপরেও আমরা মাছ কিনতে পারতেছি না। গত বছরও ইলিশ মাছ কিনেছি কিন্তু এ বছর বাজারে তেমন ইলিশ মাছ দেখা যাচ্ছে না। যাও পাই তা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কি আর তিন হাজার টাকা দিয়ে ইলিশ মাছ কেনা সম্ভব! যেদিন দাম কমবে সেদিন কিনব।’

পৌর মাছ বাজারের ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, ‘মোকামে পাইকারি বাজারেই মাছের দাম অনেক বেশি। বড় ইলিশ প্রতি কেজি ২২০০ থেকে ২৮০০ টাকায় কিনতে হয়। এছাড়া পোয়া ৫০০, রূপচাঁদা ১২০০ এবং তপস্বী মাছ ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা কেজি দরে পাইকারি কিনতে হচ্ছে। আমরা যেমন বেশি দামে কিনতেছি আবার এরকম করেই বিক্রি করতেছি।’

কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী সুমন খান (৩৩) বলেন, ‘বন্যায় অনেক এলাকার সবজির খেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। এর জন্যই বর্তমানে সবজির দাম বেশি। দু এক সপ্তাহ গেলে হয়তো সবজির দাম কমতে পারে। তবে কাঁচামরিচের দাম সবচেয়ে বেশি, প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা। এতে আমাদের কেনাবেচাও অনেক কমে গেছে।’

ডিম ব্যবসায়ী আরিফ খান (৫০) বলেন, ‘ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের ডিমের দাম প্রতি হালিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। ফলে ক্রেতারাও আগের তুলনায় কম ডিম কিনছেন। বর্তমানে প্রতি হালি হাঁসের ডিম ৭০ টাকা, লাল ডিম ৫০ এবং দেশি মুরগির ডিম ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, ইলিশ একটি সামুদ্রিক মাছ। মৌসুমে ডিম পাড়তে তারা সাগর থেকে নদীতে আসে, কিন্তু বর্তমানে নদ-নদীতে অনেক ডুবোচর দেখা যায়, যার কারণে সমুদ্র থেকে নদীগুলোতে ইলিশ আসতে বাধা সৃষ্টি হয়। হয়তো এ কারণেই বর্তমানে নদীগুলোতে ইলিশ কম দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও পিরোজপুরে যে পরিমাণ ইলিশ মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ে সেগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। এ কারণেই জেলার স্থানীয় বাজারগুলোতে ইলিশের উপস্থিতি কম দেখা যাচ্ছে। চায়না দুয়ারী জালের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন ধ্বংস হচ্ছে। জেলা এবং উপজেলা মৎস্য অফিস গুলো নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে এসব অবৈধ জাল ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধিতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মো. তরিকুল ইসলাম/কেজে/জেআইএম