মাগুরার শালিখা উপজেলার শতপাড়া গ্রাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ১৮৫৫ সালের এক প্রাচীন মসজিদ। মসজিদের ভেতরেই আছে এক বিস্ময়কর কুয়া। কুয়াটি খননের সময়ই গড়ে ওঠে মসজিদটি। উদ্দেশ্য ছিল মুসল্লিদের ওজুর জন্য সহজে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার ব্যবস্থা। আজও সেই কুয়ায় পানি থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
Advertisement
সরেজমিনে জানা যায়, এখন শুধু ওজুর কাজেই নয় বরং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এলাকার সব মানুষের পিপাসা মেটানোর একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছে এই কুয়া। শিশু থেকে বৃদ্ধ, মুসলিম থেকে হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে এসে তৃষ্ণা মেটান। কেউ বাধা দেন না, কেউ প্রশ্ন তোলেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৫৫ সালে ওজিউদ্দিন মুন্সী নামের এক ব্যক্তির উদ্যোগে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি কুয়াটিও খনন করা হয়। এ গ্রামে চৈত্র-বৈশাখ মাসে কোনো টিউবওয়েলে পানি ওঠে না। তখন সবাই মসজিদের কুয়া থেকে পানি নিয়ে পান করেন। রান্না-বান্নাসহ ওজু-গোসলের কাজও করা হয়। আল্লাহর অশেষ রহমত, যত পানিই এই কুয়া থেকে উত্তোলন করা হোক না কেন, পানি কখনো কমে না।
শতপাড়া গ্রামের অজেদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৮৫৫ সালের এই প্রাচীন মসজিদ ও তার ভেতরের এক রহস্যময় কুয়া, যা আজও বহন করে চলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানবতার বার্তা। প্রায় ২০০ বছর আগে খনন করা কুয়াটি শুধু পানি সরবরাহের উৎসই নয় বরং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এলাকাবাসীর জন্য এক অনন্য আশ্রয়স্থল।’
Advertisement
স্থানীয় কাজী আব্দুস সালামসহ অনেকেই জানান, কুয়ার পানি শুধু দেহের তৃষ্ণা মেটায় না, মনকেও শান্ত করে। পবিত্র মসজিদের সীমানায় থাকা এই উন্মুক্ত কুয়া যেন জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানবতার, সহমর্মিতার আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। পথচারীরা থেমে গিয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তাকায়। এই কুয়া যেন বলে এখানে ধর্মের দেওয়াল নেই, আছে শুধু মানবতার উৎস। দুই শতাব্দী ধরে বয়ে চলা এই পানির ধারা শুধু কুয়া নয়, এটি ভালোবাসার, বিশ্বাসের আর একসঙ্গে বাঁচার প্রতীক। অনেকেই আবার রোগমুক্তির জন্য এই কুয়া থেকে পানি পান করেন।
আরও পড়ুনস্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি শীতে ঘুরে আসুন পৃত্থিমপাশা জমিদারবাড়ি
মালেক মোল্লা নামের স্থানীয় মুসল্লি বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন মানুষ রোগের জন্য, বিশেষ করে যাদের পেটের সমস্যা আছে; তারা এই মসজিদে এসে কুয়ার পানি সংগ্রহ করেন এবং তা পানও করেন। তারা এই পানি পান করে উপকৃত হয়েছেন।’
মোছা. খাদিজা খাতুন নামের স্থানীয় নারী বলেন, ‘এই কুয়ার পানি খেয়ে এখন পর্যন্ত কারও কোনো সমস্যা হয়নি। গরমকালে পানি খুব ঠান্ডা থাকে। শীতকালে উষ্ণ গরম অনুভূত হয়।’
Advertisement
মসজিদের ইমামের কাছে পড়তে আসা নাহিমা আক্তার রাহি নামের এক শিশু বলে, ‘আমরা প্রতিদিন মসজিদে ইমামের কাছে পড়তে আসি। আমাদের পিপাসা লাগলে কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে খাই। এই পানি খেয়ে আমাদের খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে গরমকালে যখন টিউবওয়েলে পানি ওঠে না; তখন এই কুয়াই হয় সবার ভরসা।’
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হুসাইন শিকদার বলেন, ‘মসজিদটি নির্মাণ করতে চুন, সুড়কি ও ইট ব্যবহার করা হয়েছে। কুয়াটি প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া। ভেতরের অংশ লম্বায় প্রায় ২০০ ফুটের মতো। প্রাচীন আমলে কুয়াটি মসজিদের বাইরে ছিল। কিন্তু মসজিদ সম্প্রসারণের সময় এটি মসজিদের ভেতরে পড়ে যায়। এলাকাবাসী কুয়াটি নষ্ট না করে সম্মানের সঙ্গে মসজিদের ভেতরেই রেখে দিয়েছেন। আজও সেই কুয়া থেকে স্বচ্ছ, ঠান্ডা ও সুপেয় পানি মোটর ও টিউবওয়েলের মাধ্যমে তোলা হয়।’
এসইউ