রাজস্ব ঘাটতির চাপ মোকাবিলায় সরকার যখন আয় বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছে, ঠিক সে সময়ে বিশাল অঙ্কের শুল্ক-কর বকেয়া নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে সংস্থাটির বকেয়া জমে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। দীর্ঘ ৫২ মাসে এই বিপুল অঙ্কের শুল্ক-কর বকেয়া হয়েছে।
Advertisement
তবে, এনবিআরের কাছে বকেয়া বাড়ার বিষয়ে দ্বৈত করকে দায়ী করছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি জানায়, একই গ্যাসে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে দুবার শুল্ক-কর নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এলএনজি আমদানির সময় তাদের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হয়। আবার গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রির সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ উৎসে কর দিতে হচ্ছে। দ্বৈত করের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ছে এলএনজির দাম, পাশাপাশি বাড়তি শুল্ক-করের চাপে পড়ছে পেট্রোবাংলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টানা ৫২ মাস আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) শুল্ক-কর বকেয়া রেখেছে পেট্রোবাংলা। এ নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে অসংখ্য চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫২ মাসে পেট্রোবাংলার ২২ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা শুল্ক-কর বকেয়া রয়েছে। বকেয়া আদায়ে ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিন।
Advertisement
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫২ মাসে পেট্রোবাংলার ২২ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা শুল্ক-কর বকেয়া রয়েছে। বিপুল পরিমাণ এই বকেয়ার কারণে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বকেয়া আদায়ে ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিন।
আমদানি করা এলএনজি বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হওয়ায় পরিবহনকারী কার্গো জাহাজ থেকে গ্যাস মহেশখালীতে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালে আনলোড করা হয়। এই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
বিষয়টি নিয়ে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কাস্টমস আইন অনুযায়ী ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পাঠানো বিল অব এন্ট্রি ও অন্যান্য দলিল সংশ্লিষ্ট কমিশনারেট জমা দিতে হয়। এতে পণ্য খালাসের আগেই শুল্কায়ন ও শুল্ক-কর পরিশোধে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু পণ্য আমদানি হওয়ার এক মাস পরও বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি, যা কাস্টমস আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আরও পড়ুনএলএনজি নিয়ে আপাতত ‘চিন্তা নেই’, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্বিগুণের বেশি দামে ২ কার্গো এলএনজি কিনলো সরকার সরকারের কোনো উদ্যোগেই কাটছে না জ্বালানি খাতের অস্থিরতা
Advertisement
জাগো নিউজের হাতে আসা নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত শুল্ক-কর বকেয়া পড়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ সময় পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়নি এমন বিল অব এন্ট্রির সংখ্যা ৪৬৪টি। এছাড়া আলোচ্য সময়ের মধ্যে ৬০টি বিল অব এন্ট্রি বাবদ সংস্থাটি পরিশোধ করেছে এক হাজার ৭৯৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার শুল্ক-কর।
অবশিষ্ট ৪০৪টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ থেকে খালাস করা পণ্যে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর বাবদ ২২ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর এই বকেয়া ছিল ২২২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন- পেট্রোবাংলার ভবন/ ফাইল ছবি
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে দেওয়া এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমস আইন ২০২৩ এর ধারা ৮৩ এবং একই আইনের ধারা ৮৪ অনুসারে বিল অব এন্ট্রি এবং আমদানি সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র কাস্টমস কমিশনার বরাবর দাখিল করার বিধান রয়েছে। এছাড়া ওই আইনের ধারা ৯০ অনুযায়ী পণ্য খালাসের আগেই শুল্ক-কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক। সে মোতাবেক এই দপ্তর থেকে অন্য সব পণ্য চালানের ক্ষেত্রে শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে পণ্য খালাস করা হলেও আপনার প্রতিষ্ঠান শুধু বি/ই দাখিল করে পণ্য খালাস নিয়েছে। তবে এ বাবদ কোনো শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়নি, যা কাস্টমস আইন ২০২৩ এর পরিপন্থি।
