অর্থনীতি

বিদ্যুৎ উৎপাদনের তেলেও টান, লোডশেডিংয়ে নাজেহাল

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও সংকটের মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে রেশনিং করে ফার্নেস অয়েল সরবরাহ দিচ্ছে। এতে উৎপাদন কমায় সারাদেশে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট।সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব জাফর আলম বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেন ‘আজ চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ কোমায় চলে গেছে, লাইফ সাপোর্ট দিয়ে স্যালাইনের ওপরে চলছে জীবন।’

Advertisement

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কথা হলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ে আজ খুবই খারাপ অবস্থা। ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের নাভিশ্বাস উঠছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি হচ্ছে বেশি। একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে জেনারেটর চালানোর তেলও মিলছে না। তেল পাওয়া গেলেও জেনারেটর লাগাতার চালানো যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারেরও কিছু করার আছে বলে মনে হচ্ছে না। তেল না পেলে তারা (সরকার) কী করবে?’

শুধু জাফর আলম নন, কয়েকদিন ধরে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ পুরো চট্টগ্রাম। চলতি বছরে এই সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে। লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল নগর জীবন। বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম।

Advertisement

ফার্নেস অয়েলের একটি সংকট রয়েছে। বিপিসি চাহিদা অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল দিচ্ছে না। তারা (বিপিসি) লিমিটেড তেল দিচ্ছে। এতে আইপিপিগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে।-পিডিবির উপ-সচিব (উৎপাদন) মো. হেলালুর রহমান

তবে তথ্য বলছে- শুধু চট্টগ্রাম নয়, ঢাকাসহ সারাদেশেই লোডশেডিংয়ে নাজেহাল মানুষ। সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর মিলছে। কোথাও আবার ঘোষণা দিয়েও আট-দশ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে নাজেহাল মানুষ।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে চাহিদামাফিক তেল পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদন কম হওয়ায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’

অন্যদিকে বিপিসি থেকে সরাসরি কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বুধবার সকাল পর্যন্ত বিপিসিতে ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে। এতে বর্তমান নিয়মে ৩৪ দিন যাবে।’

Advertisement

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকটে জাবিতে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্তঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ বরিশালবাসীগ্যাস নেই, তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বাড়ছে লোডশেডিংমৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ১৬ ঘণ্টা লোডশেডিং

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির আরেক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বাধ্যতামূলক রেশনিং করতে হচ্ছে। পিডিবির চাহিদা অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল সরবরাহ দেওয়া হলে হঠাৎ করে সংকট তৈরি হতে পারে। এতে সবাই বিপদে পড়বে। তাছাড়া বেসরকারি আইপিপিগুলোর (ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) কাছে ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমতি থাকলেও তারা আমদানি করছে না। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাবে, তখন তারা আমদানি করতে চাইবে। এটাও বিপিসির জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বিপত্তি তৈরি করছে।’

এদিকে ক্রুড অয়েল সংকটে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো দেশকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাভাবিক সময়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে দৈনিক ১১শ থেকে ১২শ টন ফার্নেস অয়েল পাওয়া যেত। বর্তমানে রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফার্নেস অয়েলে শতভাগ আমদানিনির্ভর হতে হচ্ছে বিপিসিকে। এতে জ্বালানি সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

পিডিবি, বিপিসি কিংবা পেট্রোবাংলা একই সংকটের মধ্যে আছে। হরমুজ সংকট। নিয়মিত তেল (ফার্নেস অয়েল) সরবরাহ না পেলে আমরা গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। আমাদের তেলভিত্তিক যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আছে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।-পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য আগে থেকেই বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। এজন্য নেওয়া হয় ছয় মাসের একটি আমদানি পরিকল্পনা। পিডিবি থেকেও আগেভাগে তরল জ্বালানির চাহিদা দেওয়া হয়। গত বছর চাহিদা দিয়েও নির্ধারিত সময়ে ফার্নেস অয়েল সরবরাহ নেয়নি পিডিবি। এতে আলেজ সংকটে পড়তে হয়েছিল বিপিসিকে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জন্য ১২ লাখ ৩৯ হাজার ২৩১ টন ফার্নেসের চাহিদা দিয়ে প্রথম চার মাসে চাহিদামাফিক তেল সরবরাহ নেয়নি পিডিবি। যে কারণে গত বছরের ২২ এপ্রিল এক চিঠিতে এপ্রিল ও মে দুই মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল গ্রহণে পিডিবিকে নির্দেশ দিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে অনুরোধ জানায় বিপিসি।

বিপিসির তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবিকে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৫ টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহ দিয়েছিল বিপিসি।

চাহিদামাফিক ফার্নেস অয়েল না পেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিডিবি। পিডিবির তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১৫ এপ্রিল সারাদেশে ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে তরল জ্বালানির অভাবে অন্তত ৩০টি আইপিপিতে সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। পিক আওয়ারেও কয়েকটি বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে এর আগের বছরের একইদিন মাত্র পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে তরল জ্বালানির সংকট ছিল বলে পিডিবির দেওয়া তথ্যে জানা যায়।

কোন বিভাগে কত লোডশেডিং

পিডিবির তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল রাত ৯টায় পিক আওয়ারে সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৮ মেগাওয়াট। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৮৪৯ মেগাওয়াট। এদিন সারাদেশে ঘণ্টাপ্রতি ৩১২ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এসেছে ৪৬ দশমিক ২১ মিলিয়ন কিলোওয়াট।

২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৪৯০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয়েছিল মাত্র ১৪৫ মেগাওয়াট।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ এপ্রিল রাত ৯টায় পিক আওয়ারে ১৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৫ হাজার ৬৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৬০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪৮৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২০ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ১ হাজার ৪৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১ হাজার ১৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৪৭৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫ মেগাওয়াট, খুলনায় ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩১৯ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৩৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৯৫ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১ হাজার ৬৬১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৯৫ মেগাওয়াট এবং রংপুরে ৮৬৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়।

পিডিবির উপ-সচিব (উৎপাদন) মো. হেলালুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলের একটি সংকট রয়েছে। বিপিসি চাহিদা অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল দিচ্ছে না। তারা (বিপিসি) লিমিটেড তেল দিচ্ছে। এতে আইপিপিগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে।’

চলমান সংকট নিয়ে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘পিডিবি, বিপিসি কিংবা পেট্রোবাংলা একই সংকটের মধ্যে আছে। হরমুজ সংকট। নিয়মিত তেল (ফার্নেস অয়েল) সরবরাহ না পেলে আমরা গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। আমাদের তেলভিত্তিক যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আছে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।’

অনুমতি থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (আইপিপি) ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে না- বিপিসির এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আইপিপিগুলো একটি বড় অংকের টাকা পিডিবি থেকে দাবি করে আসছে। তাদের আগের যে পাওনা প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা থেকে কোনো অর্থই দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্বালানি উপদেষ্টা আইপিপিগুলোর বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীসময়ে তা কার্যকর হয়নি। যে কারণে আইপিপিগুলোও সংক্ষুব্ধ।’

এমডিআইএইচ/এএসএ