লাইফস্টাইল

অনাহারে শরীর কাকে আগে বাঁচায়, মা নাকি শিশু?

মানুষের শরীর এক আশ্চর্য বুদ্ধিমান ব্যবস্থা। আমরা যখন নিয়মিত খাবার খাই, তখন শরীর স্বাভাবিকভাবে শক্তি উৎপাদন করে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকঠাক কাজ করে। কিন্তু প্রশ্নটা জটিল হয়ে ওঠে তখনই, যখন খাবার নেই বা দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকতে হয়। তখন শরীর কীভাবে টিকে থাকে?

Advertisement

আর একজন গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে শরীর কাকে আগে বাঁচাতে চায়, মা নাকি তার গর্ভের সন্তান? এই প্রশ্ন শুধু কৌতূহলের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীববিজ্ঞান, বিবর্তন আর মানবদেহের গভীর কৌশল।

অনাহারে শরীর কীভাবে টিকে থাকে?

আমরা খাবার না খেলেই যে সঙ্গে সঙ্গে শরীর ভেঙে পড়ে, তা নয়। শরীরের ভেতরে এমন কিছু প্রক্রিয়া আছে, যা আমাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারে। প্রথমে শরীর ব্যবহার করে গ্লুকোজ, যা আমরা খাবার থেকে পাই। কয়েক ঘণ্টা না খেলে এই গ্লুকোজের মজুত ফুরিয়ে যায়। তখন শরীর লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেন ভেঙে শক্তি তৈরি করে। এরপরও যদি খাবার না আসে, শরীর তখন আরও গভীরে যায়। যেমন- চর্বি ভাঙতে শুরু করে, তারপর ধীরে ধীরে পেশীও ভাঙতে থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে বলা যায় শরীরের ‘সারভাইভাল মোড’। অর্থাৎ, যেকোনোভাবে বেঁচে থাকা।

গর্ভাবস্থায় শরীরের অগ্রাধিকার বদলায় কেন?

গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীর একা নিজের জন্য কাজ করে না। তখন তার শরীরের ভেতরে আরেকটি প্রাণ বেড়ে উঠছে। ফলে শরীরের সবকিছু হরমোন, পুষ্টি বণ্টন, শক্তি ব্যবহার সবই বদলে যায়। এ সময় শরীরের মূল লক্ষ্য থাকে শিশুর বৃদ্ধি নিশ্চিত করা। কারণ বিবর্তনের দৃষ্টিতে, নতুন প্রাণের জন্মই প্রজাতির টিকে থাকার প্রধান উপায়।

Advertisement

তাহলে শরীর কাকে আগে বাঁচায়? এই প্রশ্নের উত্তর সরল না, বরং পরিস্থিতিনির্ভর।

গর্ভাবস্থার শুরুতে এবং মাঝামাঝি সময়ে, শরীর সাধারণত শিশুকে অগ্রাধিকার দেয়। মা কম খেলে বা অপুষ্টিতে থাকলেও শরীর চেষ্টা করে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে। এটা সম্ভব হয় কারণ শরীর মায়ের শরীর থেকে পুষ্টি টেনে শিশুর কাছে পৌঁছে দেয়।

ফলাফল কী?

মা দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন, কিন্তু শিশুর বৃদ্ধি কিছুটা হলেও চলতে থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অনাহারে সমীকরণ বদলে যায়। যদি অনাহার দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তখন শরীর এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। শরীর বুঝতে শুরু করে, আমি যদি নিজেই বাঁচতে না পারি, তাহলে শিশুকে বাঁচানোও সম্ভব নয়। তখন শরীর ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।

এর ফলে কী হতে পারে? গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে শিশুর বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে গুরুতর ক্ষেত্রে শিশুকে হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়

অর্থাৎ, চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীর মাকেই বাঁচানোর চেষ্টা করে।

কেন এমন হয়?

এটার পেছনে আছে এক গভীর বৈজ্ঞানিক যুক্তি। যদি মা বেঁচে থাকেন, তিনি ভবিষ্যতে আবার সন্তান ধারণ করতে পারবেন। কিন্তু যদি মা মারা যান তাহলে শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও প্রায় শূন্য হয়ে যায়। এই কারণেই শরীর শেষ পর্যন্ত মায়ের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।

Advertisement

শরীরের ভেতরের এই ‘লড়াই’ কতটা কঠিন?

অনাহারে থাকা একজন গর্ভবতী নারীর শরীরে এক ধরনের নীরব যুদ্ধ চলে। একদিকে শিশুর বৃদ্ধি, কোষ বিভাজন, অঙ্গ তৈরি। অন্যদিকে মায়ের হৃৎস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, মস্তিষ্কের কার্যক্রম। এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে শরীর ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকে।

অনাহারের মায়ের ওপর প্রভাব দুর্বলতা ও ক্লান্তি রক্তস্বল্পতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া অনাহারের শিশুর ওপর প্রভাব কম ওজন নিয়ে জন্ম মস্তিষ্কের বিকাশে সমস্যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাস্তব জীবনে এর প্রভাব

দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ বা অপুষ্টির কারণে অনেক গর্ভবতী নারী এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তখন বিষয়টা শুধু একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটা হয়ে ওঠে সামাজিক ও মানবিক সংকট।

কী করা জরুরি? গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ পরিবার ও সমাজের সহায়তা নিশ্চিত করা

‘অনাহারে শরীর কাকে আগে বাঁচায়, মা নাকি শিশু?’এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। শরীর প্রথমে শিশুকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, কিন্তু পরিস্থিতি যদি চরমে পৌঁছে যায়, তখন সে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় মায়ের দিকেই ফিরে আসে।

আরও পড়ুন:  মাসিকের এই হিসাবেই লুকিয়ে গর্ভধারণের রহস্য গর্ভাবস্থায় ঠান্ডা পানি পান, ভুল করছেন না তো? এই গরমে শিশুর জন্য যা না জানলেই নয়

মানবদেহের এই সিদ্ধান্ত নিষ্ঠুর মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আসলে টিকে থাকার প্রাচীন ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। তাই এই গল্প শুধু শরীরের ভেতরের লড়াইয়ের নয়; এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন গর্ভবতী নারীর যত্ন নেওয়া মানে আসলে দুটি প্রাণকে বাঁচানো।

তথ্যসূত্র: আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন, ইউনিসেফ

জেএস/