অর্থনীতি

ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় সরকার: অর্থমন্ত্রী

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

Advertisement

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামিং ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার আগের প্রচলিত ধারা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা, বিনিয়োগের ধরণ এবং বিনিয়োগ মূল্যায়নের মানদণ্ডও বদলে যাচ্ছে। এ কারণে দেশের সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার (পাবলিক ফাইন্যান্স) বিদ্যমান কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত করে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মূল গ্রাহক হওয়া উচিত বেসরকারি খাত, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারের ঋণ গ্রহণের কারণে সেই ভারসাম্য কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে।

Advertisement

তবে, এক্ষেত্রে রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা পরিস্থিতি একদিনে বদলানো যাবে না। তবে সরকার ধীরে ধীরে সেই পথে এগোচ্ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, চলতি বাজেটে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা বা ধারা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই ধারা অব্যাহত রাখা গেলে ভবিষ্যতে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ আরও কমে আসবে। ফলে, ব্যাংকিং খাতের ঋণের বড় অংশ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে প্রবাহিত হবে, যা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে এবং ব্যাংকিং খাতেও সরকারি ও বেসরকারি ঋণের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

Advertisement

এর আগে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস জোরদার করার পথে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার অর্থনীতিতে সরকারি বিনিয়োগ (পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট) বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অতীতে যেখানে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে তা বাড়িয়ে ১৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তার মতে, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজস্ব আয়ও বাড়াবে।

ব্যাংক ঋণ প্রসঙ্গে অর্থ সচিব জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সরকারের সামনে এখন বিকল্প অর্থায়নের বেশ কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি সরকার ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক বন্ড ইস্যু করেছে, যা ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। এ বন্ডের বিপরীতে প্রায় ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে। এতে বোঝা যায়, বাজারে বিকল্প বিনিয়োগ মাধ্যমের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

অর্থ সচিব বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে ইক্যুইটি ও বাজারভিত্তিক অর্থায়নের দিকে যেতে চায়। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন বন্ড, অরেঞ্জ বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজার ও আর্থিক বাজারকে আরও গভীর ও কার্যকর করার প্রচেষ্টা চলছে।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এসব সংস্কার ও নতুন অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হবে।

এমএএস/এএমএ