আপনার কথার মাঝপথে কেউ নিজের কথা বলতে শুরু করলে কেমন লাগে? বিরক্তি, অস্বস্তি, কখনও অসম্মানিত বোধ হওয়া - সবই একসঙ্গে কাজ করে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখি, অন্যের কথার মাঝে কথা বলা সবসময়ই কি কেবল অশিক্ষা বা অসভ্যতা?
Advertisement
নাকি এর পেছনে থাকতে পারে মানসিক বা স্নায়বিক কোনো সমস্যার ইঙ্গিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি নিছক বদঅভ্যাস বা সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি। তবে কিছু পরিস্থিতিতে এটি গভীরতর মানসিক বা নিউরোলজিক্যাল সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। তাই আচরণকে বিচার করার আগে কারণ বোঝা জরুরি -
১. এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার)
Advertisement
এটি একটি নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির ইমপালস কন্ট্রোল বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম থাকে। অনেক সময় তারা মনে করেন, এখনই না বললে কথাটি হারিয়ে যাবে। ফলে অজান্তেই অন্যের কথা কেটে নিজেদের বক্তব্য বলে ফেলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এডিএইচডি আক্রান্তদের মধ্যে ‘ইন্টারাপ্টিং বিহেভিয়ার’ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
২. সোশ্যাল অ্যাংজাইটি বা সামাজিক দুশ্চিন্তা
কেউ কেউ সামাজিক পরিবেশে ভীষণ অস্বস্তি অনুভব করেন। নিজের কথা দ্রুত শেষ করে ফেলতে চান, যেন ভুল কিছু না বলেন। এই তাড়াহুড়ো থেকেই মাঝপথে কথা বলে ফেলার প্রবণতা তৈরি হয়।
৩. ইমপালস কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার
Advertisement
যদি কেউ জানেন যে অন্যের কথা কাটা ঠিক নয়, তবু নিজেকে থামাতে না পারেন - তাহলে সেটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। ইমপালস কন্ট্রোল সংক্রান্ত সমস্যাগুলো আচরণগত থেরাপির মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
৪. স্মৃতিশক্তি নিয়ে উদ্বেগ
অনেকেই ভয় পান, কথা এখনই না বললে ভুলে যাবেন। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে বা অতিরিক্ত মানসিক চাপে এই প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই মাঝপথে নিজের বক্তব্য ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
৫. নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার
কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি কেবল নিজের মতামতকেই গুরুত্ব দেন। অন্যের কথা শোনার ধৈর্য বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। এটি ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যার অংশ হতে পারে। তবে সব সময়ই এভাবে আচরণ মানেই ব্যক্তিত্বের রোগ - এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়।
আরও কিছু সাধারণ কারণ থাকতে পারেঅতিরিক্ত উত্তেজনা, কোনো বিষয়ে গভীর আগ্রহ, শৈশবের পারিবারিক অভ্যাস - এসবও মাঝপথে কথা বলার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। অনেক পরিবারে সবাই একসঙ্গে কথা বলেন, ফলে সেটিই স্বাভাবিক যোগাযোগের ধরন হয়ে দাঁড়ায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো - এই আচরণ কি আপনার সামাজিক বা পেশাগত সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করছে? যদি সহকর্মী, বন্ধু বা পরিবারের সদস্যরা বারবার অভিযোগ করেন, সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে - তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বললে সমস্যার ধরন বোঝা যায়। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, মাইন্ডফুলনেস চর্চা বা কমিউনিকেশন স্কিল ট্রেনিং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা শুধু সৌজন্য নয়, এটি আবেগগত পরিপক্বতারও পরিচয়। মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করুন - আমি কি শুনছি, নাকি শুধু বলার সুযোগ খুঁজছি?
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ, ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডারস, জার্নাল অব অ্যাটেনশন ডিসঅর্ডারস, ব্রেইন, বিহেভিয়ার অ্যান্ড ইমিউনিটি
এএমপি/এএসএম