৫০ ওভারে ২৪৮ রান। খুব বড় ও কঠিন টার্গেট নয়। তাও আবার নিজ মাটিতে। এমন এক মাঠে, যেখানে বছরের প্রায় ৮০ ভাগ সময় কাটে টিম বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। সেই মাঠে আড়াইশোর নিচে টার্গেট ছুঁতে না পারা রীতিমত ব্যর্থতা।
Advertisement
আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেরে বাংলায় সেই ব্যর্থতার পরিচয় দিল মেহেদী হাসান মিরাজের দল। তাও পুরোদস্তুর বা পূর্ণ শক্তির নিউজিল্যান্ড হলে মানা যেতো। একটা অজুহাত তোলা যেত। কিন্তু টম ল্যাথামের নেতৃত্বে আজ ১৭ এপ্রিল নিউজিল্যান্ডের যে দলটি খেলতে নেমেছে, সেই দলের বাংলাদেশের মাটিতে খেলার অভিজ্ঞতা খুব কম।
অধিনায়ক টম ল্যাথাম, উইল ইয়ং আর হেনরি নিকলস এবং শুক্রবার সিরিজের প্রথম ম্যাচের ম্যান অব দ্য ম্যাচ ফক্সক্রফটই কেবল বাংলাদেশের মাটিতে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। তাও খুব বেশি ম্যাচ নয়। টম ল্যাথাম, উইল ইয়ং আর হেনরি নিকলস বাংলাদেশে এর আগে হাতে গোনা কটি ম্যাচ খেলেছেন। আর ফক্সক্রফট আজকের ম্যাচের আগে বাংলাদেশের মাটিতে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন শুধু।
বাকিদের মধ্যে কেউ হয়তো ‘এ’ দল বা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে বাংলাদেশে খেলে যেতে পারেন। কিন্তু যে চারজনের নাম বলা হলো, তাদের বাইরের কারোরই আগে বাংলাদেশের মাটিতে টাইগারদের বিপক্ষে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ তারাই নতুন পরিবেশে আগে ব্যাট করে ২৪৭ রানের মোটামুটি লড়াইয়ের পুঁজি গড়ে ২৬ রানের জয় তুলে মাঠ ছাড়লো বিজয়ীর বেশে।
Advertisement
ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাছাই না খেলে র্যাংকিং ও রেটিংয়ে প্রথম ৮ দলের মধ্যে থাকতে এই সিরিজগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা ও প্রত্যাশা ছিল, ঘরের মাঠে জয় দিয়ে শুরু করে সিরিজ জয়ের পথে প্রথম দিনই এগিয়ে যাবে টাইগাররা। কিন্তু বাস্তবে সে লক্ষ্য পূরণ হলো না। হওয়াই শুধু তা নয়, এখন পিছিয়ে পড়ে সিরিজ হারের শঙ্কায় মিরাজের দল।
কেন এই হার? তা নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে। অনেক কথাবার্তাও হচ্ছে। ম্যাচ দেখা সবার মত প্রায় এক। উইকেট ঠিক পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের মতো অত স্পোর্টিং ছিল না। গতি ও উচ্চতা দুই-ই গত মার্চে হওয়া সেই সিরিজের তুলনায় কম ছিল। বল একটু থেমে ও মন্থর হয়ে ব্যাটে এসেছে। তেমন কোনো মুভমেন্ট ও টার্নও হয়নি। তবে কিছু ডেলিভারি খানিক স্লথ হয়ে এসেছে। স্বাভাবিকের চেয়ে নিচেও থেকেছে। কিন্তু সেটা ম্যাচ হারার অজুহাত হতে পারে না।
এমন উইকেটেও স্বল্প অভিজ্ঞতায় খেলতে নেমে কিউইরা আগে ব্যাট করে প্রায় আড়াইশো রান তুলেছে। দুইজন পঞ্চাশের ঘরে পা রেখেছেন। তাদের ব্যাটারদের গড়পড়তা স্ট্রাইকরেটও বেশি ছিল।
