দেশের পুঁজিবাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তাকে এ পদ থেকে সরানোর আগে কমিশন আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হবে। এরই মধ্যে আইন পরিবর্তনের কার্যক্রম শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
Advertisement
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বলবৎ থাকা ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩’ অনুযায়ী বিএসইসি চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ বছর। অর্থাৎ, বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়া বা এ পদে থাকার যোগ্য হবেন না।
সরকার বিএসইসি চেয়ারম্যানের বসয়সীমা আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। এক্ষেত্রে তা পাঁচ বছর কমিয়ে সর্বোচ্চ ৬০ বছর করা হতে পারে। অর্থাৎ, ৬০ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসি চেয়ারম্যান হওয়া বা এ পদে থাকার যোগ্য হবেন না। চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিএসইসি কমিশনারদের বয়সসীমাও কমিয়ে ৬০ বছর করা হতে পারে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বয়সসীমা কমানোর পাশাপাশি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা কমানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে ৬৭ বছর। এটি কমিয়ে ৬০ বছর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
Advertisement
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ওই বছরের ১৮ আগস্ট ৪ বছরের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইন পরিবর্তন করার পরপরই বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-তে। বর্তমানে আইডিআরএ চলছে একজন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়ে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ওই বছরের ১৮ আগস্ট ৪ বছরের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান।
রাশেদ মাকসুদ বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়। এই দরপতনের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং রাশেদ মাকসুদের অপসারণ দাবিতে দিনের পর দিন বিক্ষোভ করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এমনকি একই দাবিতে মতিঝিলে বিনিয়োগকারীদের ‘কাফন মিছিল’ও হয়।
Advertisement
আরও পড়ুনপুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব ৯০ শতাংশ বিনিয়োগকারীবিএসইসি চেয়ারম্যানের দুর্নীতির অনুসন্ধান চান বিনিয়োগকারীরামতিঝিলে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের ‘কাফন মিছিল’
তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিনিয়োগকারীদের দাবির প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি। বরং তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সময় বিএসইসি চেয়ারম্যান হিসেবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের প্রসংশা করেন। এমনকি একটি বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘অনেকের দাবি থাকলেও শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে পদ থেকে সরাতে চাই না।’
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের গুঞ্জন শুরু হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের পর বিএসইসি চেয়ারম্যান পরিবর্তন নিয়েও গুঞ্জন জোরালো হয়। এর মধ্যেই আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান পদ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এম আসলাম আলম পদত্যাগ করলে, বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ নিয়েও গুঞ্জনের পালে হাওয়া লাগে।
তবে এখনো চেয়ারম্যান পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। কারণ, তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করেননি এবং সরকার এখনো তাকে সরিয়ে দেয়নি। যদিও তাকে সরানোর প্রক্রিয়া এখন শুরু হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, বিএসইসির চেয়ারম্যান পদ থেকে রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তবে তাকে এ পদ থেকে সরানোর আগে কমিশনের আইনে কিছু সংশোধন আনা হবে। এরই মধ্যে আইন সংশোধনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এটি শেষ করা হবে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার এবং আইডিআরএর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়স ৬০ বছর করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তনও হতে পারে
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন সংশোধনের পাশাপাশি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০-এ কিছু সংশোধন আনা হবে। দুটি আইন সংশোধনের কার্যক্রম একসঙ্গে শুরু হয়েছে এবং দ্রুত তা সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
আইন সংশোধনের পর বিএসইসি চেয়ারম্যানের পাশাপাশি কমিশনার পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে আইডিআরএ’র সদস্য পদেও পরিবর্তন আনতে পারে সরকার। প্রাথমিকভাবে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার এবং আইডিআরএর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়স ৬০ বছর করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তনও হতে পারে—যোগ করেন এ কর্মকর্তা।
আরও পড়ুনপদত্যাগ করেছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান আসলাম আলমপদত্যাগ করবেন না বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অন্য আরেকজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে কিছু পরিবর্তন আসবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের পর সরকার কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়ে। তাই অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যেন বিতর্ক এড়িয়ে চলা যায়, সেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিতর্ক এড়ানোর জন্য বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার আগে আইন পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইন পরিবর্তন করে চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা কমানো হবে, তবে সেটি কত হবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রাথমিকভাবে ৬০ বছর ধরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শিগগির বিষয়টি চূড়ান্ত করে সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আইডিআরএর চেয়ারম্যান পদত্যাগ করায় ওই পদটি খালি হয়ে যায়। এরপর কর্মকর্তাদের বেতন আটকে যাওয়ায় সেখানে একজন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেওয়া হয়েছে। আইন পরিবর্তন করে শিগগির আইডিআরএতেও নতুন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে।
পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করার জন্য কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। এছাড়া স্টেকহোল্ডার এবং বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকেও বিএসইসির চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—যোগ করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা।
এমএএস/এমকেআর