অর্থনীতি

বাজেটে সরকারের ১০ অগ্রাধিকার সময়োপযোগী, বলছে এমসিসিআই

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।

Advertisement

সংগঠনটির মতে, অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার অত্যন্ত সময়োপযোগী।

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় এ মন্তব্য করে এমসিসিআই।

সংগঠনটি বলছে, বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যে এ বাজেট প্রণয়ন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দায়িত্ব।

Advertisement

২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৬৯৫,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৮.২০ শতাংশ বেশি। এমসিসিআই এ লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বলে উল্লেখ করে এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে।

এমসিসিআইর মতে, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা করলে করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি। এমসিসিআই মনে করে, এসব উদ্যোগ কার্যকর হলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

সংস্থাটি মনে করে, বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য করনীতি সংস্কার, কর প্রশাসনের অটোমেশন, সিস্টেম, লস হ্রাস, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় অধিকতর গতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে করনেট সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আইএমএফ-এর শর্ত পূরণে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি না করে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

Advertisement

দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এমসিসিআই উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৭.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ৬.৪০ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ২১.৫৩ শতাংশ। বিনিয়োগ হ্রাসের ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে।

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ বলে এমসিসিআই মনে করে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়কালে রাজস্ব আহরণ হয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ এবং এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১.৪১ শতাংশ।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে এমসিসিআই স্বাগত জানায়। বিশেষ করে বাংলা বিজ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা, এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং ৬০,০০০ কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’ শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে চেম্বার মনে করে।

নতুন কোনো করহার বৃদ্ধি না করে করের আওতা সম্প্রসারণের নীতিকে এমসিসিআই সমর্থন করে। একই সাথে ৬৯৫,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর প্রশাসনের কাঠামোগত ও ডিজিটাল সংস্কার অপরিহার্য বলে চেম্বার মনে করে।

এমসিসিআই উৎসে করসংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানায়, কারণ বর্তমান আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন না করলে সম্পূর্ণ ব্যয়কে 'অননুমোদন যোগ্য'  হিসেবে গণ্য করে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর-দায় আরোপ করা হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিধান সংশোধন করে সম্পূর্ণ ব্যয়কে অননুমোদন যোগ্য ঘোষণা করার পরিবর্তে শুধু বকেয়া উৎসে কর এবং তার ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা কর ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করবে এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত কর ঝুঁকি হ্রাস করবে।

তবে এমসিসিআই কোম্পানির ন্যূনতম টার্নওভার কর  যৌক্তিকীকরণ বা হ্রাসে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এছাড়া, ন্যূনতম টার্নওভার কর শুধু ক্যারি ফরওয়ার্ড করা যায়, কিন্তু ফেরত প্রদানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় লাভ না করেও টার্নওভারের ভিত্তিতে কর প্রদানের এই বাধ্যবাধকতা ব্যবসার নগদ প্রবাহ, পুনর্বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে চেম্বার মনে করে।

ব্যক্তিগত করদাতাদের প্রকৃত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একদিকে সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ রেয়াতের সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে, যা নিয়মিত কর প্রদানে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে।

এমসিসিআই মনে করে, প্রস্তাবিত ডেটা কানেক্টিভিটি বা তথ্যের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহার হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে, যা ডেটার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যথাযথ আইনি সুরক্ষা ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া এ ধরনের কানেক্টিভিটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের দ্বারা তথ্যের অপব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যে অননুমোদিত নজরদারি বা তথ্যের অনৈতিক অনুসন্ধান চালানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই, তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সুদৃঢ় ও সমন্বিত আইনি এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা ব্যতিরেকে এ ধরনের সংযোগ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া সমীচীন হবে না বলে এমসিসিআই মনে করে।

ভ্যাট, শুল্ক ও সম্পূরক শুল্কের মতো পরোক্ষ করগুলো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেহেতু এসব কর ভোগ ও ব্যয়ের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পর্কিত, তাই প্রত্যক্ষ করের তুলনায় ফাঁকির সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ভ্যাট বা পরোক্ষ করের অতিরিক্ত সম্প্রসারণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে নতুন করহার বৃদ্ধি না করে করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার সরকারি নীতিকে এমসিসিআই সমর্থন করছে। একই সঙ্গে একটি টেকসই ও ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থায় কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত হয়রানি কমানো এবং পরোক্ষ কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

মূল ভ্যাট আইন, ২০১২-এর কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় এমসিসিআই হতাশ। চেম্বারের মতে, ই-ইনভয়েসিং ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ভ্যাট সংগ্রহ প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট নেট সম্প্রসারণ করে সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে চেম্বার মনে করে।

এছাড়া, পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহন সেবার উপর ১০০ শতাংশ ভ্যাট রেয়াত বহাল রাখা এবং ধারা ২০-এ কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও সামগ্রিক রেয়াত কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে এমসিসিআই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। এর ফলে লজিস্টিকস ব্যয় কমবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের খরচ হ্রাসের মাধ্যমে বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।

এমসিসিআই মনে করে, কর ফাঁকি রোধে স্বচ্ছতা আনা জরুরি হলেও কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করদাতার ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই করদাতার ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে করের পরিধি বৃদ্ধি, সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর প্রশাসন গড়ে তোলা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি-ভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় রাজস্ব আহরণ করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ।

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মেগা বাজেট দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি সাহসী উদ্যোগ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, কর প্রশাসনের হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, রাজস্ব আহরণের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এমসিসিআই সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আইএইচও/এমএএইচ/