খেলাধুলা

নাহিদ রানাকে ইনজুরিমুক্ত রাখা জরুরি, দায়িত্বটা কার?

‘ঘর পোড়া গরু নাকি সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়’- বাংলাদেশের তরুণ ফাস্ট বোলারদের খুব ভালো বোলিং করতে দেখলেই তেমন ভয় লাগে। শঙ্কা জাগে।

Advertisement

অতীতের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যাবে ব্যাপারটা। এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার নাহিদ রানার দুর্দান্ত বোলিং দেখে কেউ কেউ ফিরে গেছেন অতীতে। শুধু পিছন ফিরে তাকানোই নয়, খানিক ভয়ও পাচ্ছেন। সে ভয় ইনজুরির। সে শঙ্কা অল্প বয়সে বেশি শারীরিক ধকল নিয়ে আহত হওয়ার।

কারণ এক ও অভিন্ন। ইতিহাস জানাচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দু-দু’জন দ্রুতগতির বোলার মাশরাফি বিন মর্তুজা আর তালহা জুবায়ের ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বেশি মাত্রায় ম্যাচ খেলে কয়েক বছরের মধ্যেই ইনজুরির শিকার হন এবং তাদের ক্যারিয়ারের স্বাভাবিক গতি ও ছন্দ চরমভাবে বিঘ্নিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই নাহিদ রানার প্রচণ্ড গতি, বিধ্বংসী বোলিং দেখে পুলক জাগার পাশাপাশি কারো কারো মনে চিন্তার বলিরেখা, শঙ্কা। সময়ের দেশসেরা ফাস্ট বোলার নাহিদ রানার অবস্থা আবার মাশরাফির মতো হবে না তো?

Advertisement

চিত্রা পাড়ের সাহসী যুবা মাশরাফির শারীরিক গঠন ছিল দারুণ। সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সুগঠিত শরীর ছিল নড়াইল এক্সপ্রেসের। উচ্চতা, ওজন, বুক, উরু, কাফ মাসল সবই ছিল সুগঠিত। এমন চমৎকার শারীরিক গঠনের অধিকারী মাশরাফিও ক্যারিয়ার শুরুর পর থেকে বেশি ম্যাচ খেলে নিজেকে ইনজুরিমুক্ত রাখতে পারেননি।

ক্যারিয়ারের বয়স ২ না হতেই ইনজুরিতে পড়ে যান। তারপর কয়েক দফা আহত হন। এক সময় তার শরীরটাই ইনজুরিময় হয়ে ওঠে এবং ক্যারিয়ারের বয়স যত বাড়তে থাকে, মাশরাফির বলের ধার ও গতি ততই কমতে থাকে। শুরুতে গড়পড়তা ও নিয়মিত ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করা মাশরাফির বোলিংয়ের ছন্দ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একসময় গতি ১৩০ কিলোমিটারে নেমে আসে।

যারা মাশরাফি বিন মর্তুজাকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলতে দেখেছেন, তারা খুব ভালো জানেন যে, তিনি ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রচণ্ড গতিতে বোলিং শুরু করেছিলেন; কিন্তু অল্প বয়সে বেশি ম্যাচ খেলানো আর বাড়তি ‘ওয়ার্কলোড’ নিয়ে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ইনজুরিতে পড়ে সেই গতি ও তেজ কমে যায় নড়াইল এক্সপ্রেসের।

ইতিহাস জানাচ্ছে, মাশরাফি প্রথম ইনজুরির শিকার হন ২০০১ সালের শেষ দিকে। ওই বছর ডিসেম্বরের শেষ ভাগে হাঁটুর ইনজুরির শিকার হয়ে ১৬ মাস মাঠের বাইরে কাটাতে হয় নড়াইল এক্সপ্রেসকে। তারপর ২০০৩-এর এপ্রিলে আবার সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরলেও সেই আগের মাশরাফির প্রচণ্ড গতি আর তেজ চোখে পড়েনি।

Advertisement

যে সময়ে মাশরাফি ইনজুরির শিকার হন, তখন তার বয়স ২০-২১। ওই বয়সে ক্যারিয়ারের প্রথম ১০ টেস্টে গড়পড়তা একেক ইনিংসে ২৫ থেকে ৩০ ওভার বোলিং করানো হয় তাকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওই অল্প বয়সী শরীর সেটা সহ্য করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ইনজুরির শিকার হয়ে টেস্ট ক্রিকেট ছাড়তে বাধ্য হন মাশরাফি।

