মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। দেশে দেশে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পাম্পগুলোর সামনে ক্রেতাদের যে হাহাকার সে চিত্রই তার বড় প্রমাণ।
Advertisement
সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল, জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। আমদানিতে ভর্তুকি দিলেও জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না। তবে শনিবার (১৮ এপ্রিল) সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা চলে আসে। প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা এবং পেট্রোলে ১৯ টাকা বাড়ায় সরকার৷
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বিভিন্ন পণ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র হতে পারে অসন্তোষ। এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা ও এর সুফল কী হতে পারে—তা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইটারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এম শামসুল আলম। রোববার তার সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক নাহিদ হাসান।
জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার হয়তো জ্বালানি সমস্যার সমাধানের একটা সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেবে। সংকট মোকাবিলা করে এ খাতের লুণ্ঠনের লাগাম টেনে ধরবে। জনগণকে স্বস্তি দেবে
Advertisement
জাগো নিউজ : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক হলো?
ড. এম শামসুল আলম : আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল, তখন বিভিন্ন দেশে দাম সমন্বয় করলেও সরকার দাম বৃদ্ধি না করার অবস্থানে ছিল। এতে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার হয়তো জ্বালানি সমস্যার সমাধানের একটা সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেবে। সংকট মোকাবিলা করে এ খাতের লুণ্ঠনের লাগাম টেনে ধরবে। জনগণকে স্বস্তি দেবে।
আরও পড়ুনহরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দরপতনসব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারে ১৮ দিনে বাড়লো ৬০০ টাকা
সেই প্রত্যাশায় জনগণ চলমান জ্বালানি সংকটেও আশায় বুক বেঁধেছিল। ধৈর্য্য ধরেছিল। তীব্র গরম সহ্য করেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়িতে তেল নেওয়ার অপেক্ষা মেনে নিয়েছিল। সরকারের প্রতি বিশ্বাসটুকু অটুট রেখেছিল। কিন্তু (হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’ করার ঘোষণার পরপরই) জ্বালানির দাম যখন নেমে আসার ইঙ্গিত মিলছে, বিশ্ববাজারে যখন দরপতনের হাতছানি, তখন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার স্ববিরোধিতার পরিচয় দিয়েছে।
Advertisement
(জ্বালানির দাম বাড়িয়ে) এখানে সরকারের নীতিগত জায়গা থেকে পদস্খলন হয়েছে। সরকার জনগণের অনাস্থার শিকার হয়েছে। এটাই হচ্ছে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় এবং ক্ষতিকর প্রভাব।
বিগত সরকারের ধারাবাহিকতা, পরিকল্পনা ও অনুসরণেই এই সরকারের জ্বালানি খাত পরিচালিত হবে বা হচ্ছে। সুতরাং সরকার এই সংকট মোকাবিলায় সফল হবে—এমন আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে গেলো
জাগো নিউজ : দাম বাড়ায় জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কমবে কি না, আপনি কী মনে করছেন?
ড. এম শামসুল আলম : অস্থিরতা কমার কোনো সুযোগ নেই। সরকার দাম বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সরকারের ডলার সক্ষমতা তো বাড়েনি। সরকার তাহলে কীভাবে এই সংকটে দাম বাড়িয়ে ইতিবাচক প্রভাব আনবে। সরকার ইতিবাচক প্রভাব রাখতে ব্যর্থ হবে।
এক্ষেত্রে বিগত সরকারের ধারাবাহিকতা, পরিকল্পনা ও অনুসরণেই এই সরকারের জ্বালানি খাত পরিচালিত হবে বা হচ্ছে। সুতরাং সরকার এই সংকট মোকাবিলায় সফল হবে—এমন আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে গেলো।
জাগো নিউজ : জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি কতটা কল্যাণকর হতে পারে?
ড. এম শামসুল আলম : সরকারকে দেখানো দরকার ছিল—মূল্যবৃদ্ধি একটা সাধারণ প্রক্রিয়া, সবকিছু বাড়লে মূল্যবৃদ্ধি হবে। কিন্তু সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো—এই খাতকে লুণ্ঠনমুক্ত করা, দুর্নীতিমুক্ত করা, এ খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা—সরকার সেগুলোর কোনোটাই না করে বিদ্যমান ঘাটতিকে কৃত্রিম সংকট বা মজুতের রেফারেন্স দিয়ে দাম সমন্বয়ের জন্য মূল্যবৃদ্ধি করতে উঠেপড়ে লেগে গেলো।
মূল্যবৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত কোনোভাবে সরকারের জন্য কল্যাণকর হয়েছে কিংবা জনগণকে লুণ্ঠনের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে—তেমন সামান্যতমও প্রমাণ বহন করে না।
এনএস/এমকেআর