বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য বিষয়ক সংকটগুলোর একটি হলো এইডস। এই মারণব্যাধির জন্য দায়ী এইচআইভি ভাইরাস। ইউএনএইডস-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন মানুষ এইডস আক্রান্ত।
Advertisement
প্রতিদিন এইডসে গড়ে আক্রান্ত হচ্ছেন সাড়ে ৫ হাজার মানুষ। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মানুষ এ প্রাণঘাতী রোগে মারা গেছেন।
ওয়ার্ল্ডোমিটারস এর তথ্যমতে, বিশ্বে এইচআইভি আক্রান্ত রোগী ৪ কোটি ৪১ লাখ ৩৬ হাজার ১৩৪ জন। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে বিশ্বে ১৫ লাখ ৪০ হাজার ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
১৯৮০ সালে প্রথম এই ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে বলে জানা যায়। প্রাণঘাতী ব্যাধি এইডস সম্পর্কে সবারই কমবেশি ভুল ধারণা আছে।
Advertisement
এ কারণেই এইডস রোগীকে খারাপ চোখে দেখে সমাজ। সবার ধারণা থাকে, এই রোগটি হওয়ার মূল কারণ হলো অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক!
এইডস (AIDS) কী ?এইডস (AIDS) হলো এইচআইভি (HIV) ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট একটি মরণব্যাধি। এই ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়, ফলে সাধারণ রোগেও মৃত্যু হতে পারে। এটি প্রধানত অনিরাপদ যৌন মিলন বা আক্রান্তের রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে ছড়ায়। সঠিক সচেতনতাই এর প্রধান প্রতিরোধ।
এইচআইভি (HIV) ভাইরাস কীএইচআইভি হলো একটি ভাইরাস যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে। ফলে শরীর সাধারণ রোগেও মারাত্মক আক্রান্ত হয়। এর চূড়ান্ত পর্যায়ই হলো ভয়াবহ এইডস রোগ।
এইডস (AIDS) কেন হয়?শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও একাধিক কারণ আছে এইচআইভি পজেটিভ হওয়ার। এইডসের জন্য দায়ী ‘হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস’ (এইচআইভি) নামের রেট্রোভাইরাসটি। মানুষের রক্ত ও অন্যান্য দেহ রসেই একমাত্র বেঁচে থাকে এই ভাইরাস।
Advertisement
রোগীর দেহ থেকে অন্যের শরীরে ছড়ায় রক্ত ও বীর্যের মাধ্যমে। বীর্যের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় বলেই এই অসুখকে ‘সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি সর্দি-কাশিকেও আটকাতে পারে না শরীর। ফলে ‘অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি সিনড্রোম’ বা এইডসের প্রভাবে মৃত্যু অবধারিত হয়ে ওঠে।
যদিও এইচআইভিতে আক্রান্তদের বাঁচাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেষ্টার শেষ নেই। চলছে একের পর এক গবেষণা।
আরও পড়ুন:এইডস কী? এইডস মুক্ত থাকার উপায় কী?শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমেই কি শুধু এইডস ছড়ায়?
