দেশে মোবাইল ফোন আমদানিতে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে সরকার। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশের মোবাইল ফোন উৎপাদক ও আমদানিকারকরা। এরই মধ্যে মোবাইল ফোনের দাম কমানোরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী মাসখানেকের মধ্যেই সব ধরনের মোবাইল ফোনের দাম কম-বেশি কমতে পারে।
Advertisement
বাজারে এখন যেসব মোবাইল ফোনের দাম ৩০ হাজার টাকার বেশি সেগুলোতে সাড়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমার আভাস রয়েছে। তবে এরচেয়ে কম দামের মোবাইল ফোনের দাম কমতে পারে মাত্র ১ শতাংশ! মোবাইল উৎপাদক ও আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি পূরণে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) মোবাইল ফোন আমদানিতে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে সরকার। এতে আমদানি করা ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের স্মার্টফোনের দাম সাড়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমবে বলে প্রত্যাশা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
একই সঙ্গে দেশে সংযোজিত ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত কমবে বলে প্রত্যাশা রাজস্ব আহরণকারী এ প্রতিষ্ঠানটির। গ্রাহক পর্যায়ে মোবাইল ফোনের দাম কমাতেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
Advertisement
ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে মোবাইলের উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কমিয়ে মঙ্গলবার দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এনবিআর। এতে মোবাইল আমদানিতে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমেছে।
দেশে অবৈধপথে আসা মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে সরকার সম্প্রতি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মোবাইল দোকানি ও ব্যবসায়ীরা চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
এ নিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীদের দমাতে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারও করে সরকার।
মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। সরকারের পক্ষ থেকেও শুল্ক কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যটির আমদানি শুল্ক কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর।
Advertisement
আরও পড়ুনমোবাইল ফোন আমদানিতে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমালো এনবিআরমেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি, দাম বাড়তে পারে স্মার্টফোনের
জানতে চাইলে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন টিপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা আশা করি সামনে মোবাইল ফোনের দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। এখন পর্যন্ত যেসব মোবাইল বিক্রি করছি সেগুলো আগের শুল্ক বা ট্যাক্স দিয়ে আনা। নতুন করে যখন স্পেয়ার পার্টস আমদানি করবো অথবা এখন যেসব মোবাইল ফোন বৈধভাবে আমদানি করা হবে বাজারে গ্রাহক পর্যায়ে সেগুলোর দামে শুল্ক কমানোর প্রভাব পড়বে।’
কবে নাগাদ দাম কমবে—এমন প্রশ্নে এমআইওবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘দাম ঠিক কবে নাগাদ কমবে সেটি নির্দিষ্ট করে এখনই বলা যাবে না। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা দাম কমিয়ে আনার চেষ্টা করবো। সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে দাম কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।’
বাংলাদেশে অফিসিয়াল মোবাইল ফোন বিক্রি হয় ১ কোটির মতো। আনঅফিসিয়াল ২০ লাখের মতো। এরমধ্যে আমরা দেশে যে ১ কোটি মোবাইল উৎপাদন করি, সেখাকার ৯০ শতাংশেরই দাম ৩০ হাজারের কম—জিয়াউদ্দিন চৌধুরী
স্যামসাং মোবাইল উৎপাদক ও দেশব্যাপী পরিবেশক এক্সেল টেলিকম প্রাইভেট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন টিপু বলেন, ‘সরকার ৬০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে, আমরা যারা এখানে উৎপাদন ও সংযোজন করি এবং বৈধপথে আমদানি করি, আরও যৌক্তিক পর্যায়ে শুল্ক কমিয়ে আনার দাবি করেছিলাম। এনবিআর বলেছে, আগামী বাজেটে আরও শুল্ক কমানো হবে। আপাতত যেটুকু কমেছে এতে ভোক্তারা উপকৃত হবেন। তবে আরও কমানো হলে ভোক্তাদের জন্য আরও ভালো হতো।’
তিনি বলেন, ‘এনবিআর জানিয়েছে শুল্ক কমায় একটি মোবাইলের দাম যদি ৩০ হাজার টাকা হয়, তাহলে সেটার দাম ৫ হাজার টাকার মতো কমবে। আমরা মনে করছি, দাম এমনই কমবে। এনবিআরের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’
‘বিশ্বে মোমরি চিপ সংকটের কারণে মোবাইল ফোনের দাম বেড়েছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও নেপালে দাম বেড়েছে। বাংলাদেশেও সে প্রভাব পড়েছে। আমরা এরই মধ্যে দাম এডজাস্ট করেছি, এখনো দাম পুনর্মূল্যায়ন করা হবে’—যোগ করেন সাইফুদ্দীন টিপু।
জানতে চাইলে এমআইওবির কার্যকারী সদস্য ও শাওমি বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার যেহেতু আমদানি শুল্ক কমিয়েছে, আমরা এখন দাম পুনর্নির্ধারণ করবো। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে বলা যাবে দাম কতটুকু কমছে।’
তিনি বলেন, আমরা এরই মধ্যে প্রাইস স্ট্রাকচার করা শুরু করে দিয়েছি। তবে আমরা যেসব মোবাইল ফোন দেশে উৎপাদন করি, সেগুলোর দাম খুব বেশি কমবে না। আমদানি করা ফোন অর্থাৎ ৩০ হাজার টাকার ফোনে ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার বেশি কমবে, এনবিআর এমনটিই জানিয়েছে। আমরা এখন সেখানেই থাকতে চাই।’
