ব্যবস্থাপনা খাতে আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যয় করা অর্থ পুনর্ভরণ (ফেরত দেওয়া) করার জন্য ২০১৮ সালে অঙ্গীকার করে দেশে ব্যবসা করা জীবন বিমা কোম্পানিগুলো। এরপর এক এক করে ৭টি বছর পার হলেও পুনর্ভরণ করা তো দূরের কথা, এখনো এই অবৈধ ব্যয়ের লাগাম টানতে পারেনি অর্ধেকের বেশি বিমা কোম্পানি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বেসরকারি খাতের ৩৫টি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে ২০টি আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
Advertisement
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পর্ষদের অদক্ষতা এবং পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল তদারকির কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত নিয়ম মেনে চললে এই ব্যয় সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে তা করছে না। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থাও সঠিক তদারকি এবং পরিকল্পনা করে কোম্পানিগুলোকে আইনের মধ্যে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডাররা। কারণ আইনি সীমার অতিরিক্ত যে টাকা ব্যয় করা হচ্ছে তার ৯০ শতাংশই প্রতিষ্ঠানের পলিসিহোল্ডাররা প্রাপ্য। বাকি ১০ শতাংশের ভাগীদার শেয়ারহোল্ডাররা।
জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে পলিসিহোল্ডাররা এং শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০১৬ সালে প্রথমবার সবকটি কোম্পানিকে শুনানিতে ডাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। শুনানিতে ভবিষ্যতে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় করা হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কোম্পানিগুলোকে হুঁশিয়ারি করা হয়। সেই সঙ্গে অতীতে যে পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে তা ক্রমান্বয়ে সমন্বয় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুনবিমায় আগ্রহ নেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, নেপথ্যে ‘আস্থার সংকট’দেশের সব বিমা কোম্পানি এখন ‘অবৈধ’জীবন বিমায় বকেয়া দাবির পাহাড়, বিপর্যয়ে ৭ কোম্পানি
Advertisement
সেসময় আইডিআরএ’র তৈরি করা প্রতিবেদনে উঠে আসে ১৭টি জীবন বিমা কোম্পানি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা খাতে ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত খরচ করেছে। এর প্রেক্ষিতে আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে করা অতিরিক্ত ব্যয়ের পেছনে কী ধরনের দুর্নীতি হয়েছে তা ক্ষতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তবে এরপরও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব না হলে ২০১৮ সালে আবার জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বসে আইডিআরএ। সেসময় ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করা অতিরিক্ত অর্থ পুনর্ভরণ করার অঙ্গীকার করে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো। এরপরও অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধ না হওয়ায় ২০২১ সালে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে আইডিআরএ।
এতে কোম্পানিগুলোর সুপারভাইজরি লেভেলে পাঁচটি গ্রেডের পরিবর্তে তিনটি গ্রেড রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে এই তিন গ্রেডের জন্য বেতন-ভাতা, কমিশন, বোনাস ও যাতায়াতসহ সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ খরচের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। অবশ্য এরপরও জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর এই অবৈধ ব্যয় থামেনি।
আইডিআরএ’র তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৫ সালে ২০টি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আইন লঙ্ঘন করে বছরটিতে ব্যবস্থাপনা খাতে সব থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। প্রতিষ্ঠানটি ২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। আইন অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা খাতে কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অথচ ব্যয় করা হয়েছে ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
Advertisement
এর পরের স্থানেই রয়েছে শান্তা লাইফ। কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ১৪ কোটি ৭৫ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় করা হয়েছে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
আইন লঙ্ঘন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার তালিকায় রয়েছে প্রোগ্রেসিভ লাইফও। কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করে ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। আইন অনুযায়ী, কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যয় হয়েছে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