তারপর ছোট-খাটো ও বড় মিলে সাত-আটটি অপারেশনের ধকল সামলে পায়ে নানা ব্যান্ডেজ বেঁধে ও সাপোর্ট নিয়ে সাদা বলে আরও ৭/৮ বছর খেলা চালিয়ে গেলেও তখন মাশরাফির বলের গতি অনেক কমে ১৪০ প্লাস থেকে ১২০ থেকে ১২৭/১২৮ কিলোমিটারে নেমে আসে। এক কথায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে টেস্ট ও ওয়ানডেতে বেশি বেশি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি লম্বা লম্বা স্পেলে বল করার চরম খেসারত দিতে হয় দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম এক্সপ্রেস ফাস্ট বোলার মাশরাফিকে।

ভয় জাগছে, নাহিদ রানাকে নিয়েও। ক্যারিয়ারের বয়স এখন সবে ২ বছর। এরই মধ্যে ১০টি করে টেস্ট আর ওয়ানডে খেলে ফেলেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ২৩ বছর বয়সী যুবা। তার অবস্থা আবার মাশরাফির মতো হবে না তো?

প্রশ্ন উঠেছে নাহিদ রানার বয়স কম। এ বয়সে জোরে বল করতে আর বারুদে ও বিধ্বংসী স্পেল উপহার দিতে অনেক বেশি ইচ্ছে থাকে ভেতরে। কিন্তু তরুণ বয়সে বেশি জোরে বোলিং করা আর বেশি ম্যাচ খেলা ও ওয়ার্কলোডে ইনজুরির শঙ্কা থাকে। নাহিদ রানা কি তা জানেন? তার নিজের সচেতনতা কতটা? এই তরুণকে আরও একটু রয়ে-সয়ে মাঝে মধ্যে বিশ্রাম ও বিরতি দিয়ে খেলানোর পরিকল্পনা রয়েছে কি না টিম ম্যানেজমেন্টের?

খোদ নাহিদ রানা কি ভাবছেন নিজের সম্পর্কে? আজ ২০ এপ্রিল খেলা শেষে প্রেস কনফারেন্সে এই প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, ‘ফিটনেস নিয়ে অনেক কাজ করি। অনুশীলনের বাইরেও অনেক কাজ করি। ট্রেনারদের সাথে কথা বলি কিভাবে ম্যাচে বোলিংয়ের সময় টায়ার্ড না হওয়া যায়।’

নাহিদ রানার সাথে একই সুরে কথা বললেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনও। তার ব্যাখ্যা, ‘আমরা অনেক বেশি সচেতন। আমাদের ফাস্ট বোলিং ডিপার্টমেন্ট আমাদের অনেক বড় সম্পদ ও শক্তি। আমরা ফাস্ট বোলারদের ইনজুরিমুক্ত রাখতে সোচ্চার, সতর্ক ও সাবধানি।’

বাশার মনে করেন নাহিদ রানাদের নিয়ে মাশরাফির মতো অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘দেখুন, ২০০২-২০০৩ আর আজকের ফিটনেস ট্রেনিং, ট্রেনার ও ফিজিওদের কাজকর্মের ধরন অনেক বদলেছে। এখন ফিজিও, ট্রেনার এবং ফাস্ট বোলিং কোচরা প্রতিটি ফাস্ট বোলারকে আলাদা করে মনিটর করেন। তাদের প্রত্যেকের ফিটনেস পাখির চোখে পরখ করা হয়। ট্রেনার, ফিজিও এবং পেস বোলিং কোচরা একেক সিরিজ ও ম্যাচ শেষে প্রত্যেক পেসারকে নিয়ে আলাদাভাবে আমাদের সাথে কথা বলেন যে কার ফিটনেসের কী অবস্থা। সেটা জানার পর যদি মনে হয় কারো বিশ্রাম দরকার, তাহলে তাকে কোনো সিরিজ বা ম্যাচ থেকে বিশ্রাম দেয়া হয়। কাজেই এখন আর আগের মতো অতিরিক্ত ম্যাচ লোড পড়ার ঝুঁকি নেই। এখন পুরো ফিটনেস ট্রেনিংই শুধু বদলায়নি, ফাস্ট বোলারদের মনিটরিং সিস্টেমটাও হয়েছে অনেক আধুনিক। তাই কারো ওপর বাড়তি ওয়ার্কলোড পড়ার ঝুঁকি কম।’

এআরবি/আইএইচএস