‘আমরা যারা স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদন করি, সেখানে এর প্রভাব খুব কম পড়বে। এখানে প্রভাব হবে ইনসিগনিফিকেন্ট। মানে দেশে উৎপাদিত ফোনের দাম ১ শতাংশেরও কম কমবে।’
অন্য এক প্রশ্নে জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘গত নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকেই বিশ্বে মোবাইল ফোনের দাম বেড়েছে। এটি হয়েছে এআই মেমোরি সংকটের কারণে। সে কারণে দেশে ফোনের দাম এডজাস্টমেন্ট করেছি। এখন যে ঘোষণা এসেছে সেখানে আমরা মূল্য পুনর্নির্ধারণ করবো।’
‘বাংলাদেশে অফিসিয়াল মোবাইল ফোন বিক্রি হয় ১ কোটির মতো। আনঅফিসিয়াল ২০ লাখের মতো। এরমধ্যে আমরা দেশে যে ১ কোটি মোবাইল উৎপাদন করি, সেখাকার ৯০ শতাংশেরই দাম ৩০ হাজারের কম। এই সেগমেন্টে দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম। আমরা আগে সরাসরি মোবাইল আমদানি করিনি। যেহেতু শুল্ক কমেছে, এখন আমরাও দামি ফোনগুলো বিদেশ থেকে আমদানির চেষ্টা করবো’—বলেন শাওমি বাংলাদেশের এ কান্ট্রি ম্যানেজার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের শুল্ক কমানোর এ উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি খুবই ভালো সিদ্ধান্ত। এর প্রভাবে মোবাইল ফোন গ্রাহকরা উপকৃত হবেন। তবে সরকার শুল্ক কমালেও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় পণ্যের দাম দ্রুত কমায় না। কিন্তু ১ টাকা ট্যাক্স বাড়লে বাজারে ঠিকই তাৎক্ষণিক তার প্রভাব পড়ে।’
আরও পড়ুন
অনিবন্ধিত মোবাইল ফোন নিবন্ধনের সময় বাড়লো
তিনি বলেন, ‘সরকার যেহেতু মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে, আমদানিকারক ও উৎপাদকদের উচিত হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফোনের দাম কমানো। এটি যত দ্রুত করা যাবে গ্রাহকরা তত উপকৃত হবেন।’
শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের প্রতিটি আমদানি করা মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক ৫ হাজার ৫০০ টাকা কমবে। আর ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের দেশে সংযোজিত প্রতিটি মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক দেড় হাজার টাকা কমবে—এনবিআর
এদিকে, মোবাইল ফোনের দাম সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এনবিআর। এতে মোবাইল ফোন আমদানিতে প্রযোজ্য বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৬০ শতাংশ কমেছে।
এনবিআর জানিয়েছে, কাস্টমস ডিউটি কমানোর কারণে মোবাইল ফোন সংযোজনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বিরূপ প্রতিযোগিতার মুখে না পড়ে, সে লক্ষ্যে মোবাইল ফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উপকরণ আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। এতে এ উপকরণ আমদানি শুল্ক ৫০ শতাংশ কমেছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের প্রতিটি আমদানি করা মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক ৫ হাজার ৫০০ টাকা কমবে। আর ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের দেশে সংযোজিত প্রতিটি মোবাইল ফোনের দাম আনুমানিক দেড় হাজার টাকা কমবে।
মোবাইল ফোন আমদানি ও সংযোজন শিল্পের উপকরণ আমদানিতে সরকার উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক কমানোয় সব ধরনের মোবাইল ফোনের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। এতে নাগরিকরা ডিজিটাল সেবাগ্রহণে সুবিধা পাবেন। সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে—বলছে এনবিআর।
দাম কমাতে দেশে উৎপাদিত ফোনের যন্ত্রাংশ ও আমদানি করা মোবাইল ফোনে গত ১ জানুয়ারি শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার’ বা এনইআইআর চালুর উদ্যোগ ঘিরে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন ও দাবির মধ্যে ওইদিন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় শুল্ক ছাড়ের এ সিদ্ধান্ত হয়।
দেশে মোবাইল উৎপাদন, ম্যানুফেকচারিং ও আমদানির সঙ্গে জড়িত একটি গোষ্ঠীকে সুযোগ দিতেই সরকার এনইআইআর বাস্তবায়ন করছে। মূলত, একটি গোষ্ঠীকে সুযোগ দিতে কোম্পানিগুলোর অর্থায়নেই মোবাইল নিবন্ধনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার—দাবি ব্যবসায়ীদের
এদিকে, এনইআইআর বাস্তবায়নের ঘোষণায় নতুন বছরের শুরু থেকেই দেশের বাজারে মোবাইল ফোনের দাম বেড়েছে। যদিও মোবাইল কোম্পানিগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপ সংকটের কারণে বিশ্ববাজারেই ফোনের দাম বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। এর সাথে এনইআইআর বাস্তবায়নের সম্পর্ক নেই।
তবে আন্দোলনে থাকা মোবাইল ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশে মোবাইল উৎপাদন, ম্যানুফেকচারিং ও আমদানির সঙ্গে জড়িত একটি গোষ্ঠীকে সুযোগ দিতেই সরকার এনইআইআর বাস্তবায়ন করছে। মূলত, একটি গোষ্ঠীকে সুযোগ দিতে কোম্পানিগুলোর অর্থায়নেই মোবাইল নিবন্ধনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। তবে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি) ও বিটিআরসি তথা সরকার এসব অভিযোগ নাকচ করে আসছে।
এর মধ্যেই সরকার শুল্ক কমানোর যে ঘোষণা দিয়েছিল প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করেছে এনবিআর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বছরের শুরুতে দাম না বাড়লে শুল্ক কমানোর প্রভাব গ্রাহক পর্যায়ে অনেক বেশি পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে এখন দাম কমলেও ডিসেম্বরের তুলনায় বাজারে দাম খুব বেশি কমবে না।
ইএইচটি/এমকেআর