শীত নামলেই অনেকের ত্বকে শুরু হয় এক অদ্ভুত অস্বস্তি। প্রথমে হালকা টানটান ভাব, এরপর চুলকানি, তারপর লালচে দাগ আর খসখসে র্যাশ। শুরুতে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না পেলেও ধীরে ধীরে এই শীতকালীন ত্বকের সমস্যা হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন জীবনের বড় ঝামেলা। বিশেষ করে হাত-পা, পিঠ বা শরীরের খোলা অংশে তৈরি হওয়া শুষ্ক প্যাচগুলো যত অবহেলা করা হয়, ততই যেন তা আরও জেদি হয়ে ওঠে।
Advertisement
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালীন র্যাশ হঠাৎ একদিনে দেখা দেয় না। কয়েকদিন ধরে ত্বক একটু বেশি শুকনো লাগে, তারপর শুরু হয় চুলকানি। ধীরে ধীরে ত্বক হয়ে ওঠে খসখসে, সংবেদনশীল ও লালচে। সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হলো এই ধরনের র্যাশ সাধারণত নিজে নিজে সেরে যায় না। বরং ভুল যত্ন নিলে সমস্যা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শীতে ত্বক কেন বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়েশীতের ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা দ্রুত কেড়ে নেয়। পাশাপাশি ঘরের ভেতরে দীর্ঘক্ষণ হিটার বা গরম পরিবেশে থাকার কারণে বাতাস আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে। নিয়মিত গরম পানিতে গোসল করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এতে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে যায় এবং ত্বকের সুরক্ষাবলয় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ ত্বক হয়ে ওঠে রুক্ষ, সহজেই জ্বালাপোড়ায় আক্রান্ত এবং সামান্য স্পর্শেই অস্বস্তিকর।
Advertisement
অনেকেই লক্ষ্য করেন, দিনের বেলায় যে চুলকানি সহনীয় থাকে, রাতে তা হঠাৎ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাতে শরীরের তাপমাত্রা ও রক্ত সঞ্চালনের ধরন বদলে যায়। এতে ত্বকের স্নায়ুগুলো চুলকানির অনুভূতি বেশি তীব্রভাবে গ্রহণ করে। ফলে সাধারণ শুষ্কতা রাতের বেলায় জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তিতে রূপ নেয়, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।
গরম পানি ও শক্ত সাবান ত্বকের জন্য বড় ক্ষতিশীতকালীন র্যাশ হলে অনেকেই ভাবেন, বারবার ধুয়ে ফেললে বুঝি সমস্যা কমবে। বাস্তবে এটি উল্টো ক্ষতি করে। দীর্ঘ সময় গরম পানিতে গোসল ত্বকের সব প্রাকৃতিক তেল তুলে নেয়। আবার ক্ষারীয় বা শক্ত সাবান ত্বক পরিষ্কার করলেও সেটিকে আরও শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তোলে। এমনকি রুক্ষ জায়গা ঘষে পরিষ্কার করাও র্যাশকে আরও জ্বালাময় করে তোলে। শীতে ত্বকের দরকার কঠোরতা নয়, বরং নরম ও শান্ত যত্ন।
ময়েশ্চারাইজার লাগানোর সঠিক নিয়মময়েশ্চারাইজার ব্যবহার শীতে অত্যন্ত জরুরি, তবে কখন লাগানো হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একেবারে শুকনো ত্বকে ক্রিম লাগালে তা তেমন কার্যকর হয় না। গোসলের পর ত্বক যখন সামান্য ভেজা থাকে, তখন ময়েশ্চারাইজার লাগালে তা আর্দ্রতা ভালোভাবে আটকে রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা হালকা সুগন্ধিযুক্ত লোশনের বদলে ঘন ও সহজ ফর্মুলার ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। রাতের বেলায় ত্বক নিজেকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে, তাই এ সময় ভারী ময়েশ্চারাইজার বেশি উপকারী। সেরামাইড, গ্লিসারিন বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ত্বকের ব্যারিয়ার শক্ত করে এবং দীর্ঘক্ষণ আর্দ্রতা ধরে রাখে।
Advertisement
শীতের রাতে আঁটসাঁট থার্মাল বা রুক্ষ কাপড় ত্বকের সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি করে চুলকানি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত টাইট পোশাক ত্বকে তাপ আটকে রেখে র্যাশের অস্বস্তি বাড়ায়। তাই রাতে ঢিলেঢালা, নরম সুতির পোশাক বেছে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
গোসল হোক অল্প সময়ের ও কুসুম গরম পানিতেশীতে দীর্ঘ সময় গোসলের বদলে অল্প সময় কুসুম গরম পানিতে গোসল ত্বকের জন্য বেশি উপকারী। সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত মাইল্ড ও সাবানমুক্ত ক্লিনজার, যা ত্বক পরিষ্কার করবে কিন্তু তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট করবে না।
আরও পড়ুন: মুখের ত্বকের শত্রু এই পাঁচ জিনিস রোজার মতো চেহারা সতেজ রাখতে যা করবেন শীতে অ্যালোভেরার যত্নে ত্বক থাকুক উজ্জ্বল ও সুস্থ হঠাৎ অতিথি? অগোছালো ঘর গুছিয়ে ফেলুন চোখের পলকে হাইড্রেটিং ফেসিয়াল কি কাজে আসে?ঘরোয়া যত্নের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে হাইড্রেটিং ফেসিয়ালও শীতকালীন র্যাশ কমাতে সাহায্য করতে পারে। ডিপ হাইড্রেশন ফেসিয়াল ত্বকের আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনে এবং স্কিন ব্যারিয়ার মজবুত করে। সংবেদনশীল ত্বকের জন্য বিশেষভাবে তৈরি মেডিক্যাল-গ্রেড ময়েশ্চারাইজিং পিল ফ্লেকিনেস কমিয়ে হাইড্রেটিং উপাদান ত্বকের গভীরে পৌঁছাতে সহায়তা করে। গুরুতর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে স্কিন-রিপেয়ার থেরাপি দীর্ঘস্থায়ী আরাম দিতে পারে।
শীতকালীন র্যাশ মানেই আতঙ্ক নয়। ত্বকের পরিবর্তনগুলো বুঝে সঠিক যত্ন নিলে এই সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং আর ত্বকের ভাষা বোঝার চেষ্টা করলে শীতের দিনগুলোতেও ত্বক থাকতে পারে নরম, স্বস্তিকর ও সুস্থ এটাই শীতের সবচেয়ে কার্যকর বিউটি মন্ত্র।
তথ্যসূত্র: হেলথকেয়ারডটকম
জেএস/