এইডস কীভাবে ছড়ায়?এইডস প্রধানত অনিরাপদ যৌন মিলন, আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহার এবং আক্রান্ত মায়ের থেকে শিশুর শরীরে ছড়ায়। সচেতনতাই এর মূল সুরক্ষা।
অসুরক্ষিত যৌন মিলন কনডম ব্যবহারে সতর্কতা সূঁচ ও সিরিঞ্জের ঝুঁকি মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ ব্যয়বহুল চিকিৎসা অনিরাপদ চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্ষত ও লালার মাধ্যমে ঝুঁকি অসুরক্ষিত যৌন মিলননারী বা পুরুষ কারও যদি শরীরে এই ভাইরাস থাকে, তাহলে যৌন সম্পর্কের ফলে অন্যজনের শরীরে সহজেই প্রবেশ করবে এই রেট্রোভাইরাস।
কনডম ব্যবহারে সতর্কতাকনডম ব্যবহার করলে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা এমন ধারণাও ঠিক নয়। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন মিলনের সময়ে কনডম ফুটো হয়ে গেলে আপনি বিপদে পড়তে পারেন।
সূঁচ ও সিরিঞ্জের ঝুঁকিইঞ্জেকশন নেওয়ার সময় নতুন সিরিঞ্জ ও সূচ ব্যবহার করা না হলে দ্রুত এই ভাইরাস অন্যের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
মা থেকে শিশুতে সংক্রমণএইডসে আক্রান্ত প্রসূতির সন্তানের শরীরেও এইডস হতে পারে। বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুর দেহে এই ভাইরাস প্রবেশ করে। ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ২ মিনিটে একটি শিশু এইডসে আক্রান্ত হচ্ছে।
ব্যয়বহুল চিকিৎসাআধুনিক কিছু ওষুধে এই রোগে রোগীর জীবন কিছুদিন বাড়ানো গেলেও সে সব চিকিৎসা পদ্ধতি মোটেও মধ্যবিত্তের আয়ত্বে নেই।
অনিরাপদ চিকিৎসা সরঞ্জামএইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ , অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সুস্থ ব্যক্তির দেহে ভুলবশত ব্যবহার হলে তা থেকে রোগ ছড়ায়।
ক্ষত ও লালার মাধ্যমে ঝুঁকিএইচআইভিতে আক্রান্তদের মাড়ির ক্ষত ও দেহের ক্ষত থেকে নিঃসৃত লালা ও রস থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
এইডস প্রতিরোধে করণীয় ৬টি উপায়আপনি যদি এইচআইভি ‘তে ভোগেন, তাহলে অবশ্যই সতর্ক থাকবেন। আপনার কারণে যাতে পরিবারের অন্য কেউ মারাত্মক এই রোগে আক্রান্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এর পাশাপাশি নিয়মিত চেকআপ করুন।
জরুরি সুরক্ষা (PEP) সুরক্ষিত মিলন সঙ্গীর প্রতি দায়বদ্ধতা নিরাপদ ইনজেকশন গর্ভকালীন সতর্কতা খৎনার সুফল জরুরি সুরক্ষা (PEP)আপনি যদি এইচআইভি’র সংস্পর্শে ভুল করেও আসেন, তাহলে পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস ব্যবহার করুন। এক্ষেত্রে প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিইপি গ্রহণ করার মাধ্যমে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে ২৮ দিন ওষুধ খেতে হবে।
সুরক্ষিত মিলনজীবন বাঁচাতে এবং এইচআইভি সংক্রমণ রুখতে প্রতিটি শারীরিক সম্পর্কের সময় অবশ্যই নতুন ও মানসম্মত কনডম ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
সঙ্গীর প্রতি দায়বদ্ধতাএইচআইভি থাকলে যৌন সঙ্গীকে আগেই জানান। না হলে আপনার ভুলে তিনিও আক্রান্ত হতে পারেন।
নিরাপদ ইনজেকশনইনজেকশন গ্রহণের সময় পরিষ্কার সুঁই ব্যবহার করা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করুন।
গর্ভকালীন সতর্কতাএইচআইভি পজিটিভ অবস্থায় আপনি যদি গর্ভধারণ করেন তাহলে শিশুর শরীরেও এই সংক্রমণ ঘটতে পারে। তবে আপনি যদি গর্ভাবস্থায় চিকিৎসা গ্রহণ শুরু করেন, তাহলে আপনি ও শিশু উভয়ই সুস্থ থাকবেন।
খৎনার সুফলবিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের সুন্নতে খৎনা এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
শেষ কথাএইচআইভি ভাইরাসের কারণে এইডস হয়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে। এটি মূলত অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক, আক্রান্তের রক্ত গ্রহণ ও ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে ছড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনে বা নির্দিষ্ট সময়ে কেবল একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গীর সাথে সম্পর্ক রাখা ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
সূত্র: মায়োক্লিনিক
জেএমএস/জেআইএম