বিনোদন

তৌকীরকে উদ্‌যাপন করলেন অভিনয়ের মানুষেরা

অভিনয়ের মানুষদের পদচারণায় সকাল থেকেই শিল্পকলা একাডেমি হয়ে উঠেছিল উৎসবমুখর। জাতীয় নাট্যশালার সামনে যেন বসেছিল শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, নাট্যজন ও দর্শকদের মেলা। উপলক্ষ ছিল অভিনেতা, চলচ্চিত্রকার, নির্দেশক তৌকীর আহমেদের ৬০ বছর পূর্তি উদযাপন।

Advertisement

দিনব্যাপী তৌকীরকে নিয়ে, তার কর্ম ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলেছেন দেশের নাটক, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনের গুণীজনেরা। হাজির হয়েছিলেন মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, আফজাল হোসেন, আজিজুল হাকিম, গাজী রাকায়েত, আজাদ আবুল কালাম, দীপা খন্দকার, কচি খন্দকার, মাহফুজ আহমেদ, আহসান হাবীব নাসিম, মীর সাব্বিরসহ আরও অনেকে।

গানে গানে সূচনাবেলা ১১টায় জাতীয় নাট্যশালার সামনে পিন্টু ঘোষের গানের মধ্যদিয়ে শুরু হয় ‘ছয় দশক পেরিয়ে তৌকীর আহমেদ’ অনুষ্ঠানটি। জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা মঞ্চে উঠে প্রদীপ প্রজ্জ্বালনের মাধ্যমে উৎসবের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের মূল ও প্রথম পর্ব শুরু করতে সবাই গিয়ে জড়ো হন জাতীয় নাট্যশালার সেমিনারকক্ষে।

কথা যখন ‘শিল্পীর দায়’ নিয়েশুরু হয় ‘আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পীর দায়’ শীর্ষক সেমিনার। উপস্থাপনা করেন অভিনেতা রওনক হাসান। প্রবন্ধ পাঠ করেন নাট্যকার মাসুম রেজাসহ আরও অনেকে। এ সময় তৌকীর আহমেদকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও দেখানো হয়। ছিল মুক্ত আলোচনাও।

Advertisement

স্মৃতিচারণে শিল্পসঙ্গীরাতৌকীর আহমেদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নাট্যজনরা তুলে ধরেন তার শৃঙ্খলাবোধ, কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও ব্যক্তিত্বের নানা দিক। প্রথম নাটক ‘ফিরিয়ে দাও অরণ্য’-এর প্রযোজক খ ম হারুন বলেন, তরুণ বয়সেই তৌকীরের প্রতিভা তাকে মুগ্ধ করেছিল। বুয়েটে গিয়ে ছাত্র তৌকীরের সঙ্গে দেখা করার স্মৃতিও স্মরণ করেন তিনি। সেই ২২ বছরের তরুণ তৌকীরের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা ছেলের কথা বলেছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন ভাই। সেই ছেলেটা ছিল তৌকীর! তাকে নাটকে নেবো কি না অনেক চিন্তা ভাবনা করি। তার সঙ্গে দেখা করতে বুয়েটে গিয়েছিলাম। তারপর মনে হলো, ঠিক আছে। একমাস রিহার্সাল করেছিলাম নাটকটির। তারপর অন এয়ার হওয়ার পরের গল্পটা সবারই জানা।

অভিনেতা ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের দূরবর্তী পরিচয়। আমি যখন হাটি, তখন তিনি সাইকেলে চড়েন, আমি যখন সাইকেলে চড়ি, তিনি তখন মোটর সাইকেলে। আমি যখন মোটর সাইকেলে তখন তিনি গাড়িতে চড়েন ( হাসি...), তারপর কাজের সূত্রে দেখা হয়। তৌকীর আমাদের বন্ধুর থেকে বড় কিছু। সব মাধ্যমে কাজ করেছেন। আমার থেকে অগ্রগামী মানুষ। সুশৃঙ্খল একটা জীবন যাপন করেছেন।’

