যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরানের চাবাহার বন্দরে অর্থায়ন বন্ধ করলো ভারত। ২০২৬ অর্থবছরের দেশটির কেন্দ্রীয় বাজেটে চাবাহার প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে এই প্রকল্পে বার্ষিক ১০০ কোটি রুপি করে বরাদ্দ দিচ্ছিল নয়াদিল্লি।
Advertisement
ইরানের সিস্তান–বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের অন্যতম কৌশলগত সংযোগ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যোগাযোগ জোরদারে এই বন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছিল ভারত।
ওমান উপসাগরের মুখে অবস্থিত চাবাহার ইরানের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর, যা দেশটিকে সরাসরি বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত করে। পাকিস্তান সীমান্তের পশ্চিমে অবস্থিত এই বন্দরটি ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের বিপরীতে অবস্থান করছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় গোয়াদার বন্দর উন্নয়ন করায় চাবাহারকে ওই অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত পাল্টা ভারসাম্য হিসেবেও বিবেচনা করা হতো।
আরও পড়ুন>>ভারতীয় নাগরিকদের ভিসামুক্ত প্রবেশ বন্ধ করলো ইরানইরানের চাবাহার বন্দরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভারতের জন্য কত বড় ধাক্কা?ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
Advertisement
ইরানের কাছে চাবাহার ছিল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির সুযোগ। আর ভারতের জন্য এটি ছিল পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র কার্যকর রুট, কারণ ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতকে স্থলপথ ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি।
চাবাহার প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততার ইতিহাস দুই দশকেরও বেশি পুরোনো। ২০০২ সালে ইরানের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হাসান রুহানির সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্রের আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পটির সূচনা হয়। পরের বছর ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ মোহাম্মদ খাতামির ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার রোডম্যাপে চাবাহারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর ভারত ও ইরানের মধ্যে সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পাকিস্তান–সমর্থিত তালেবানের বিরোধিতা এবং আফগানিস্তানে বিকল্প যোগাযোগপথ খোঁজার প্রয়োজনে চাবাহার প্রকল্প নতুন গুরুত্ব পায়। পরবর্তীতে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবে গোয়াদার বন্দরের উন্নয়ন শুরু হলে চাবাহারের কৌশলগত তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতি এই প্রকল্পকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও চাবাহার প্রকল্পে ভারতের জন্য ছয় মাসের ছাড় দিয়েছিল। সেই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৬ এপ্রিল।
Advertisement
গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, চাবাহার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর একটি চিঠির মাধ্যমে শর্তসাপেক্ষ নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের বিষয়টি জানায়, যা ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এর মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলে ভারতের অবস্থান আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটেই চাবাহার বন্দরে নতুন অর্থায়ন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি।
সূত্র: এনডিটিভিকেএএ/