গাজীপুরের শ্রীপুরে বাবার গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে মাদরাসা শিক্ষার্থীকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযুক্ত যুবকের পরিবার বলছে অপহরণ নয়, মাদরাসা শিক্ষার্থী স্বেচ্ছায় ছেলের সঙ্গে পালিয়ে (কোর্ট ম্যারেজ) বিয়ে করেছে।
Advertisement
ঘটনার চার দিন পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নয়নপুর এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান আসামি আবিদ এখনো রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
এ ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজ ফেসবুকে আইডি থেকে স্ট্যাটাস দিলে বিষয়টি টক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত হয়।
এর আগে বুধবার (১৫ এপ্রিল) ভিকটিমের বাবা হাদিউল ইসলাম ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩০ জনকে আসামি করে শ্রীপুর থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করে। আসামিরা হলেন- শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড এলাকার সুরুজ মিয়ার ছেলে আবিদ (২১), সবদের আলীর ছেলে সুরুজ মিয়া (৫০), বাচ্চু মিয়া (৫৫), সুরুজ মিয়ার স্ত্রী আবেদা (৪৫), উজ্জল (৩০), সৌমিত (২৩), সাইফুল (৩৫), আবুল হাশেম (৩৭), খলিলের স্ত্রী আবিদা (৩৫) এবং মৃত আশরাব আলীর ছেলে খলিল (৫০)। পরে পুলিশ ৭ জন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
Advertisement
গ্রেফতার আসামিরা হলেন, সবদের আলীর ছেলে সজল আহমেদ (২৬), সুরুজ মিয়ার স্ত্রী আবেদা (৪৫), সবদের আলীর মেয়ে রাজিয়া (৪৫), আশরাব আলীর ছেলে খলিল (৫০), বরমীর কায়েতপাড়া গ্রামের জাফর আলীর ছেলে মফিজুর রহমান (৫৩), মফিজুর রহমানের স্ত্রী মনোয়ারা, শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া এলাকার শামীম (৩৫)।
মাদরাসা ছাত্রী ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বীর খারুয়া গ্রামের হাদিউল ইসলামের মেয়ে। সে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড (প্রশিকা মোড়) এলাকার মমিনুল ইসলামের বাড়িতে ভাড়া থেকে মাওনা তাহফিজুল কোরআন মহিলা মাদরাসার নবম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৮টার দিকে ফারিহা মাদরাসায় যাওয়ার পথে মাওনা ফায়ার সার্ভিসের সামনে থেকে আসামিরা তাকে জোর পূর্বক অপহরণ করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড (প্রশিকা মোড়) এলাকার সুরুজ্জামানের ছেলে আবিদ দীর্ঘদিন ধরে ওই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল এবং বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব ও অপহরণের হুমকি দিত। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখের দিন সকাল ৮টার দিকে মাদরাসায় যাওয়ার পথে মাওনা ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন এলাকা থেকে আবিদ ও তার সহযোগীরা প্রথমে ছাত্রীকে অপহরণ করে। আবিদের অভিভাবককে চাপ দিলে পরদিন বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে আবিদ মাদরাসা ছাত্রী ফারিহাকে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে আসে। এদিন বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ছেলের (আবিদ) বাসায় উভয়পক্ষ সালিশে বসে। বিষয়টি নিয়ে সালিশে ফয়সালা না হওয়ায় আবিদ ও তার সহযোগীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে অতর্কিতভাবে ভিকটিমের বাড়িতে হামলা চালায়, দরজা ভেঙে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ভিকটিম শিক্ষার্থীকে পুনরায় জোরপূর্বক সবার সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এসময় মারধর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
ভিকটিমের বাবা হাদিউল ইসলাম বলেন, ‘আমার মেয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরেছে। সেখান থেকে আমার গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে আমার মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমার মেয়ে অত্যন্ত আতঙ্কিত। (কোর্ট ম্যারেজ) বিয়ে এবং প্রেমের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা। আসামিদের দোষ-ত্রুটি ঢাকতেই সমস্ত অপবাদ আমার মেয়ের ওপর দেওয়া হচ্ছে। এ মুহূর্তে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
Advertisement
প্রধান আসামি আবিদের ফুফাতো বোন স্বর্ণা আক্তার বলেন, ‘আবিদের বাড়ির পাশেই ওই শিক্ষার্থী তার বাবা-মার সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ার সুবাদে দীর্ঘদিন যাবৎ আবিদের সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষার্থীর প্রেম চলছিল। বিষয়টি দুটি পরিবারসহ এলাকার সবাই জানতো। এক পর্যায়ে ছেলের পরিবার বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখের দিন তারা (আবিদ-ফারিহা) পালিয়ে যায়। পরদিন বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে আবিদ মাদরাসা ছাত্রী ফারিহাকে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে আসে। স্থানীয়দের সমন্বয়ে ছেলের (আবিদ) বাসায় উভয়পক্ষ সালিশে বসে। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত হলে মেয়েকে তার বাবা-মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে মেয়েকে ঘরে নিয়ে তার বাবা বাড়ির গেটে ও ঘরের দরজায় তিনটি তালা লাগিয়ে মেয়েকে মারধর করেন। মেয়েটি চিৎকার দিয়ে ছেলের সহযোগিতা চায়। পরে ছেলে মেয়ের বাবার কাছে মেয়েকে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়ের বাবা আবিদকে হুমকি দেন। এতে আবিদের স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে যাবে বলে তার বাবার কাছে ঘরের চাবি চাইলে আবিদের মা ও খালাকে মারধর করে। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে গেলে মেয়ের বাড়ির তালা ভেঙে আবিদ ও তার সহযোগীরা মেয়েকে নিয়ে যায়। এখানে অপহরণের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। মেয়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে চলে এসেছে।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) লাল চান বলেন, ভিকটিমকে আদালতে ওঠালে গাজীপুর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতের বিচারক আসমা জাহান ভিকটিমকে তার বাবার জিম্মায় দেন।
শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সঞ্জয় সাহা বলেন, পুলিশ অভিযান চালিয়ে শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নয়নপুর (এমসি বাজার) এলাকা হতে অপহৃত ফারিহাকে উদ্ধার করে। এসময় প্রধান আসামি আবিদসহ অন্য আসামিরা পালিয়ে যায়। ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা, বয়স নির্ধারণ এবং নারী-শিশু আইনের ২২ ধারা মোতাবেক জবানবন্দি গ্রহণের জন্য বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারের পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে।
আমিনুল ইসলাম/এফএ/এমএস