একের পর এক সংক্রামক ব্যাধিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় জেলা বরগুনাবাসী। গত বছরের রেকর্ড ভাঙা ডেঙ্গু সংক্রমণের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার হাম ও ডায়রিয়ার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে দিশাহারা সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হাম এবং ডায়রিয়ার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, পুষ্টিহীনতা, জলবায়ুর প্রভাব ও অসচেতনতার কারণে এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও প্রকৃত কারণ জানতে নতুন করে গভীর গবেষণার দাবি তুলেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।
Advertisement
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশে হামের সংক্রমণের হার যেখানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে বরগুনায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৩৮ জন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই শতাধিকেরও বেশি শিশু। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শিশুর। জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় বরগুনা সদর উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ৪০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বাধ্য হয়ে মেঝেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেক শিশুর মা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছেন মেঝেতে। প্রথমে জ্বর, পরে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, চোখ ওঠা ও শরীরে র্যাশ জটিলতা নিয়ে নবজাতক থেকে শুরু করে রয়েছেন বয়স্করাও। অথচ হামের প্রথম টিকার ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং পরের ডোজ ১৫ মাস বয়সে।
Advertisement
বেশিরভাগ রোগীর স্বজনরাই জানান, টিকা দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আবার অনেকে বয়স হলেও হামের টিকা নেয়নি। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে হাম সন্দেহে ১৫ জন শিশু ভর্তি।
আরও পড়ুনবরগুনায় হাম সন্দেহে ৮৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি, ৬২ জনের নমুনা ঢাকায়বাংলাদেশে হামের মহামারি এবং একটি জনস্বাস্থ্য চুক্তির অপমৃত্যুটিকা নিয়েও রোগ, জানুন হাম-পক্সের অজানা সত্যহাম প্রতিরোধে এমআর টিকা সবচেয়ে কার্যকরসন্দেহ ও বাস্তবতার ফারাক, হামের প্রকৃত রোগচিত্রে অস্পষ্টতা
শিশুসন্তান নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আব্দুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমার সন্তানের বয়স মাত্র ৮ মাস। এর আগে সব টিকা দিয়েছি শুধু হামের টিকা দেওয়া বাকি। আমার সন্তানের হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি আছি। এখানে বেশিরভাগ শিশুই টিকে নেওয়ার আগেই হাম আক্রান্ত হয়েছে।
গত পাঁচদিন আগে হামের উপসর্গ নিয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সাত মাস বয়সী শিশু রমজান। কথা হয় রমজানের নানির সঙ্গে। তার নানি কুলসুম বেগম জাগো নিউজকে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে হাম নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্যাম্পল কালেকশন করে ঢাকা পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত ফলাফল পাইনি। এদিকে আমার নাতি অনেকটাই সুস্থ।
Advertisement
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক ডা. শায়লা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, এখন পর্যন্ত যত রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই হামের টিকা নেননি। আবার অনেকে টিকা নেওয়া থাকলেও আক্রান্ত হচ্ছেন। এর একটি কারণ আমাদের মনে হচ্ছে, শিশু হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হয়নি। আমাদের এখানে যত শিশু ভর্তি হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে।
ডায়রিয়ার প্রকোপ ও শয্যা সংকটজেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। গত এক মাসে প্রায় এক হাজার ৫০০ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে, যা চলতি বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া গত এক সপ্তাহেই ৪৪০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায়ই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও ৮৩ জন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডটিতে ৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। নারী ও পুরুষ রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, স্যালাইন মিললেও অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি নোংরা পরিবেশের কারণে সুস্থ হতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আরও পড়ুনহামের পর বরগুনায় এবার ডায়রিয়ার হানা, এক মাসে আক্রান্ত দেড় হাজার
সুজন মিয়া নামের এক রোগী জাগো নিউজকে বলেন, আমার হঠাৎ করেই পেটে সমস্যা দেখা দেয়। পরে হাসপাতালে ভর্তি হই। এখানে চিকিৎসা সেবা পেতে এসে মনে হয় অসুস্থ হয়ে পড়ছি। এক জায়গায় গাদাগাদি করে মেঝেতে সবাইকে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ খুবই নোংরা।
এ বিষয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম জাগো নিউজকে বলেন, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে হামের প্রকোপের মধ্যে আবার ডায়রিয়া রোগীর চাপ বেড়েছে। এজন্য আলাদা একটি ডায়রিয়া বিভাগ খোলা হয়েছে। এছাড়া ভর্তি রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত স্যালাইন রয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লেও আমাদের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা নিরলসভাবে সেবা দিচ্ছেন।
গত বছরের ডেঙ্গুর ভয়াবহতাজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে মারা যায় অর্ধশতাধিক মানুষ। ওই সময় ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করায় বরগুনাকে হট স্পট ঘোষণা করে স্বাস্থ্য বিভাগ।
আরও পড়ুনডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ, পা ফেলার জায়গা নেই হাসপাতালেহটস্পট বরগুনায় আবারো বাড়ছে ডেঙ্গু
গত বছর ডেঙ্গুতে পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ আক্রান্ত হয়েছিলেন বরগুনা উপ-শহরের লাকুরতলা এলাকার আব্দুল আলিম। তাকে আইসিইউ পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। ডেঙ্গু নিয়ে আব্দুল আলীম জাগো নিউজকে বলেন, আমার বাড়ি শহরের খুব কাছে হলেও এটি ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। এখানে সরকারিভাবে মশক নিধনসহ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি ৷ ফলে এই এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়ির মানুষই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। যখন বরগুনাকে ডেঙ্গুর রেড জোন করা হয়, তারপরে বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের পক্ষ থেকে মশকনিধন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরে সেগুলো এখন বন্ধ।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল জাগো নিউজকে বলেন, বরগুনায় ডেঙ্গুর পর হাম ও ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। পরিবর্তন নাকি সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে বরগুনায় বারবার সংক্রমণজাতীয় রোগ হচ্ছে সে বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন। আগে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুদের টিকাসহ চিকিৎসা সেবা দিতেন। বিগত কয়েক বছর ধরে দেখছি তাদের গাফিলতির কারণে অনেক শিশুরই ঠিকমতো টিকা দেওয়া হয় না। গবেষণার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীরা ঠিকভাবে কাজ করছে কি না সে বিষয়ে খতিয়ে দেখা উচিত।
একের পর এক সংক্রামক ব্যাধিতে কেন আক্রান্ত হচ্ছে বরগুনাবাসী— এ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন জানিয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকাহ জাগো নিউজকে বলেন, হাসপাতালে নয় মাসের নিচের শিশুরাই বেশি হাম সন্দেহে ভর্তি হচ্ছে। অথচ নয় মাস পর্যন্ত বাচ্চাদের হাম আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আবার এই অঞ্চলে গত বছর ডেঙ্গুতেও অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এছাড়া এ বছর ডায়রিয়ার প্রকোপও দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি, এটি জলবায়ু ও পুষ্টিহীনতার প্রভাবে হতে পারে। এ বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জাগো নিউজকে বলেন, উপকূলীয় জেলা হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে বেশি। গত বছর ডেঙ্গুর সময় মশার জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমরা টিকা কেন্দ্রগুলোতে ৯ থেকে ১৫ মাসের শিশুদের হামের টিকা দেই। কিন্তু এ বছর ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা যেমন হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, আবার প্রাপ্তবয়স্করাও একই উপসর্গ নিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব গবেষণার মাধ্যমে। আমরা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।
নুরুল আহাদ অনিক/কেএইচকে/এএসএম