ক্যাম্পাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘পুতুল নাচ’, প্রশংসায় কুড়াচ্ছে সবার

পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ঘরে ঘরে গ্রামীণ উৎসব। এবারের নববর্ষকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিল সেই উৎসবের আমেজ। বাংলা নববর্ষ বরণে পান্তা-ইলিশ, গ্রামীণ খেলাধুলা ও গান-নৃত্যের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও বাংলা নববর্ষের ইতিহাস, গ্রামীণ চিরায়ত জীবনধারা ও মুসলিম ঐতিহ্য নিয়ে আয়োজন করা হয় ‘নববর্ষ প্রদর্শনী উৎসব’।

Advertisement

সবকিছুর মধ্যেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় ছিল গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ।

গত ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভাগের দুজন শিক্ষার্থীকে পুতুল নাচে অংশ নিতে দেখা যায়, যা দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে।

বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন অনুষঙ্গ পুতুল নাচ একসময় গ্রামবাংলার বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ তাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে এই শিল্পরূপকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে।

Advertisement

অনুষ্ঠানের মঞ্চে পুতুল নাচের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় ফুটে ওঠে গ্রামীণ জীবনের নানা গল্প, লোককাহিনি ও সামাজিক বার্তা। বর্ণিল পোশাক, সুরেলা সংগীত এবং দক্ষ পরিচালনায় পুতুল নাচটি যেন প্রাণ ফিরে পায়। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন এই বিরল পরিবেশনা।

পুতুল নাচ পরিবেশন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাদের মতে, এমন উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মকে দেশের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মুগ্ধ বসাক শিশির ও একই বর্ষের শিক্ষার্থী আফরোজা শেখ পুতুল নাচে অংশ নেন।

বাঙালি সংস্কৃতি আমাদের বড় পরিচয়, এ কথা জানিয়ে পুতুল নাচে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী আফরোজা শেখ বলেন, ৭ বছর পর বিভাগে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে আমরা লোকজ সংস্কৃতিকে শালীন ও আনন্দময়ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। শেষ মুহূর্তে মাত্র দুই মিনিটের ‘পুতুল নাচ’ পরিবেশন করি, যা দর্শকদের এত ভালো লাগে যে ‘ওয়ান্স মোর’ বলছিল সবাই। সবার ভালোবাসায় আমরা কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতেও বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করতে চাই, কারণ এটাই আমাদের পরিচয়।

Advertisement

নাচে অংশ নেওয়া মুগ্ধ বসাক শিশির জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলা ঐতিহ্যের হারিয়ে যেতে বসা এক গুরুত্বপূর্ণ লোকসংস্কৃতি, পুতুল নাচ উপস্থাপন করতে পারা আমার ও আমার সহযোগী সঙ্গীর জন্য এক গর্বের বিষয়। বর্তমানে আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক লোকজ সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। এমন সময়ে এই ছোট্ট প্রচেষ্টা আমাদের শিকড়কে নতুন করে চিনতে ও ধারণ করতে সাহায্য করেছে।

এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজক সুমাইয়া ইয়াসমিন শোভা চৌধুরী বলেন, শুধুমাত্র বিনোদন নয়, বরং লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচারের লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই এমন আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব। সেই জায়গা থেকেই আমাদের এমন আয়োজন।

পুতুল নাচের ভূয়সী প্রশংসা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আরিয়ান রনি বলেন, পহেলা বৈশাখের এই সাংস্কৃতিক আয়োজনে পুতুল নাচের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পের উপস্থিতি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু একটি পরিবেশনা নয় বরং বাঙালির সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থিত দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করতে বিভাগের এমন আয়োজনের প্রশংসা করে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সৌরভ বলেন, পুতুল নাচ এখন গ্রামবাংলা ও শহুরে জীবনে খুব কমই দেখা যায়। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ আয়োজিত পুতুল নাচ আমাদের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন আয়োজন আরও প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বাঙালিয়ানা তুলে ধরতেই পুতুল নাচের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এ কে আনোয়ার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, পুতুল নাচ একসময় বাঙালির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, যা কালের পরিক্রমায় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর আগের মতো পুতুল নাচ দেখা যায় না, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা ধীরে ধীরে নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগেই এই আয়োজন করেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাদের এই উদ্যোগকে তিনি ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতেও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এমন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন নিয়ে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মনির হোসেন মাহিন/এমএন/জেআইএম