একইভাবে এনআরবি ইসলামীক লাইফের সর্বোচ্চ ব্যয় সীমা ১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা নির্ধারিত হলেও কোম্পানিটি ২৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৭১ লাখ। প্রোটেক্টিভ লাইফের সর্বোচ্চ ব্যয় সীমা ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা নির্ধারিত হলেও কোম্পানিটি ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এ হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
এছাড়া চার্টার্ড লাইফ ৮ কোটি ৪৭ লাখ, জেনিথ ইসলামী লাইফ ৬ কোটি ৬১ লাখ, সান লাইফ ৬ কোটি ২৩ লাখ, স্বদেশ লাইফ ৬ কোটি ৫ লাখ, হোমল্যান্ড লাইফ ৫ কোটি ৯১ লাখ, সোনালী লাইফ ৫ কোটি ৩৪ লাখ, যমুনা লাইফ ৫ কোটি ৩৩ লাখ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ৪ কোটি ৬৬ লাখ, গোল্ডেন লাইফ ৩ কোটি ৩৮ লাখ, বায়লা লাইফ ২ কোটি ৫৮ লাখ, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ ২ কোটি ৪১ লাখ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ১ কোটি ৩৭ লাখ এবং ডায়মন্ড লাইফ ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে।
আরও পড়ুনশেয়ারবাজারে ফিরছে বিদেশিরা, সক্রিয় স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাওথামছে না বিদেশিদের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতাবিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে দেশে ঋণ শোধ করছে সরকার
অইন অনুযায়ী, বছরটিতে চার্টার্ড লাইফের ৩০ কোটি ৩৯ লাখ, জেনিথ ইসলামী লাইফের ২৫ কোটি ৫৭ লাখ, সান লাইফের ৩ কোটি ৫৩ লাখ, স্বদেশ লাইফের ১০ কোটি ৭৯ লাখ, হোমল্যান্ড লাইফের ৪ কোটি ১২ লাখ, সোনালী লাইফের ৩৭৮ কোটি ৬৩ লাখ, যমুনা লাইফের ১৭ কোটি ৩৬ লাখ, পদ্মা ইসলামী লাইফের ৮ কোটি ৮৫ লাখ, গোল্ডেন লাইফের ১১ কোটি ৮৫ লাখ, বায়লা লাইফের ৬ লাখ, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের ৮ কোটি ২৪ লাখ, সানফ্লাওয়ার লাইফের ৪ কোটি ৮৭ লাখ এবং ডায়মন্ড লাইফের ১০ কোটি ১ লাখ টাকা সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা নির্ধারিত ছিল।
একটি বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুপারভাইজরি লেভেলে তিনটি গ্রেডে কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অনেক বেশি। ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ার পেছনে এটি অন্যতম একটি কারণ। আমার মতে- সুপারভাইজরি লেভেলে কমিশন থাকা উচিত না। এদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নির্ধারিত বেতনের মধ্যে আনতে হবে। অথবা কমিশনের হার কমিয়ে দিতে হবে।’
পুনর্ভরণের অঙ্গীকার কারার পরও কেন জীবন বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধ হচ্ছে না জানতে চাইলে প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে, তা আইন দিয়ে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলো চাইলেই ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে পারে। আমাদের কোম্পানি (প্রগতি লাইফ)-তে একসময় অতিরিক্ত ব্যয় হতো, ২০১৫ সালের পর থেকে আমরা ব্যয় আইনের নির্ধারীতে সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছি এবং এখন ব্যয় নির্ধারিত সময়ের থেকে অনেক কম হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করে ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে না রাখতে পারা একটি গুরুতর সমস্যা। এটি কেবল নীতিমালার লঙ্ঘনই নয়, বরং আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবেরও প্রতিফলন। প্রতিটি কোম্পানির পক্ষে ব্যয় আইনের নির্ধারিত সীমার পক্ষে রাখা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন হচ্ছে আয় বুঝে ব্যয় করা। আয় কম হলে অফিস ও জনবল সেই অনুযায়ী সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান এ বাস্তবতা মানতে চায় না। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদে আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আমার আয় কম হলে বড় অফিস নেওয়া এবং অতিরিক্ত জনবল নেওয়ার যুক্তিসংগত কোনো কারণ আমি দেখি না।’
বিমা কোম্পানিগুলোর সিইওদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং জেনিথ ইসলামী লাইফের সিইও এস এম নুরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা ব্যয় সীমার মধ্যে রাখতে না পারার অন্যতম কারণ বিমাখাতের ইমেজ সংকট। এই ইমেজ সংকট হয়েছে গুটি কয়েক কোম্পানির কারণে। এই কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের বিমা দাবি ঠিকভাবে পরিশোধ না করে বছরের পর বছর ঘুরিয়েছে। ফলে বিমার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এতে নতুন পলিসি বিক্রি কমেছে এবং আয় কমে গেছে। যে কারণে কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও ব্যয় সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’
এমএএস/ইএ