চিঠিতে আরও বলা হয়, কাস্টমস আইন ২০২৩ এর ধারা ৩২ এর উপধারা-৪ অনুযায়ী কোনো পণ্য ছাড়ের পর শুল্ক, কর বা অন্যান্য চার্জ বকেয়া থাকলে ওই বকেয়ার অতিরিক্ত হিসেবে মাসিক এক শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। পণ্য ছাড়ের তারিখ থেকে বকেয়া পরিশোধের তারিখ পর্যন্ত এক শতাংশ হারে সুদ প্রযোজ্য হবে।
এখানে দ্বৈত করের কিছু বিষয় আছে। আমরা বন্দরে কর দিচ্ছি। আবার গ্রাহকের কাছে বিক্রির সময় তারা কর দিচ্ছে। ফলে একই জিনিসে দুইবার কর নেওয়া হচ্ছে।- পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, আলোচ্য পণ্য চালানসমূহের বিপরীতে দাখিলকৃত বিল অব এন্ট্রি ও আইজিএমের বিপরীতে ২২ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ও এর ওপর মাসিক এক শতাংশ সুদসহ পরিশোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হলো।
জানা গেছে, প্রতি মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে একাধিক চিঠি ও টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও ২০২৫ সালের আগস্টের পর কোনো বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি। বকেয়া পরিশোধ না করার জেরে ২০২২ সালে পেট্রোবাংলাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এর কোনো উত্তর দেয়নি পেট্রোবাংলা। এরপর বকেয়া পরিশোধ করা না হলে কাস্টমস আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের বিন লক, পণ্য খালাস বন্ধ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হবে বলে জানানো হয়।
আরও পড়ুনপাওনা সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা, ‘ধীরে’ আদায়ের চেষ্টা পেট্রোবাংলার ঋণগ্রস্ত পেট্রোবাংলাকে দুই হাজার কোটি টাকা ‘নিরাপদ ঋণ’ বিপিসির এলএনজিতে এপ্রিলে ভর্তুকি লাগবে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা
এ সংক্রান্ত এক চিঠির উত্তরে পেট্রোবাংলা জানায়, অর্থ বিভাগ থেকে ভর্তুকি পেয়ে এলএনজি আমদানি পর্যায়ে বকেয়া শুল্ক-কর পরিশোধ করা হবে। পরে একাধিক চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেয়নি পেট্রোবাংলা। এরপর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সরবরাহ কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে এলএনজি আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি চেয়ে এনবিআরের কাছে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আইজিএমের বিপরীতে বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করেই পণ্য খালাস কাস্টমস আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে নির্ধারিত সময়ে বিল অব এন্ট্রি দাখিল ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতার জন্য পেট্রোবাংলাকে বাধ্য করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন বকেয়া পড়ে থাকায় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে এলএনজির সমন্বয়সাধন ব্যাহত হচ্ছে।
কথা হয় পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হকের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, এখানে দ্বৈত করের কিছু বিষয় আছে। আমরা বন্দরে কর দিচ্ছি। আবার গ্রাহকের কাছে বিক্রির সময় তারা কর দিচ্ছে। ফলে একই জিনিসে দুইবার কর নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর ভবন/ ফাইল ছবি
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমরা চিঠির জবাব দিয়েছি। ২২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৮ হাজার ১০৩ কোটি টাকা পেট্রোবাংলা কখনো গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করেনি। এজন্য পেট্রোবাংলা জ্বালানি বিভাগকে বলেছে, জ্বালানি বিভাগ এনবিআরের কাছে জবাব চেয়েছে। বাকি ১৪ হাজার কোটি টাকা সাবসিডির টাকা, গ্যাস বিলের বকেয়া, বিদ্যুৎ এবং সার কারখানার কাছে পাওনা বকেয়া পেলে দিয়ে দিতে পারবো। আমরা বিষয়গুলো জানিয়ে দিয়েছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার আরেক কর্মকর্তা বলেন, এখানে দ্বৈত করের বিষয়টি স্পষ্ট। এলএনজি আমদানির সময় একবার মূসক (ভ্যাট) দিতে হয়। আবার এই এলএনজি গ্যাস আকারে এলে আবার মূসক দিতে হয়। একই জিনিসে দুইবার মূসক। এছাড়া আমদানির সময় অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। বছর শেষে যে অর্থ এআইটি (অগ্রিম আয়কর) দেওয়া হয়েছে, সেই টাকা থেকে কিছু অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু এনবিআর সেই অর্থ ফেরত দেয় না।
এসএম/এনএস/কেএসআর