ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক ওয়াসিম। গতকাল ১৮ এপ্রিল ছিলো এই অভিনেতার মৃত্যুবার্ষিকী। তেমন কোনো আয়োজন কোথাও ছিলো না। গণমাধ্যম ছাড়া আর কোথাও চোখে পড়েনি এই তারকাকে নিয়ে কোনো স্মৃতিচারণও।
Advertisement
অথচ ওয়াসিমের জীবন ছিলো প্রেরণার, সাহস ও শক্তির। সেই জীবন যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। কখনো অভিনয় করবেন স্বপ্নও দেখেননি। মনযোগ ছিলো শরীর গঠনে। হয়েছিলেন মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান। সেই তিনি শখের বশে শুটিং দেখতে গিয়ে নায়ক হয়ে ওঠেছিলেন।
পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। শুধু তাই নয়, তার সিনেমার সাফল্যের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে চমকে যেতে হয়! এত সৌভাগ্যবান নায়কও হয়! বিশ্বজুড়ে এমন সুপারস্টারের সংখ্যা খুব কম যার প্রথম কাজটি দর্শকনন্দিত হয়েছে। কিন্তু ওয়াসিম সেখানে আরও বেশি রঙিন এক নাম, যার পরপর প্রথম ৫টি সিনেমাই সুপারহিট।
‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। সেটি সুপারহিট। ‘রাতের পর দিন’ তার শুটিং করা প্রথম ছবি হলেও মুক্তির দিক থেকে দ্বিতীয়। সেটিও সুপারহিট। আর ক্যারিয়ারের তৃতীয় ছবি ‘ডাকু মনসুর’ হয়েছিলো ব্লকবাস্টার। চতুর্থ ছবি ‘কে আসল কে নকল’ সুপারহিট। পঞ্চম ছবি ‘জিঘাংসা’ মুক্তি পেয়ে সেটিও সুপারহিট হয়।
Advertisement
আরও মজার বিষয় হলো চতুর্থ ও পঞ্চম ছবি দুটি একই দিনে মুক্তি পেয়েছিলো। নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নতুন নায়ক হিসেবে বাজিমাত করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সিনেমায় কাজ করেছেন। অনেকের মতে, বাংলাদেশের সর্বাধিক হিট ছবির নায়ক ওয়াসীম।
প্রকৃত নাম মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ। ছাত্রজীবনে সিনেমার প্রতি আগ্রহ থাকলেও তিনি কখনো ভাবেননি অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেবেন। সেনাবাহিনী বা প্রশাসনে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছাও ছিল তার। কিন্তু ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় একদিন ওরা ১১ জন সিনেমার শুটিং দেখতে গিয়ে।
সেই শুটিং সেটে পরিচিত ছিলেন অভিনেতা খসরু ও পরিচালক সোহেল রানা। উপস্থিত পরিচালকেরা তার লুক ও উপস্থিতি দেখে মুগ্ধ হন। এরপর ১৯৭২ সালে একটি দৃশ্যে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সেখানে এক টেকেই পারফরম্যান্স দিয়ে সবাইকে অবাক করেন।
এরপর পরিচালক এস এম শফি ও মহসিনের নজরে আসেন তিনি এবং ১৯৭৩ সালে ‘রাতের পর দিন’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিষেক ঘটে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সুপারস্টার যাত্রা। পরিচালকই তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ওয়াসিম।
Advertisement
১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ঢালিউডের অন্যতম শীর্ষ নায়ক। ফোক, অ্যাকশন ও ফ্যান্টাসি ধাঁচের সিনেমায় তার ছিল একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা। অভিনয় জীবনে তিনি প্রায় ১৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে কাজ করেন। সেগুলোর অধিকাংশই ব্যবসাসফল হয়।
১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া এস এম শফী পরিচালিত ‘দি রেইন’ সিনেমা তার ক্যারিয়ারের মাইলফলক। কারণ, এই ছবির কারণেই সব শ্রেণির দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। পৃথিবীর ৪৬টি দেশে মুক্তি পেয়েছিল সিনেমাটি।
‘দ্য রেইন’ ছাড়াও ওয়াসিম অভিনীত বাহাদুর, দোস্ত দুশমন, সওদাগর, নরম গরম, ইমান, মিস লোলিতা, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, বেদ্বীন, জীবন সাথী, রাজনন্দিনী, রাজমহল, বিনি সুতার মালা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও ব্যবসাসফল।
নায়িকা অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ ও শাবানার সঙ্গে তার জুটি দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ফোক ও অ্যাকশন ঘরানার সিনেমায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
২০০৯ সালের পর সিনেমা থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজনাও করেছেন। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ডব্লিউ আর প্রোডাকশন।
২০২১ সালের এই দিনে এই কিংবদন্তি নায়ক পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তবে সিনেমা ও জনপ্রিয়তা দিয়ে আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছেন বাংলা সিনেমার এই ‘সওদাগর’।
এলআইএ