৩৪ বছর পর ফের গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিতে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সব মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও অধীন দপ্তর-সংস্থাগুলো প্রচার-প্রচারণার কাজে সম্পৃক্ত। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮ জন উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারী দেশব্যাপী সফর করছেন। ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচারণায় ভোটারদের কাছে নানান যুক্তি তুলে ধরছেন তারা।
Advertisement
দেশের ৫৮টি জেলায় সপ্তাহব্যাপী এ সফরে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া উপদেষ্টাদের এ সফর চলবে আগামীকাল বুধবার (২১ জানুয়ারি) পর্যন্ত। গণভোটের প্রচারের জন্য দেশব্যাপী সফর করা এ উপদেষ্টারা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের গঠন করা নির্বাচন মনিটরিং এবং সহায়তা প্রদানকারী উপদেষ্টা কমিটিরও সদস্য।
প্রচারণার অংশ হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় এবং গণভোটে অংশগ্রহণের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তারা গণভোটের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করছেন। উপদেষ্টারা জেলা প্রশাসনসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের গণভোট নিয়ে প্রচারণা কার্যক্রম উদ্বোধনও করছেন।
আরও পড়ুন:৩৪ বছর পর গণভোট, চলছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণাজাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীরা পিছিয়ে কেন?
Advertisement
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে। একটি সাদা, অন্যটি গোলাপি। সাদা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যাবে। গোলাপি রঙের ব্যালটে জুলাই সনদের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিতে হবে।
গণভোট হচ্ছে যেসব ইস্যুতেজানা গেছে, গণভোটে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জনগণের মতামত নেওয়া হবে। সরকারব্যবস্থার কাঠামো, নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা জোরদারের প্রস্তাবগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটাররা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাবেন। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কারা কারা আছেন গণভোটের প্রচারণায়?বিভিন্ন জেলা সফরে থাকা উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন আদিলুর রহমান খান স্থানীয়, (পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়; শিল্প; গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা), সুপ্রদীপ চাকমা (পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা), ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ (পরিকল্পনা উপদেষ্টা), আসিফ নজরুল (আইন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা), সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (তথ্য ও সম্প্রচার; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা), নূরজাহান বেগম (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা), অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার (শিক্ষা উপদেষ্টা), সালেহউদ্দিন আহমেদ (অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা), মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক এবং রেলপথ উপদেষ্টা), ফরিদা আখতার (মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা), আ ফ ম খালিদ হোসেন (ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা), শারমীন এস মুরশিদ (সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা), শেখ বশিরউদ্দীন (বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা), আলী ইমাম মজুমদার (খাদ্য এবং ভূমি উপদেষ্টা), বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা), মো. তৌহিদ হোসেন (পররাষ্ট্র উপদেষ্টা), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন (নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা) ও ফারুক ই আজম (মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা)।
আরও পড়ুন:১০ দলীয় জোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কাজ করবে জাতীয় ছাত্রশক্তিসংস্কারের লক্ষ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা সময়ের দাবি: আলী রীয়াজগণভোট আগামীর বাংলাদেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে: আদিলুর রহমান
Advertisement
গত ১৫ জানুয়ারি উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান চট্টগ্রাম ও ১৬ জানুয়ারি বান্দরবান জেলা সফর করেন। তিনি বান্দরবান জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিউটে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ প্রচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। ১৭ জানুয়ারি আদিলুর রহমান খান কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা সফর করেন। আদিলুর কয়েকটি স্থানে গণভোটবিষয়ক মতবিনিময় সভা ও ভোটের গাড়ির উদ্বোধন করেন।
১৮ জানুয়ারি পাঁচজন উপদেষ্টা নয়টি জেলা সফর করেন। এর মধ্যে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালী, আসিফ নজরুল গাইবান্ধা ও পঞ্চগড়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নীলফামারী, নূরজাহান বেগম সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এবং চৌধুরী রফিকুল আবরার নরসিংদী ও শরীয়তপুর জেলা সফর করেছেন।
১৯ জানুয়ারি উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ফেনী, আসিফ নজরুল শেরপুর ও জামালপুর, আদিলুর রহমান খান কিশোরগঞ্জ, ফাওজুল কবির খান টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ, রিজওয়ানা হাসান রংপুর, ফারুক ই আজম জয়পুরহাট, নূরজাহান বেগম নাটোর ও রাজশাহী, ফরিদা আখতার ঝালকাঠি ও পিরোজপুর, আ ফ ম খালিদ হোসেন হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এবং শারমীন এস মুরশিদ সাতক্ষীরা ও যশোর সফর করেছেন।
২০ জানুয়ারি ১৬টি জেলা সফর করছেন উপদেষ্টারা। মঙ্গলবার শেখ বশির উদ্দিন ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা, আলী ইমাম মজুমদার বাগেরহাট ও খুলনা, রিজওয়ানা হাসান রাজবাড়ী, অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ, শারমীন এস মুরশিদ ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা, ফারুক ই আজম বগুড়া, সুপ্রদীপ চাকমা মাগুরা ও নড়াইল, তৌহিদ হোসেন বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা পরিদর্শন করছেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়া) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ সফর করছেন ২০ জানুয়ারি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) ১২টি জেলা সফর করবেন সাতজন উপদেষ্টা ও একজন বিশেষ সহকারী। তাদের মধ্যে সালেহ উদ্দিন আহমেদ লক্ষীপুর ও চাঁদপুর, আদিলুর রহমান খান মুন্সিগঞ্জ, আলী ইমাম মজুমদার মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া, চৌধুরী রফিকুল আবরার দিনাজপুর, রিজওয়ানা হাসান ফরিদপুর, এম সাখাওয়াত হোসেন লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম, আ ফ ম খালিদ হোসেন সিলেট ও মৌলভীবাজার এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গাজীপুর জেলা পরিদর্শন করবেন।
‘জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা জরুরি’এ বিষয়ে উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম জাগো নিউজকে বলেন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে এবং স্বাধীন বিচার ও নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্কার অপরিহার্য। যারা দল করেন তাদের ভিন্নমত আছে, তারা তাদের পছন্দমতো ভোট দেবেন, এ ব্যাপারে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো বক্তব্য নেই। তবে রাষ্ট্র পরিবর্তনের জন্য প্রার্থীদের দায়বদ্ধ করতে যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে, সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আপনারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সেই বিষয়েই আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি। মানুষকে জানাচ্ছি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলে রাষ্ট্র আপনার হবে। কেউ আর বছরের পর বছর মানুষ হত্যা করে, মানুষকে দমন করে, কথা বলতে না দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করে ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। এটা আপনার রাষ্ট্র, ভোট দিয়ে এর চাবি নিজের হাতে নিন।’
‘জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়বদ্ধতা’ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়বদ্ধতা থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আমরা বিভিন্ন জেলা সফর করছি।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, ‘এদেশে একবার কেউ ক্ষমতায় যেতে পারলে ছলেবলে কৌশলে, প্রহসনের নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। গণভোটের মাধ্যমে এরূপ হীন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটবে। রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটবে।’
আরএমএম/এসএনআর/জেআইএম