কিউইদের যে দুইজন ফিফটি হাঁকিয়েছেন, সেই ওপেনার হেনরি নিকলস (৮১.৯২ স্ট্রাইক রেটে ৮৩ বলে ৬৮) আর মিডল অর্ডার ডিন ফক্সক্রফট ১০১.৭২ স্ট্রাইক রেটে ৫৮ বলে করেছেন ৫৯ রান।
Advertisement
কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটাররা চেনা, জানা কন্ডিশনেও তা পারেননি। ওপেনার সাইফ হাসান ৫৭ রান করেছেন ৭৬ বলে। লিটন দাস (৬৮ বলে ৪৬) আর আফিফ হোসেন ধ্রুব (৪৯ বলে ২৭) আরও স্লথ খেলে হিসাব কঠিন করে ফেলেন।
খালি চোখেই দেখা গেছে প্রয়োজনীয় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারার কারণেই এ পরাজয়। শেষদিকে তাওহিদ হৃদয় তুলনামূলক চালিয়ে খেলেও ৬০ বলে ৫৫ রান করেছেন ৯১.৬৬ স্ট্রাইক রেটে। ততক্ষণে ম্যাচ শেষ।
প্রথম ব্যর্থতা হলো ওপেনার তানজিদ তামিম (৬ বলে ২) আর নাজমুল হোসেন শান্তর (১ বলে ০) পরপর ২ বলে ফিরে যাওয়া। এটা একটা বড় ধাক্কা। প্রথম ৩ ব্যাটারের দুইজনের ইনিংসের বয়স মাত্র ৩.২ ওভার। খুব স্বাভাবিকভাবে ২৪৮ রান করতে গিয়ে পরের ব্যাটাররা অনেক বেশি সতর্ক ও সাবধানী হয়ে যান। তাতে ওভার পিছু রান তোলার গতি যায় কমে।
এরপর হৃদয় আর আফিফ পঞ্চম উইকেটে ৫২ রান তুললেও অনেক বেশি স্লো ব্যাটিং করে ওভারপিছু লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ফেলেন। এক পর্যায়ে ৬৮ বলে কোনো বাউন্ডারিই আসেনি। সেটাই আসলে টাইগারদের ম্যাচ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
এর বাইরে আর একটা কারণ আছে। ওপরে কিংবা মাঝখানে কিংবা নিচে, কেউই ম্যাচ শেষ করে সাজঘরে ফিরতে পারেননি। ওপেনার তানজিদ তামিম আর ওয়ানডাউন শান্ত শুরুতে ফিরে যাওয়ার পর আরেক ওপেনার সাইফ আর মিডল অর্ডারের হৃদয় পঞ্চাশের ঘরে পা রাখলেও কেউই দলকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেননি।
সাইফ অনেকটা সময় একদিক আগলে পঞ্চাশের ঘরে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। হৃদয় বেশ অনেকটা সময় একা একদিক আগলে রাখলেও রান গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। তাই তার ৬০ বলে ৫৫ রানের ইনিংসটি কাজে আসেনি। যেমন লাভ হয়নি ওপেনার সাইফ হাসানের ব্যাট থেকে আসা ৭৬ বলে ৫৭ রানের ইনিংসটিতেও।
একইভাবে আফিফ ৪৯ বলে ২৭ রানের মন্থর ইনিংসটিও ভুগিয়েছে যথেষ্ট। হৃদয় একদিক আগলে ৪৯ ওভার পর্যন্ত উইকেটে থাকলেও তার সঙ্গী শেষ ৪ জন—অধিনায়ক মেহেদি মিরাজ (১৪ বলে ৬), রিশাদ হোসেন (১০ বলে ৪), তাসকিন আহমেদ (৫ বলে ২), শরিফুল ইসলাম (৩ বলে ০) সময়ের দাবি মেটাতে না পারলে পরাজয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই চারজনের অন্তত একজন ৮-১০ বলে ১২৫ থেকে ১৩০/১৪০ স্ট্রাইক রেটে ২০ থেকে ২৫ রানের একটি ইনিংস খেলে দিলেও হয়তো লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হতো। কিন্তু কেউ তা না পারায় ৯ বল আগেই ইনিংস শেষ হয় বাংলাদেশের।
এআরবি/এমএমআর