লাইফস্টাইল

সোনার দাম কেন মানুষকে এত টানে

‘বেড়েই চলছে সোনার দাম’ খবরের এই শিরোনাম যেন সবার মুখে মুখে। তারপরও সবাই সব সময় অপেক্ষায় থাকে ‘দাম কমেছে সোনার’ এমন খবরের। এছাড়া নতুন বছরের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা দাম প্রতি আউন্স ছাড়িয়ে গেছে ৫৫০০ ডলার, যা গত বছরের (২০২৫) শুরু থেকে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। দাম বাড়ার এই রেকর্ড বিনিয়োগ ও সুরক্ষার বার্তা স্পষ্টতই সবার মনোযোগ কেড়েছে।

Advertisement

তবে ‘সোনার দাম কেন মানুষকে এত টানে’ এই প্রশ্ন শুধুমাত্র দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য নয়; মানুষ কেন সোনাকে এত গুরুত্ব দেয় সেটা আরও বিশেষভাবে বোঝা জরুরি।

নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক সোনা

বিশ্ব অর্থনীতি যখন অস্থিরতা বা অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনে ভোগে, তখন সোনার চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়। কারণ শেয়ারবাজার, ব্যাংক বা মুদ্রা বিনিময়ের নিরাপত্তা কমে গেলে মানুষ সোনাকে নিরাপদ ‘হেভেন’ হিসেবে দেখে। ২০২৫-২৬ সালে মহাদেশিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আবারও সোনার মূল্যবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে।

Advertisement

এটা তাই নয় যে শুধুই সাধারণ মানুষ; বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রিজার্ভ হিসেবে সোনা কিনতে থাকে। যেমন ২০২৫ সালে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ৮৪ শতাংশ বেড়ে গেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ব্যাপক ক্রয় চালিয়ে যাচ্ছে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মান

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সোনা শুধুই বিনিয়োগের ধাতু নয়, এটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। অনেক দেশে বিয়ে, উৎসব বা শুভ মুহূর্তে সোনা দিয়ে আশীর্বাদ দেওয়া হয়। মা-বাবারা সন্তানদের জন্য সোনা সংগ্রহ করেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য। এমনকি সোনা অনেক পরিবারে ‘সম্পদ সংরক্ষণের’ রোল পালন করে। এই আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সোনাকে বিশেষ করে তোলে, জানাশোনা বা অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে।

টাকার মান কমলে সোনার আকর্ষণ বাড়ে

বিশ্বের অনেক দেশের মুদ্রা মূল্য নিয়মানুযায়ী সবসময় স্থিতিশীল থাকে না। যখন মুদ্রার মান কমে (যেমন টাকা বা অন্য কোনো কারেন্সি), তখন আন্তর্জাতিকভাবে দাম নির্ধারিত সোনার মূল্য তুলনায় স্থায়ী থাকে বা বাড়ে। তাই লোকেরা সোনায় বিনিয়োগ করে টাকার মূল্যহ্রাস থেকে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করে। এটাও একটা বড় কারণ যে মানুষ সোনা কেনে শুধুই সৌন্দর্য বা আনন্দের জন্য নয়, বরং এটা তাদের সঞ্চয়-সংরক্ষণ কৌশলের অংশ।

Advertisement

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি

সোনা আজ শুধু গহনা নয়, এটা একটি বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। গত বছর অনেক বিনিয়োগকারী দেখেছে স্টক বা ক্রিপ্টো থেকে সোনা ভালো রিটার্ন দিয়েছে। তাই কোনো কোনো বিনিয়োগকারী সোনাকে ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবেও দেখে। তবে এখানে সতর্কতা দরকার। কারণ সোনা বিনিয়োগে লাভের সঙ্গে ঝুঁকিও থাকে। যেমন-

গহনায় বিনিয়োগ করলে মেকিং চার্জ ও অন্যান্য খরচ থাকে, যা বিক্রি করার সময় ফেরত পাওয়া যায় না। আবার আন্তর্জাতিক মূল্য ওঠা-নামা সোজাসুজি প্রতিফলিত হয় না স্থানীয় বাজারে। সোনায় কোনো ডিভিডেন্ড বা সুদ লাভ হয় না লভ্যাংশ শুধুই দর বৃদ্ধির মাধ্যমে।

এসব কারণে বিনিয়োগের আগে ভালো গবেষণা, দীর্ঘ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ জরুরি।

সোনার বাজারের দাম স্থিরভাবে বেড়ে গেলে বা কমে গেলে তার পিছনে থাকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণ। উদাহরণস্বরূপ-

আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার-মুদ্রার ওঠানামা সুদের হার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি খনি থেকে সরবরাহের সীমা ও উৎপাদন খরচ পাঠকের জন্য পরামর্শ সোনায় বিনিয়োগ করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আপনি কি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করছেন, নাকি অস্থির বাজারের খেলা করছেন? আপনার ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কত? আপনি কি শুধুই গহনা কিনছেন নাকি বিশুদ্ধ বার/কয়েন কিনতে চাইছেন? আরও পড়ুন:  সোনা কেনার আগে যে প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজছে মানুষ বিয়ের জন্য সোনার গহনা কিনছেন? যা জানা জরুরি

সোনার দাম ওঠা-নামা একেবারেই স্বাভাবিক এটা কোনো ‘অচেনা মন্ত্র’ নয়; এর পিছনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা কাজ করে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন সোনা নিরাপদ হেজিংয়ের উপাদান, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্টক, রিয়েল এস্টেট ও অন্যান্য সম্পদের সমন্বিত পরিকল্পনা সামগ্রিকভাবে আরও ম্যাটার করে।

মানুষ সোনা নিয়ে আগ্রহী শুধু দাম বাড়ছে বলে নয়, এর পেছনে রয়েছে এককথায় সুরক্ষা, বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের অনুভূতি। সোনা একসময় মানসিক আশ্বস্তকরণ, আর্থিক হেজিং এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক; এই তিন তাল মিলিয়ে আজও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছে।

জেএস/