লাইফস্টাইল

প্রি-ম্যাচিউর শিশু জন্ম, একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি

একটি সুস্থ শিশুর জন্ম প্রতিটি পরিবারের স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক মা সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেন কিংবা শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারি ও লো বার্থ ওয়েট। এসব শিশুর ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এমনকি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।

Advertisement

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু সচেতন পদক্ষেপ নিলে প্রি-ম্যাচিউর বা কম ওজনের সন্তান জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

প্রি-ম্যাচিউর ও কম ওজনের শিশুর অর্থ কী?

চিকিৎসকদের মতে, ৩৭ সপ্তাহের আগেই যদি শিশু জন্ম নেয়, তাকে প্রি-ম্যাচিউর বলা হয়। জন্মের সময় শিশুর ওজন যদি ২.৫ কেজির কম হয়, তাহলে তাকে কম ওজনের শিশু ধরা হয়। এই দুই সমস্যাই মা ও শিশুর জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।

কেন সময়ের আগে বা কম ওজনের শিশু জন্ম নেয়? এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. রেজাউল করিম কাজলের বলেন, এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। যেমন- গর্ভাবস্থায় মায়ের অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা (হিমোগ্লোবিন কম থাকা), উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস, বারবার সংক্রমণ বা প্রস্রাবে জ্বালা, অতিরিক্ত শারীরিক বা মানসিক চাপ, ধূমপান বা ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশে থাকা,আগের গর্ভধারণে জটিলতার ইতিহাস। অনেক সময় মা নিজেই বুঝতে পারেন না, তার দৈনন্দিন অভ্যাসই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Advertisement

ঝুঁকি কমাতে গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই কী করা জরুরি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকেই কিছু বিষয় গুরুত্ব দিয়ে মানা উচিত।

নিয়মিত গর্ভকালীন চেকআপ: গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার ডাক্তার দেখানো অত্যন্ত জরুরি। এতে মায়ের রক্তচাপ, ওজন ও রক্তস্বল্পতা পর্যবেক্ষণ করা যায়। শিশুর বৃদ্ধি ঠিক আছে কি না জানা যায়। জটিলতার ঝুঁকি আগেই ধরা পড়ে।

ডা. কাজল বলেন, নিয়মিত চেকআপ অনেক ক্ষেত্রে প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারি আগেই প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

Advertisement

পুষ্টিকর ও পরিমিত খাবার: কম ওজনের শিশু জন্মের অন্যতম কারণ হলো মায়ের অপুষ্টি। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও দুধ রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিড খেতে হবে।

আরও পড়ুন: বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না?বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয়

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসিক শান্তি: অতিরিক্ত কাজ, রাত জাগা বা মানসিক চাপ গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর। দিনে কিছুটা সময় বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। দুশ্চিন্তা, ভয় বা হতাশা হলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা দরকার। চিকিৎসকদের মতে, মানসিক চাপ প্রি-ম্যাচিউর লেবারের ঝুঁকি বাড়ায়।

সংক্রমণ অবহেলা না করা: প্রস্রাবে জ্বালা, জ্বর, সাদা স্রাব বা তলপেটে ব্যথা এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা প্রসবকালীন জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

ধূমপান ও ক্ষতিকর পরিবেশ এড়িয়ে চলা: ধূমপান সরাসরি শিশুর ওজন কমিয়ে দেয়। এমনকি আশপাশে ধূমপান হলেও তার প্রভাব পড়ে গর্ভের শিশুর ওপর।

কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?

• তলপেটে নিয়মিত ব্যথা• রক্তক্ষরণ বা পানি ঝরা• শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া• হঠাৎ শরীর ফুলে যাওয়া বা তীব্র মাথাব্যথা

ডা. কাজলের মতে, এসব লক্ষণ আগাম সতর্ক সংকেত হতে পারে।

শুধু মায়ের সচেতনতা যথেষ্ট নয়। পরিবারের উচিত গর্ভবতী মাকে মানসিক সমর্থন দেওয়া। ভারী কাজ থেকে বিরত রাখা। সময়মতো চিকিৎসা নিতে উৎসাহ দেওয়া। একটি সুস্থ শিশু জন্ম মানে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ।

সবশেষে ডা. কাজল বলেন, প্রি-ম্যাচিউর বা কম ওজনের সন্তান জন্ম অনিবার্য নয়। সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তা এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। গর্ভকালীন যত্ন মানেই শুধু মায়ের যত্ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার বিনিয়োগ।

জেএস/জেআইএম