অভিনেতা আজিজুল হাকিম বললেন, ‘আজ আমাদের জন্য আনন্দের দিন। আজ আমরা যে বসেছি, সমৃদ্ধ হয়েছি, যে কথা আমি নিজেও জানতাম না। তৌকীর আহমেদ সুশৃঙ্খল মানুষ, সবক্ষেত্রে। তৌকীর আহমেদ কাজের মাধ্যমে একটা ইনস্টিটিউট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাহফুজ আহমেদ বললেন, ‘তৌকীর ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটা জার্নি আছে। তখন আমি ছোট ছিলাম। তার সেটা মনে আছি কি না জানি না, আমার সারাজীবন মনে থাকবে। তৌকীর ভাই আমাদের অনেক তরুণদের ঠিকানা ঠিক করে দিয়েছেন। আমার বোধ তৈরি করেছেন তার কাজ দিয়ে। তৌকীর আহমেদ এত সহজে পড়া যায় না। “জয়যাত্রা” যখন করলাম, তখন দেখেছি কীভাবে পরিশ্রম করতে হয়। আপনার প্রতিটা কাজ আমি দেখেছি। আমরা আপনাকে শিক্ষক হিসেবে দেখি।’

Advertisement

জ্যেষ্ঠ অভিনেতা আবুল হায়াত বলেন, ‘তৌকীরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। কী আর বলবো? বললে তো পক্ষে চলে যাবে। ভাবছিলাম কী বলবো, তৌকীর খুব কমিটেড। খুব পড়তে ভালোবাসে। আমার বাসায় যখন আসে, আড্ডার মধ্যে তখন একটা ক্লাস হয়ে যায়। তুমি ভালো থাকো। নতুন আরও কাজ করো এই আশা করি।’

এই আয়োজনে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় তৌকীর আহমেদের। তার কাছে ষাট বছর বয়সের সৌন্দর্যটা কেমন? জানতে চাইলে নন্দিত এই অভিনেতা বলেন, ‘জীবন হচ্ছে সময় নষ্ট করার একটা খেলা। আমরা নানানভাবে সময় নষ্ট করি। আজ এ পর্যায়ে এসে আমার মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস কিছু কাজ হয়তো করেছি। নইলে পুরোটা নষ্ট হয়ে যেত। কাজেই জীবনে যে সময় আছে, বা বাকি যে সময়টা থাকবে, সেটুকু কাজ করেই কাটাবো।’

আরও জানতে চাই, তার সমসাময়িক অনেকে যখন অবসরে যাচ্ছেন, তখন আপনাকে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে, কেমন অনুভূতি হচ্ছে? তৌকীর বললেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, একজন ৪০ বছরের লোককে দেখে বৃদ্ধ মনে করতাম। সত্তর-আশির দশকে আমাদের সেরকমই মনে হতো। কিন্তু পৃথিবীটা তো এমন না। সেই সময়ে আমাদের গড় আয়ু ৪৬ বছর ছিল, তখন উন্নত বিশ্বের মানুষ ১০০ বছর বেঁচে ছিল। এখন আমাদের গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর, উন্নত বিশ্বে সেটা শত বছরের কাছাকাছি। সুতরাং দৈর্ঘ তো বিষয় না, এখানে জীবনের দুটি বিষয় আছে, গুণগত দিকটিও দেখতে হবে। কারো জীবনের গুণগত মানটা কী হলো। জীবনের শিল্পমানটা কী হলো। আবার একই সঙ্গে সময়ই যদি না পাওয়া যায়, গুণগত মানই বা পূরণ হবে কী করে। সুতরাং দুটোই দরকার। কিছুদিন বেঁচে থাকাও দরকার, সেই সঙ্গে সময়টা কাজেও লাগানো দরকার।’

এসব আলাপে প্রশংসায় আর স্মৃতিচারণায় বেলা গড়ায়। বিরতির পর বিকেলে দেখানো হয় তৌকীরের বানানো সিনেমা ‘অজ্ঞাতনামা’। সন্ধ্যায় মঞ্চায়নের জন্য প্রস্তুত ছিল তার নির্দেশিত ও অভিনীত নাটক ‘তীর্থযাত্রী’। দিনটি ছিল তৌকীর আহমেদের।

এমআই/আরএমডি