ইলিয়াস মশহুদ
Advertisement
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম (রহ.) ছিলেন ৭ম হিজরি শতকের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম, মুফতি, লেখক ও খতিব। তিনি ৫৭৭ হিজরিতে দামেশকে জন্মগ্রহণ করেন এবং মিসরে ৬৬০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তার পুরো নাম আবদুল আজিজ ইবনে আবদুস সালাম ইবনে আবুল কাসিম ইবনে হাসান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুহাজ্জাব আস সুলামি, উপনাম আবু মুহাম্মাদ।
ইসলামের ইতিহাসে তাকওয়া, সাহস ও সত্যের ওপর অবিচলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম (রহ.)। তার উপাধি ছিল ‘সুলতানুল উলামা’, অর্থাৎ, আলেমদের সুলতান। তবে তিনি ‘ইমাম আল ইজ্জ’ নামে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। (ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম, জুহাইলি: ৩৯)
তিনি শাফেঈ মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তার ইলম, চরিত্র ও নৈতিক দৃঢ়তা এমন পর্যায়ের ছিল যে, তিনি বাদশাহদের সংশোধন করতেন এবং আল্লাহর বিধানের প্রশ্নে কারও সঙ্গে আপস করতেন না। সাহস, তাকওয়া ও হকপন্থার কারণে সমসাময়িক বাদশাহ, আমির-উমারা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার ব্যক্তিত্বের অনন্য প্রভাব ছিল। (মাকাসিদুস শরিয়াহ ইনদাল ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম: ৪১)
Advertisement
ঐতিহ্যবাহী দামেশক শহরে ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালামের (রহ.) জন্ম, দামেশকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে জ্ঞানার্জনে খুব একটা সময় দিতে না পারলেও ইজ্জুদ্দিন ছিলেন ব্যতিক্রম। বুঝতে শেখার পর থেকেই তিনি দ্বীনি ইলম অর্জনে প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গভীর মনোযোগের সাথে বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন এবং মূলপাঠ মুখস্থ করতে শুরু করেন।
জ্ঞানপিপাসা মেটাতে তিনি তৎকালীন সময়ের বরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তার সহজাত অসামান্য মেধা জটিল ও কঠিন বিষয়গুলো সহজে আয়ত্ত করতে তাকে সাহায্য করে। দামেশকের মতো ইলমি মারকাজ হিসেবে প্রসিদ্ধ অভিজাত শহরে বড় হওয়ার সুবাদে তিনি শ্রেষ্ঠ আলেমদের সাহচর্য পাওয়ার অনন্য সুযোগ লাভ করেন। তাদের জ্ঞান, উন্নত চরিত্র ও আদর্শ জীবনদর্শন নিজের জীবনে ধারণ করে তিনি একসময় যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও আবেদে পরিণত হন।
শিক্ষদান ও ফতোয়াশিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম প্রথমে আজিজিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। এখানে তিনি তার শিক্ষক ইমাম আমেদির সঙ্গে পাঠদান করেছেন। একইভাবে তিনি মাদরাসায়ে শিবলিয়াতেও পড়িয়েছেন। তারপর তিনি জামে উমাইয়ার পশ্চিম পাশে অবস্থিত জাবিয়ায়ে গাজালিতে শিক্ষাদানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখানে ইমাম গাজালি (রহ.) ইতেকাফ করতেন, তার নাম যুক্ত হয়েই এই মসজিদ ও মাদরাসা জাবিয়ায়ে গাজালি হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছে। এ ছাড়াও দামেশকের বিভিন্ন মাদরাসা ও মসজিদে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। (তাবাকাতুস সুবকি: ৮/২৪২, ফাতওয়ায়ে ইজ্জুদ্দিন: ১৩১)
৬৩৫ হিজরির পর দামেশক ছেড়ে মিসরে চলে গেলে মিসরের সুলতান তাকে কায়রোর সালেহিয়া মাদরাসার দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। সেখানে চার মাজহাবের ফিকহের পাঠদান করা হতো। তাকে শাফেঈ ফিকহ শিক্ষাদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৬৬০ হিজরিতে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। (তাবাকাতুশ শাফেঈয়্যা: ২/১৯৭)
Advertisement
আইয়ুবি শাসকবর্গ ইমাম ইজ্জুদ্দিনকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দিতেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে তার পরামর্শ নিতেন। ইমাম ইজ্জুদ্দিন সত্য ও ন্যায় পরামর্শ দিতেন। তিনি শাসকদের কোপদৃষ্টির ভয় করতেন না, মোসাহেবি করতেন না।
সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসিকতা শায়খ ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ ছিল। যা সত্য, তিনি সেটাই গ্রহণ করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কারও তিরস্কারের পরোয়া করতেন না।
আইয়ুবি সুলতান সালেহ ইসমাইল যখন মিসরের শাসক নাজমুদ্দিন আইয়ুবের বিরুদ্ধে সাহায্য লাভের জন্য ক্রুসেডারদের সঙ্গে সন্ধি করে সাফাদ, শাকিফ, সাইদা দুর্গসহ বেশ কিছু মুসলিম ভূখণ্ড তাদের দিতে রাজি হন, তখন ইমাম ইজ্জুদ্দিন এর কঠোর প্রতিবাদ করেন।
তিনি ফতোয়ার বিশাল সংকলন রেখে গেছেন। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ তার কাছে ফতোয়া জানতে আসত। শেষ জীবনে তিনি শাফেঈ মাজহাবের বাইরে অন্যান্য মাজহাবের মতামত অনুসরণ করেও ফতোয়া দিতেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭/৪৪২)
ইন্তেকাল৬৬০ হিজরিতে মিশরের কায়রো শহরে প্রায় ৮৩ বছর বয়সে ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম ইন্তেকাল করেন।
ওএফএফ