অনেকেই মনে করেন, প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় ই-সিগারেট বা ভেপ অনেকটাই নিরাপদ। ধোঁয়া কম, গন্ধ কম তাই ঝুঁকিও কম, এমন ধারণা বেশ প্রচলিত। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা।
Advertisement
ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় এমন কিছু ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে, যা ধীরে ধীরে শরীরে প্রদাহ তৈরি করে এবং কোষের ক্ষতি ঘটায়, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই এখনই সময় এই ‘নিরাপদ’ ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার।
মার্চ মাসে ‘কারসিনোজেনেসিস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন সিডনির ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের ক্যানসার গবেষকেরা। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রোগীর তথ্য, প্রাণীর ওপর গবেষণা এবং ল্যাবভিত্তিক পরীক্ষার ফল একত্রে বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান তাঁরা।
শরীরে দেখা দিচ্ছে বিপদের সংকেতগবেষণার সহলেখক বার্নার্ড স্টুয়ার্ট জানিয়েছেন, ক্যানসার হঠাৎ করেই তৈরি হয় না। এর আগে শরীরে কিছু সতর্ক সংকেত দেখা যায়, যেমন- প্রদাহ বৃদ্ধি এবং ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
Advertisement
এই গবেষণায় ই-সিগারেট ব্যবহারের সঙ্গে এমন পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তার ভাষায়, ভেপের ধোঁয়া মুখ, মুখগহ্বর এবং ফুসফুসের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের দিকে ইঙ্গিত দেয়।
আধুনিক প্রযুক্তি, অজানা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিই-সিগারেট তুলনামূলকভাবে নতুন একটি উদ্ভাবন, যার ব্যবহার শুরু হয় একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়নি।
তবে গবেষকেরা বলছেন, ইতিমধ্যে যে ধরনের শারীরিক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। এমনকি কিছু দন্তচিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যারা কখনো প্রচলিত সিগারেট খাননি, শুধুমাত্র ই-সিগারেট ব্যবহার করেছেন তাদের মধ্যেও মুখের ক্যানসারের লক্ষণ দেখা গেছে।
আরও পড়ুন: মাসিকের এই হিসাবেই লুকিয়ে গর্ভধারণের রহস্য গর্ভাবস্থায় ঠান্ডা পানি পান, ভুল করছেন না তো? এই গরমে শিশুর জন্য যা না জানলেই নয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা: সিগারেটের উদাহরণগবেষণাটির প্রধান, রোগতত্ত্ববিদ ফ্রেডি সিটাস উল্লেখ করেন, সিগারেট যে ফুসফুস ক্যানসারের অন্যতম কারণ, এটি নিশ্চিত হতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লেগেছে।
Advertisement
নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওটাগোর জনস্বাস্থ্য বিভাগের রিসার্চ ফেলো ক্যালভিন ককরান জানান, এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রায় আট হাজার গবেষণা বিশ্লেষণ করতে হয়েছিল। যদিও এর আগেই ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন, ই-সিগারেটের ক্ষেত্রেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে সময় লাগতে পারে, আর সেই সময়ের মধ্যে বহু মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
এখনই সতর্ক হওয়া জরুরিবিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেট ঠিক কোন ধরনের ক্যানসারের জন্য দায়ী তা নির্দিষ্টভাবে জানতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু এর মধ্যেই যে স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত মিলছে, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের এই অভ্যাস থেকে দূরে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকেরা।
ই-সিগারেটকে ‘নিরাপদ বিকল্প’ মনে করা ভুল হতে পারে। বর্তমান গবেষণা বলছে, এটি শরীরে এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সুস্থ থাকতে চাইলে সব ধরনের ধূমপান (সিগারেট হোক বা ই-সিগারেট) এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। নিজের পাশাপাশি আশপাশের মানুষদের কথাও ভাবুন। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্কদের সুরক্ষায় সচেতন হোন। আজকের ছোট সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি এড়াতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
জেএস/