বুশরা আজমীহঠাৎ করেই বদলে যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষের চেনা দৃশ্য চকের গন্ধ, বেঞ্চের সারি আর মুখোমুখি আলোচনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে স্ক্রিনের নীল আলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো খবরগুলো যেন এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে আবারও কি ফিরছে অনলাইন ক্লাসের দিন?
Advertisement
করোনার সময় বিশ্ব নতুন নতুন অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে অনলাইন ক্লাস। প্রায় বছরখানিক স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা সব চলেছে অনলাইনে। শিশুরা অনলাইনে ক্লাসে বেশ অভ্যস্ত হয়েছিল তখন।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের তাগিদে এই সিদ্ধান্তের আলোচনা সামনে এসেছে। বাস্তবতা বলছে, এটি আপাতত একটি পরিস্থিতিভিত্তিক উদ্যোগ, স্থায়ী কোনো রূপান্তর নয়। কারণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি অনলাইন কাঠামোর জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই স্ক্রিনের ওপারে বসে একজন শিক্ষার্থী কি সত্যিই শ্রেণিকক্ষের মতো মনোযোগী হতে পারে? শ্রেণিকক্ষের পরিবেশে থাকে এক ধরনের জীবন্ত স্পন্দন শিক্ষকের কণ্ঠ, সহপাঠীর প্রতিযোগিতা, আর শেখার এক অদৃশ্য চাপ। এই আবহ শিক্ষার্থীদের মনোযোগকে স্বাভাবিকভাবেই ধরে রাখে। অথচ অনলাইন ক্লাসে সেই পরিবেশ অনেকটাই অনুপস্থিত; এখানে মনোযোগ ধরে রাখা যেন এক ব্যক্তিগত লড়াই।
Advertisement
একটি মোবাইল স্ক্রিনে ক্লাস চলার পাশাপাশি একই ডিভাইসে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য বিভ্রান্তি নোটিফিকেশন, সামাজিক মাধ্যম, কিংবা গেমস। ফলে অনেক শিক্ষার্থী অজান্তেই শেখার মূল স্রোত থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি বাস্তবতা সবার জন্য সমান সুযোগের অভাব।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল, অনেক শিক্ষার্থীর কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইসও নেই। ফলে অনলাইন ক্লাস কখনো কখনো শিক্ষার সুযোগকে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়ার বদলে বৈষম্য আরও স্পষ্ট করে তোলে। তবুও পুরো চিত্রটা একপাক্ষিক নয়। অনলাইন শিক্ষা সময় ও স্থানকে অতিক্রম করার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নিজের সুবিধামতো শেখা, ক্লাস রেকর্ড করে বারবার দেখা এসব সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তাই বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, অনলাইন ক্লাস এখনো একটি সহায়ক মাধ্যম মূলধারার বিকল্প নয়। এটি প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু পুরো পথচলার দায়িত্ব নিতে এখনো প্রস্তুত নয়।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রয়েই যায় আমরা কি প্রযুক্তিকে কেবল সংকটের সমাধান হিসেবে দেখবো, নাকি এটিকে শিক্ষার ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে গড়ে তুলবো? কারণ শিক্ষা শুধু পদ্ধতির নাম নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা যেখানে মনোযোগ, অনুভূতি আর মানবিক সংযোগ একসঙ্গে কাজ করে। সেই অভিজ্ঞতা যতদিন স্ক্রিনের ভেতরে পুরোপুরি বন্দি না হয়, ততদিন অনলাইন ক্লাস থাকবে প্রয়োজনের সঙ্গী হয়ে কিন্তু কখনোই শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হয়ে নয়। লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ
কেএসকে
Advertisement